ব্রেকিং নিউজ

“আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো”

চন্দ্রশিলা ছন্দা

চন্দ্রশিলা ছন্দা :: জনকের এই ঐতিহাসিক উচ্চারণ আজ ক’দিন ধরে কর্ণকুহরে বেজেই চলেছে এবং স্বাধীনতার এই অর্ধশত বৎসর পরেও এই বাণীর গুরুত্ব তো সামান্যতম কমে যায়ইনি, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের মানবতার মা, জননেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন একটি হুকুমের অপেক্ষায় আছি দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ কোটি ২২ লাখ নারী এবং কয়েক কোটি পুরুষও নিশ্চয়।

আমি একাত্তর দেখিনি। একাত্তরের উপর লেখা কিছু বই পড়তে গিয়ে ট্রমাটিক হয়ে যাই…শেষ করতে পারিনা। কিন্তু বিগত কিছু বছর ধরে ঘটেই চলেছে একের পর এক হিংস্রতা! আর বর্তমান সময়টাতে আমরা ভোগ করছি বিচার না হওয়া হিংস্রতার চরম ফলাফল! এখন আমরা কতটা ইনসিকিউরড যে,বাবা মায়ের সাথে থাকা কন্যাটিও রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষন কিংবা গ্যাং রেপের হাত থেকে।স্বামী সাথে থেকে,ভাই সাথে থেকেও রক্ষা করতে পারছে না মা,বোন,স্ত্রীকে। কতটা ঔদ্ধত্য হলে পরিস্থিতি এরকম হতে পারে এটা ভাবার সময় কি এখনো হয়নি? এই যদি পরিস্থিতি হয় তাহলে এদেশে নারীরা একা কাজ করবে কি করে? আমরা ঘর থেকে বের হবো কি করে? এই নরপশুগুলো আর কি কি করতে পারে, ভাবতে গিয়ে দেখি, আমার মাথা কাজ করছে না! নিষ্ঠুরতার আর কত ভয়ঙ্কর চিত্র হতে পারে আমার জানানেই। ঘৃণা প্রকাশের ভাষাও হারিয়ে গেছে!

আমরা সবাই জানি যে আমরা এখন কঠিন একটা সময় পার করছি। আমাদের মাথার উপরে এবং সামনে পিছনে কালো থাবা। লোলুপ দৃষ্টি এবং পাশবিকতার শিকার তিনদিনের শিশু, মাদ্রাসার বাচ্চা ছেলেরা, এবং ৭২ বছরের বৃদ্ধাও। এমন কি পথের নিরীহ কুকুর, বিড়ালও!

তবে আমাদের শৈশব কৈশোরের সময়টাতে মানুষ মনেহয় বর্তমান সময়ের মত এতোটা বিকৃত মস্তিষ্কের ছিলোনা।
স্বাধীনতা একজন নারী-পুরুষের জন্মগত অধিকার। সুতরাং নারীর এই অধিকার হরণের অধিকার কোন পুরুষের নেই। নেই কোন মানুষের। নারী হোক বা পুরুষ, একটা সময়ের পর প্রত্যেকেই তার নিজ জীবনের চালক হয়ে ওঠে। এবং নারী হলো সভ্যতার ধারক। নারীই পারে সুশিক্ষায়, নৈতিকতায় এবং মানবীয় গুণে তার সন্তানকে গড়ে তুলতে। নারীর রক্তের প্রতিটি কণা পবিত্র। নারীত্ব আমাদের অলঙ্কার এবং অহঙ্কার। বেঁচে থাকার কোন লড়াইয়ে নারীরা পিছপা নয়। বরং কখনো কখনো পুরুষের থেকেও একধাপ এগিয়ে থাকে। দিনে দিনে নারীরা শিক্ষিত হয়েছে। বিভিন্ন চাকরি করে, বিভিন্ন ব্যাবসা করে রোজগার করছে কিন্তু আত্মনির্ভর হচ্ছেনা। স্বাধীন হচ্ছেনা। কারন যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে নারীর মগজে নারীত্ব, মাতৃত্বের মহিমা, সতীত্বের কাছে নত হতে শেখানো হয়েছে। তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। ভালো-মন্দ বোঝানোর ছলে স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার পাতা ফাঁদে পা দেয়ানো হয়েছে। এটাই পুরুষতন্ত্রের নিয়ম।

যে কোন কৌশলে তারা মেয়েদের অধিকার বোধকে দুমড়ে মুচড়ে নষ্ট করে দিতে চায়। মেয়েরা যখনই নিজের মুল্য বোঝার চেষ্টা করে, তখনই যে কোন মুল্যে সেই লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দেওয়াটাই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাল। ধর্মের দোহাই দিয়ে দাবিয়ে রাখার মরণপণ লড়াই তারা করেই চলেছে। পোশাককে তারা সুন্নতি আর হিজাবকে তারা কর্পোরেট বিজনেস বানিয়ে ইচ্ছা এবং স্বাধীনতার বুলি নারী মুখ দিয়েই প্রচার করাচ্ছে। এই সুকৌশলী পুরুষ তন্ত্র খাবারের ভেতর হালাল, এবং প্রসাধনে হিজাব শ্যাম্পু এনে নেমে পড়েছে আটঘাট বেঁধে। ধর্ম এদের কাছে বড় অস্ত্র। আর এইসব বল্লে, লেখলে আমরা হয়ে যায় নব্য নাস্তিক। এটাই হচ্ছে দাসপ্রথার নতুন কৌশল। অথচ একটু ঠান্ডা মাথায় আমরা নারীরা চিন্তা করলেই বুঝতে পারবো যে, ধর্ম হচ্ছে হায়নাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

যারা এতোদিন ধর্ষনের পেছনে নারীর খোলামেলা কিংবা আঁটসাঁট পোশাককে দায়ী করতো, তারাই এখন নারীকে বিবস্ত্র এবং উলঙ্গ করছে।তারাই এখন মাদ্রাসার হিজাবী ছাত্রীদের ধর্ষন করছে! মানবতা আজ আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে পৌঁছে গেছে।আতঙ্কে অপমানে আমরা সুস্থ ভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারছি না। এতো সব নির্যাতন হিংস্রতা নিয়ে লেখিনা অনেক দিন! হ্যাঁ হয়তো সয়ে নেয়ারই অভ্যাস করছিলাম। কিন্তু যখন পত্রিকার প্রথম পাতায় লেখা হয়, মন্দিরে কন্যা শিশুকে চাররাত চারদিন লুকিয়ে রেখে ধর্ষন করে হত্যা করা হয়েছে, গীর্জায় কিশোরী ধর্ষন, যখন কুরআন হাদিস আর আইনের শাসনের কথা ঝেড়ে নারীকে গনিমতের মাল হিসেবে গণ্য করে, ব্যবসার পুঁজি বানানো হয়, বানানো হয় তথাকথিত ধর্মরক্ষকদের যৌণ দাসী! তখন বুঝতে বাকি থাকেনা পুঁজিবাদ,পুরুষতন্ত্র, এবং ধর্মব্যবসা এই তিন অপরাজেয় শক্তি কতটা ভয়ঙ্করভাবে চেপে বসছে আমাদের কাঁধে। এক-একটি ধর্ষন আমার কাছে রাষ্ট্রের গালে চড় মারার সামিল। এক-একটি ধর্ষন আমার কাছে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। আর তাই আজ ছোট-বড় সকলেই অপরাধ করার স্পর্ধা দেখাচ্ছে। যেন তারা জানে, কিছুই হবে না। বিচারকরাই তাদের রক্ষক।

এই যদি পরিস্থিতি হয় তাহলে তো নারীরও উচিত আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া? পথে ঘাটে সুবিধার জন্য জিন্স আর সংক্ষিপ্ত পোশাক পরা? কারণ একের পর এক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে আর কোন না কোনভাবে দায়ী করা হচ্ছে ওই নারীকেই! নারী কেন ওড়না পরবেনা? মর্ডান হবে? ফেসবুকে সেজেগুজে ছবি দিবে? নারী কেন চাকরি করবে? সন্ধ্যার পর বাইরে যাবে? স্বামী হোক, ভাই বন্ধু যেই হোক না কেন, নারী কেন তাদের সাথে ঘুরবে বেড়াবে? এই সব অদ্ভুত অজুহাত আর বাধানিষেধে জর্জরিত নারী। সুতরাং নারীরও পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে। আমরা এখন একটি হুকুমের অপেক্ষায় আছি। পিতার উপযুক্ত কন্যা হয়ে আপনি শুধু বলুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী “তোমাদের হাতে যার যা আছে, তাই নিয়ে স্পটেই ধর্ষকদের ঘেরাও করো! আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা তোমাদের মত ব্যাবস্থা নিও!” পুরো দেশের নারী-শিশু তাকিয়ে আছে আপনার একটি হুকুমের আশায়… মা জননী আপনার অসীম ক্ষমতা কার জন্য? কার বিরুদ্ধে? আপনি নিজের দেশের এইসব দানবগুলোরে দমন করতে না পারলে ভবিষ্যতের শিশুদের কাছে কী,জবাবদিহি করবেন? কেমন রাস্ট্র রেখে যাবেন আপনি?

অনেকেই রাগে ক্ষোভে বলে থাকেন ধর্ষকদের লিঙ্গ ছেদ করা হোক। তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা হোক যন্ত্রণা বোঝানোর জন্য। আমি তাদের সাথে একমত নই। শত শত ধর্ষকের লিঙ্গ কর্তন করে হিজড়া বানিয়ে বাঁচিয়ে রেখে দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ানোর কোন মানে হয় না। যাঁরা এ দেশের মাটিকে স্বাধীন করার জন্য জীবন মরন লড়াই করেছেন, যে মাটির বুকে জাতির জনক ঘুমিয়ে আছেন, সেই মুক্তি যোদ্ধার পবিত্র মাটিতে কোন ধর্ষকের কবরও আমরা দেখতে চাই না। এই মাটিতে কোন পাপিষ্ঠ স্বেচ্ছাচারীর কবরও দেখতে চাই না। এদেরকে এমন শাস্তি দেয়া হোক, এমন আলটিমেটাম দেয়া হোক যেন আগামী দিনের সূর্যোদোয়ের সাথে সাথে ধর্ষন শব্দটি চিরতরে বিদায় নেই। আর কেউ যেন সাহস না করে নারীর দিকে চোখ তুলে তাকাতে ধর্ষকের একমাত্র শাস্তি হোক মৃত্যুদন্ড। প্রকাশ্যে ফাঁসি এবং তা একসপ্তাহের মধ্যেই কার্যকর করে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে তাৎক্ষণিক কেটে টুকরো টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেয়ার হুকুম দেয়া হোক।

নারী বা শিশু ধর্ষণ মানে একসাথে অনেকগুলো জীবনকে চিরদিনের মত জীবমৃত করে দেয়া। একটি পরিবার এবং একটি সমাজকে কলুষিত করে রাখা।নারী বা শিশু ধর্ষণ মানে একটি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা। দেশের বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। দেশের শিশু কিশোরদের মানসিকতাকে বিধ্বংস করে রাখা। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং রাষ্ট্রকে বিকারগ্রস্ত পঙ্গু করে তোলা। একটি অনৈতিক দেশ ও জাতিতে পরিণত করতে পারে কিছু সংক্ষক ধর্ষকে। এদের দ্বারা সমাজ সংসারে কোন মঙ্গল হতে পারে না।বরং বার বার একই কাজের চেষ্টা এরা করেই যাবে। সুতরাং রাস্ট্র কেন এই সব কুলাঙ্গারের ভার বহন করবে? আমরা কেন করবো? এদের তাৎক্ষণিক ফাঁসি দেয়া হোক। এদেরকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া না হলে আইনের শাসনের প্রতি আমজনতার আস্থা কিছুতেই ফিরবে না। আর এমনটা কোন রাষ্ট্রের জন্যেও মঙ্গলজনক হতে পারে না।

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুতে ঢাবি শিক্ষার্থীর আবেগঘন চিঠি

আরিফ চৌধুরী শুভ :: হারিয়েছি না হেরে গেছি আমরা? আ্যাম্বুলেন্স চলছে সারেইন ...