আমিনুল ইসলাম সেলিমের ‘ঘোর’

আমিনুল ইসলাম সেলিম

আমিনুল ইসলাম সেলিম :: শিকারী শেয়ালের চোখের মতো ধূর্ত রাতের মফস্বলি আধারে দমকা হাওয়া বইছে অনেকক্ষণ। ঝড়ের সম্ভাবনা প্রবল হলেও সকল ভয়-কাতরতা এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলে দীপু পথে নামে। মোবাইলটর্চের আলোয় নিজের অসহিষ্ণু চোখকে পথ দেখাতে দেখাতে সামনে এগোয়। হাওয়ার গতি বাড়ার তালে বাড়ে দীপুর হাঁটার গতিও। আচানক স্বপ্নের ভেতরে ডুবে থেকেও আজ সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আজ পারতেই হবে।

সোজা রাস্তার শেষে বাঁয়ে বাঁক নিতেই একটা শেয়াল পেছন থেকে দৌড়ে পালালে মুহুর্তে একঝাঁক শেয়ালের হাঁকহাঁকি বেশ ভয়ের আবহ ছড়িয়ে দেওয়া পর্যন্তও ঠিক ছিলো। কিন্তু টর্চলাইটের তীব্র আলো ফেলে দ্রুত কাউকে এদিকেই আসতে দেখলে,  বুকের ভেতর ঢেঁকি ওঠানামা করতে থাকে যেনো। লুকোনোর ধান্দা করে দীপু। কোনদিকে যাবে?

উত্তরে শেয়াল, দক্ষিণে পানিভর্তি খাল। পেছনে সরে পূবদিকে যাবে? কিন্তু সেদিকে অনেকটা হাঁটতে হবে। কাছাকাছি একটা ঝোপের মতো আছে। সেখানে সাপ-টাপের ভয় থাকলেও লম্বা করে একটা শ্বাস নিয়ে অগত্যা ঝোপটার পেছনেই গিয়ে দাঁড়ালো। লোকটা কাছে এসে দীপুর ধারণাকেই সত্যি করলো।  জানোয়ারটাই। অমৃতার ভাই। এতো রাতে শালা যায় কোথায়? যেখানে ইচ্ছে যাক। ধরা পড়লে যে রক্ষা ছিলো না এবং সে আপাতত ধরাছোঁয়ার সম্ভাবনারও বাইরে- এটা ভেবেই বুকে জোরে ফুঁ দিয়ে নিলো। সাপ বা শেয়াল কেউ তাকে না পেলেও মশা ঠিকই খাজনা আদায় করে নিয়েছে।

লোকটা প্রায় অদৃশ্য হলে সে দ্রুত রাস্তায় ওঠে। মোবাইলস্ক্রিন দেখালো রাত সোয়া বারোটা। কথা ছিলো ঠিক বারোটায় পৌঁছানোর। উটকো ঝামেলাটা না হলে সময়ের এতোটা হেরফের হতো না। কিন্তু এখন কী হবে! অমৃতা আসবে তো? নাকি ঝামেলা হয়ে যাবে? এমন ভাবতে ভাবতেই অমৃতাদের বাসার পেছনের ছাপড়াটায় ওঠে দীপু। এখান থেকে অমৃতার ঘর সরাসরি দেখা যায়। অনেকবার এসে দেখা করেছে। কিন্তু এখন অমৃতার কক্ষের দিকে তাকিয়ে সে ভড়কে গেলো। আলো নেই, নিঝ্ঝুম।

কী ব্যাপার!

ঘুমিয়ে গেলো নাকি?

ফোনটা হাতে নিলো। কল করতে কড়াকড়ি নিষেধ থাকলেও এখন উপায় নেই। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কল করলো।

রিং হচ্ছে, ধরছে না। কিছুক্ষণ কেটে গেলো এভাবেই।

দীপু বসে বসে ঘামছে। আজ কি সত্যিই পারবে সে?

পেছনে দুবার খচখচ শব্দ হলে কান খাড়া হয়ে গেলো ইঁদুরের মতো। এসব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই; দীপু জানে।

এর আগে যতোবার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে, ততোবারই ব্যর্থ হয়ে অমৃতার হাতে গুঁজে দিয়ে গেছে একটা করে খাম। কিন্তু আজ খাম নিয়ে আসেনি। অমৃতা আল্টিমেটাম দিয়েছে, আজ না হলে আর কোনোদিনই না। ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির লাগছে দীপুর। কান্নাও পাচ্ছে কিছুটা। অমৃতার সাড়া পাচ্ছে না। ওদিকে আবার শালাটা ফিরে আসে কি না, সে ভয়ও আছে। কী করবে সে? পালাবে নাকি?

পুনরায় কাছাকাছি খচখচ শব্দে চমকে ওঠে দীপু। চমকানোর পরের দৃশ্য তাকে আরও বেশি চমকে দেয়। দেখে, অমৃতা পাশে দাঁড়ানো। অমৃতা চুপচাপ মুখোমুখি গিয়ে বসে। তারপর সোজাসুজি বলে, শুনো, লেট ফি মওকুফ। মূল কথায় আসো। সাবধান! আজ কিন্তু এক্সফেল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বলো।

দীপু কিছুই বলতে পারে না।

অমৃতা তাগিদ দেয়।

একবার

দুবার

তিনবার।

অাচমকা দীপু এসে ঝাপটে ধরে অমৃতাকে। অবুঝ শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

আমি কিচ্ছু বলতে পারবো না। কিচ্ছু না। শুধু এটুকু জানি, তোমার বাইরে আমার কোনো পৃথিবী নেই। আমি মনের কথা বলতে এসে প্রত্যেকবার তোমাকে খালি খাম দিয়েছি। কেনো জানো? কারণ তুমি ছাড়া আমার পৃথিবী শূন্য।

অমৃতাও ঝাপটে ধরে দীপুকে। মনে মনে বলে, ধুর পাগল, তোমাকে এতোকিছু বলতে কে বলেছে?

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘সাইমন জাকারিয়া নিরপেক্ষ গবেষক নন’

ডেস্ক রিপোর্ট ::  সরলপুর ব্যান্ডের ‘যুবতি রাধে’ গানটি নিয়ে সম্প্রতি বাংলা একাডেমির ...