‘আমার বিজয়ের গল্প’ও কিছু কথা

'আমার বিজয়ের গল্প'ও কিছু কথা
রহিমা আক্তার মৌ :: জীবনটাই আনন্দ বেদনার একটা বাস্তব নাট্যমঞ্চ। এখানে কেউ হারে কেউ জিতে। তাই বলে সবাই যেমন হারে না, সবাই যেমন জিতে না। তেমনি যারা জিতে তাদের সব কিছুতেই জয় থাকেনা, যে হারে সে সব দিক দিয়েই হারেনা। ফেইসবুকের একটা পোস্ট চোখে পড়ে, লেখা চেয়ে বিজ্ঞাপন। বড় অক্ষরে লেখা ‘আমার বিজয়ের গল্প’ চোখের পাওয়ার তো ঠিকই আছে। তবুও আমি দেখি লেখা, ‘বিজয়ের গল্প’ ধরেই নিয়েছি সামনে বিজয়ের মাস, নিশ্চই বিজয়ের গল্প চেয়েছে। দ্রুত কলম নিয়ে বসি, দুঃখিত ট্যাব নিয়ে বসি। আমি ট্যাব আর মোবাইলেই লিখি। কম্পিউটার ল্যাপটপ চালাতে পারিনা বলে মোবাইল ল্যাপটপ ভরসা। এই দুটোই গিফট করেছে বড় বোন। মুহূর্তে লিখে ফেলি ‘বিজয়ের আনন্দে ফিরি নাড়ীর কাছে’ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা। বাবা হলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বিজয় দিবস আসলেই বাবা গ্রামে যান। স্কুলের মাঠে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে বিজয়ের গল্প শুনান। ইদানীং বাবার বয়স হয়েছে যেতে পারেন না। তাই আমরা ছেলে মেয়েরা আমাদের (পরের প্রজন্ম) পরিবারকে নিয়ে বাবার কাছে যাই। বিজয়ের গল্প শুনি।
মুলত এই পেক্ষাপটে গল্পটা লিখে মেইল করি। কিন্তু মেইল গেলেও কি একটা রিপ্লাইতে আসে। যা আমি কিছুই বুঝতে পারি না। রিপ্লাইয়ের স্ক্রিনশট নিয়ে ফেইসবুকের দুই বন্ধুকে দেখেই। তারাও কিছু বলতে পারলো না। আমার তো টেনশান কেন গল্প যাচ্ছে না। গল্প আর মেইল এড্রেস টি দিই মেয়েকে। বলি, ‘ল্যাপটপ দিয়ে পাঠা’ সে পাঠানোর পর একই কথা আসে। উহ! সব অসহ্য লাগছে। বিজ্ঞাপনটি মোবাইলে সেভ করা। আবার দেখতে থাকি। উমা! এতো চেয়েছে নিজের বিজয়ের গল্প। নিজেই হাসলাম। ভাবলাম আমার কোন বিজয়ের কথা লিখবো। আমি ছাড়া মা বাবার বাকি তিন সন্তান নিজেদের স্ব স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত, লেখাপড়ায় ফাঁকিবাজ আমি কিছুই তো হতে পারিনি। অতঃপর নিজের বিগত দশ বছরের লড়াই ও নয়টি বইয়ের বিজয়ের গল্প লিখি, ‘নীড় ছোট ক্ষতি কি’। এই দশ বছরের অনেক বাঁধা আর আমার লড়াই নিয়েই গল্পটি। এতো দ্রুত গল্পটি লিখবো ভাবিনি। মানে এতো সকাল পাঠকের সামনে আমার লেখালেখির লড়াইয়ের কথা প্রকাশ করবো চাইনি।
কিন্তু লিখে ফেললাম। অবশ্য ‘লেখক সম্মানীর চেক ও ব্যাংক একাউন্ট’ নামে আমার আরেকটা গল্প আছে, তার শব্দ সংখ্যা বেশি বলে তা দেয়া হয়নি। ‘নীড় ছোট ক্ষতি কি’ গল্পটা পাঠালে মেইল ঠিক চলে যায়। অপেক্ষায় আছি গল্পটি মনোনীত হবে কি হবে না সেই প্রত্যাশায়। ২২ জানুয়ারি বিকেল থেকে সন্ধ্যা কোন এক সময় আমার মোবাইলে দুটো কল আসে। আমি ধরতে পারিনি। রাত আনুমানিক নয়টা সাড়ে নয়টার দিকে মোবাইলের কল দেখি। বলে রাখি পত্রিকায় বা লেখার সাথে আমি যে নাম্বার ব্যবহার করি তা সব সময় সাইলেন্ট থাকে। এটাও আমার একটা লড়াইয়ের কারণ। ওই নাম্বারে কল করি, ওপাশ থেকে বলা হয়, আমার নিজেকে নিয়ে লেখা গল্প মনোনীত হয়েছে। ২৬ জানুয়ারি রোজ শনিবার সকাল নয়টা ত্রিশ মিনিটে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে। খুদেবার্তা পাঠাবে তাও বলেছেন ওপাশের ব্যক্তি।
খবর শুনে দৌড়ে যাই দুই সন্তানের কাছে। যারা আমার লেখালেখির সহযোগী। যারা না থাকলে কখনই আমি আজকের রহিমা আক্তার মৌ হতে পারতাম না। নিজের নামের পাশে সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক শব্দ গুলো বসাতে পারতাম না। অবশ্য এখন আরেকটি শব্দ যুক্ত হয়েছে, তাহলো সম্পাদনা। “আকাশের ঠিকানায় চিঠি” নামে একটা বই সম্পাদনা করি আমি। এরই মাঝে তিনটি সংখ্যা বের হয়েছে। মেয়েরা খবর শুনে খুব খুশি। আমি মোবাইল হাতে ‘আমার বিজয়ের গল্প’ প্রতিযোগিতার ইভেন্টে যাই। দেখি সব সত্যিই। সাথে সাথে যাই গল্পটি পড়তে। গল্প পড়ি চোখের কোনায় জল জমা হয়। ওরা হাসে আমায় নিয়ে। আমিও চোখের কোনায় জল নিয়ে হাসি।
জীবনের কোথাও না কোথাও থাকে বিজয়ের গল্প। কেউ তা বলতে পারে কেউ পারে না। বাঙালি হিসাবে আমাদের বিশাল বিজয় স্বাধীন দেশের নাগরিক। লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের সর্বোচ্চ অর্জন ৭১ এর মহান বিজয়। জাতি হিসেবে এ বিজয় যেমন আমাদের সর্বোচ্চ অর্জন। ব্যাক্তি হিসাবে আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই  রয়েছে কোন না কোন অর্জনের গল্প; বিজয়ের কথা। সেইসব অনন্য অর্জনের গল্প তুলে ধরার মাধ্যমে অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগানোর প্রয়াসে বাংলাদেশে প্রথম বারের মত আয়োজিত ‘আমার বিজয়ের গল্প’ প্রতিযোগিতার। শত শত গল্পের মাঝে বাছাই করা গল্প নিয়ে প্রকাশ হয়েছে ‘আমার বিজয়ের গল্প’ বই। ২৬ জানুয়ারি রোজ শনিবার এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ ও পাঠ উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। অনন্য অর্জনের গল্প তুলে ধরার মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিতে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। শিক্ষা ও পেশা-পোর্টাল ক্যারিয়ার কেয়ার.কম, বাংলাদেশ অরগানাইজেশন ফর স্কিল ডেবেলপমেন্ট (বায়েসড) এর সহযোগিতায় দৈনিক ইত্তেফাক, বরেন্দ্র, ঢাকা এফ এম ৯০.৪, রকমারি.কম, বাংলা কাগজ এ উৎসবের আয়োজন করে। প্রকাশনি বাঙালি, যার কর্ণধার আরিফ নজরুল।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- লেখক, গবেষক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, বিশেষ অতিথি ছিলেন- দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেনসহ কথা সাহিত্যিক ও লেখক দীপু মাহমুদ, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের উপ-পরিচালক মো. আনিসুর রহমান এবং ‘আমার বিজয়ের গল্প’ এর আহ্বায়ক, সম্পাদক ও বাংলাদেশ ব্যাংক এর উপ-পরিচালক নাজমুল হুদা। অনুষ্ঠানে সেরা লেখককে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। আমার বিজয়ের গল্প প্রতিযোগিতার সেরা লেখক-২০১৮ নির্বাচিত হয়েছেন ইজাজ আহমেদ মিলন, গাজীপুর (সাফল্যের শৈলচূড়া)। ২য় সেরা লেখক নির্বাচিত হয়েছেন ফারহা নূর, নোয়াখালী (অপরাজিতা)। ৩য় সেরা লেখক নির্বাচিত হয়েছেন সজীব মাহমুদ, ঢাকা, (ল্যামপোস্ট)। এছাড়া নির্বাচিত অন্য প্রতিযোগীরা হলেন – আছিয়া বেগম ইভা, আহমেদ রউফ, আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ যুবায়ের, আরাফাত তন্ময়, মোঃ ফাহিম হোসেন, আহাদ বিন ইসমাইল, মোঃ সফিকুল আলম, মোঃ শাহীন আলম, তানবীর তূর্য, নবীন আহমেদ, সাঈদ চৌধুরী, তুষার আহমেদ, আমানুর রহমান, বাঁধন কুমার ঘোষ, মোঃ শিহাবুল ইসলাম, রুবেল হোসেন, মাহমুদুল হাসান হৃদয়, জান্নাতি, মোঃ জাহিদুল ইসলাম (মিল্টন), শেখ খলিলুর রহমান। আরো রয়েছেন মুহাম্মাদুল্লাহ, জহিরুল ইসলাম, মুহাম্মদ ইসমাইল, জান্নাতুল ফেরদৌস, সাদীয়া আফরিন, রানা সরকার, নুজহাত জেরিন ইসলাম, সৈয়দ মোদাসসির জাফ, এ কে এম নাসির উদ্দীন, হাসনাত খান রিজভী, মোহাম্মদ আব্দুল হালিম, এস এম মইনুল কবির শিবলী, আমিনা আকতার, মীর মইনুল ইসলাম, জয়নুল হক, শাওন পথিক, শওকত হোসেন, মোঃ মাসুদ রানা ও আমি।
'আমার বিজয়ের গল্প'ও কিছু কথা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা অনেক উন্নত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে পুঁজি করে নিজেদের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হবে। একাত্তরের বিজয়ে যে তরুণরা অবদান রেখেছেন আগামীর বাংলাদেশ সেই তরুণরাই গড়ে তুলবে’।
বিশেষ অতিথি দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, মেয়েদের অবজ্ঞা বা হেয় করার কোন কারণ নেই, সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মেয়েদের মাল্টিটাস্কিং এর ক্ষমতা আছে। সবাইকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখতে হবে। আর শিশুদের ওপর বইয়ের বোঝা কমিয়ে তাদের গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। সে গল্প হোক বিজয়ের গল্প।
কথা সাহিত্যিক ও লেখক দীপু মাহমুদ উনার বক্তব্যে প্রতিযোগীদের সাথে শেয়ার করেন নিজের লেখালেখি শুরুর ও প্রথম বই প্রকাশের সেই বিজয়ের গল্প। শেয়ার করেন কি ভাবে একজন লেখক সেরা লেখক হয়ে উঠেন সেই সব গল্প। অন্যের সমালোচনায় কান দিয়ে সময় নষ্ট না করে নিজের লক্ষে পৌছানোর কথা বলেন প্রতিযোগীদের।
‘আমার বিজয়ের গল্প’ এর আহ্বায়ক, সম্পাদক ও বাংলাদেশ ব্যাংক-এর উপ-পরিচালক নাজমুল হুদা বলেন, ‘সবার সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে এই আয়োজন আমরা চলমান রাখবো’। নৈপথ্য কথন এ তিনি আরো বলেন, ‘এক ঢেলে দুই পাখি মারা’র জন্যই এ যাত্রা শুরু করেছিলাম। ব্যাপারটা খােলসা করি। আমরা জানি অনুপ্রেরণা উভমুখী প্রক্রিয়া। অর্থাৎ একজনের কোন সাফল্য তুলে ধরলে তিনি যেমন আরাে উৎসাহ পান ঠিক তা জেনে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হােন। আমরা এই নীতিটাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলাম। কিছুটা হলেও যে কাজ হয়েছে তার প্রমাণ পেয়েছি সাধারণ মানুষের অসাধারণ সব গল্পের মাধ্যমে। গল্পগুলাে তাদের নিজের জীবনের। নিজের হাতে সযতনে লেখা অর্জনের কথা। সামগ্রিক বিচারে অর্জনগুলাে হয়তাে ক্ষুদ্র কিন্তু এক জীবনে এখন পর্যন্ত সেটাই সেরা অর্জন; বিজয়ের গল্প। যেমন কেউ পরীক্ষায় ভালাে ফলাফল করার গল্পও পাঠিয়েছেন। আবার লেখালেখি বা অন্যকোন সাংস্কৃতিক প্রতিযােগিতায় পুরস্কার কিংবা চাকরি পাওয়ার কথা লিখেছেন। কেউবা শত প্রতিকূলতা ঠেলে, দুর্ঘটনা মাড়িয়ে নিজের পায়ে দাড়িয়ে জীবনে সুদিন ফেরানাের মর্মস্পষী গল্পও তুলে ধরেছেন। সব লেখা প্রকাশ করা বা সবাইকে পুরস্কৃত করা হয়তাে সম্ভব নয়-কিন্তু নিজের গল্প তুলে ধরার যে সাহস দেখিয়েছেন তা তাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে অনেকদূর। ছাপা অক্ষরে যাদের লেখা প্রকাশ হল তা পড়ে তারা নিজেরা তাে বটেই অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সেই অনুপ্রেরণামূলক অনন্য অর্জনকে সম্মান করতে পেরে আমারও আনন্দিত, গর্বিত। বিজয়ের কেতন উড়িয়ে নতুনের এই পথচলা এখানেই শেষ নয়। আশা করি আগামীতেও ‘আমার বিজয়ের গল্প’ আয়ােজন নতুন প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে বিজয়ের পথে এগিয়ে যাবার।’
সবশেষে প্রধান অতিথি বিশেষ অতিথি সহ মঞ্চে উপস্থিত সবাইকে আমার সম্পাদনার বই “আকাশের ঠিকানায় চিঠি” র তিনটি সংখ্যাই তুলে দিই। উক্ত তিন সংখ্যায় ১২৫ টি চিঠি রয়েছে। যেগুলো লিখেছেন দেশের সম্মানিত লেখক লেখিকা সহ অনেকে।
লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার

স্টাফ রিপোর্টার :: দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে ২০২৩ সালের মধ্যে ...