এনজিও সম্পাদক, সোহানুর রহমান ::

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ঢাকা: “আমরা আর বিশ্বনেতাদের ফাঁকা বুলি শুনতে চাই না, সময় এসেছে কার্বন ও বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়ে তোলার”-   স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে দেশের নানা প্রান্তে ১৫ জেলায় ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস ও ফ্রাইডেস ফর ফিউচার বাংলাদেশের বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট পালন করেছে তরুণেরা।

বিশ্বনেতাদের কাছে তাদের দাবি, কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য জীবাশ্ম জ্বালানীতে বিনিয়োগ বন্ধ করে সবুজ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানীতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, একই সঙ্গে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন থেকে এ দাবি করা হয়। এই ধর্মঘটে প্রায় শতাধিক তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিসহ ১৫ জন তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। মানববন্ধন থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১.৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে চাপে রাখাসহ প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন একশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার-ইয়াং পিপল নাজমুল আহসান, ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের সমন্বয়ক সোহানুর রহমান, ঢাকা ইউনিট সমন্বয়ক রুহুল আমিন রাব্বি, ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি খাদেমুল রাশেদ, ট্রান্সজেন্ডারদের সংগঠন জীবন গঠন উন্নয়ন সংস্থার রফিকুল ইসলাম রয়েল, প্রতীকি যুব সংসদের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ময়ূরী আক্তার টুম্পা প্রমুখ।
ধর্মঘটে বক্তারা বলেন, কার্বন নিঃসরণ কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর বিদ্যুতে বিশ্বের উন্নত দেশ এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান বহুদিন ধরেই কার্বন নিঃসরণ কমানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, জেনারেল ইলেকট্রনিক্স, সুমিটোমো করপোরেশন, জাইকা, এইচএসবিসি ব্যাংক এর মধ্যে অন্যতম। ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস এদের জলবায়ু দূষণে একটি বৈশ্বিক সংঘ বলে উল্লেখ করছে। তাই বিভিন্ন দূষণকারী দেশ এবং সংস্থাকে জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়নে নিরুৎসাহিত করতে ধর্মঘট থেকে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি ফেইক অ্যাওয়ার্ড বা কটাক্ষমূলক পুরস্কারের আয়োজন করা হয়।

দেশের ১৫ জেলায় এই জলবায়ু ধর্মঘটের আয়োজকরা ফ্রাইডেস ফর ফিউচারের বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘটের ডাকে একাত্মতা প্রকাশ করে এবং বিশ্বের এক হাজারেরও বেশি জায়গায় তরুণরা রাজপথে ও অনলাইনে যে ধর্মঘট পালন করছে, তার সঙ্গে সংহতি জানায়। এ বছর দেশের যে ১৫টি জেলায় একযোগে বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট পালন করা হয়েছে, সেগুলো হলো: ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, কক্সবাজার, বাগেরহাট, সুনামগঞ্জ, ঝালকাঠি, মৌলভীবাজার, নোয়াখালি, পটুয়াখালি, সাতক্ষীরা, ফেনী ও শরিয়তপুর।  স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণেরা নিজেদের হাতে আাঁকা ব্যানার-ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে মানববন্ধন, পদযাত্রা, গল্পবলা-গান-বাজনা ও নাটকের মধ্য দিয়ে জলবায়ু সংকটকে তুলে ধরে।  তরুণদের এ কাজে সহযোগিতা করে তাদের অভিভাবক ও এলাকার লোকজন।

বাংলাদেশে বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘটের সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, “চলমান করোনাভাইরাস মহামারীতে জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয় এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বিশ্বজুড়ে তরুণেরা আজ আবারও রাজপথে নেমে এসেছে জলবায়ু সংকট নিরসনে বিশ্বনেতাদের নিষ্ক্রিয়তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে।  আমরা শুধু জলবায়ু সংকটের সমাধান চাই না, আমরা চাই বিশ্বজুড়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শ্রেণি নির্বিশেষে সকল বৈষম্যের অবসান।  তাই এবার আমরা বৈষম্যের এই প্রথা ভাঙ্গার (#UprootTheSyetem) ডাক দিয়েছি। ”

আয়োজক রুহুল আমিন রাব্বি বলেন, “গত আগস্টে জাতিসংঘের আইপিসি প্রতিবেদনে জলবায়ু সংকটকে মানবজাতির জন্য ‘লাল সংকেত’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।  যদি আমরা গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন ব্যাপকহারে কমাতে না পারি, তবে আমাদের জন্য চরম দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে।  আর নির্গমন কমানোর জন্য সবার আগে জলবায়ু সংকটের এই বৈশ্বিক সংঘকে এগিয়ে আসতে হবে।  তারা এতোদিন শুধু কথাই বলেছে, আমরা এবার কাজ দেখতে চাই”।

কক্সবাজার: বৈশ্বিক ধর্মঘটের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে সায়মন বিচ পয়েন্টে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক দেওয়ালে অঙ্কিত জলবায়ু সচেতনমূলক আর্ট করা হয়। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে কক্সবাজারে আগত বিভিন্ন পর্যটন ও স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার জন্য  জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ক্ষতি এবং সমাধানগুলো আর্টের মাধ্যমে  তুলে ধরা হয়।

বরিশাল: সকাল ১০টায় সদর রোডে ধর্মঘট শেষে পদযাত্রা করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গিয়ে বরফের ওপর প্রতীকি ফাঁসি নেন শিক্ষার্থীরা। ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস বরিশাল ইউনিটের সমন্বয়ক কথক বিশ্বাস জয় এর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) প্রশান্ত কুমার দাস, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সভাপতি অধ্যাপক সাহ্ সাজেদা, বরিশালের ভোরের আলোর সম্পাদক সাইফুর রহমান মিরণ, প্রতীকী যুব সংসদের অর্থ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হোসেন নবীন উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু জাফর মো. সালেহ্ প্রমুখ।

সিলেট: সিলেটঃ বৈশ্বিক জলবায়ু আন্দোলন, ফ্রাইডেস ফর ফিউচারের আহ্বানে ডাকা ‘ গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক’ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জলবায়ু ধর্মঘট করেছে সিলেটের একদল তরুণ। শুক্রবার সকালে সিলেট নগরীর কীনব্রীজ এলাকায় সমবেত তরুণরা নানা দাবি সম্বলিত প্লাকার্ড নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে। ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস সিলেট ইউনিটের সমন্বয়ক দেলওয়ার হোসেন মান্না’র সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম।  ঘণ্টাব্যাপি এই জলবায়ু ধর্মঘটে উপস্থিত ছিলেন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস সিলেট ইউনিটের সহ-সমন্বয়ক নাজমুন নাহিদ, ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ পক্ষে রাশেদ আহমদ, ইয়ুথ নেটের হুমায়রা জেবা, মাইশা নেওয়াজ, তামিম আহমেদ সাজন আহমদ প্রমূখ।

সাতক্ষীরা: শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের শহীদ মিনারে বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘট দিবস উপলক্ষে সুইডিশ পরিবেশ আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের সাতক্ষীরা ইউনিটের সমন্বয়ক এস এম শাহিন আলমের সভাপতিত্বে ও সাতক্ষীরা স্টুডেন্ট সোসাইটির সভাপতি শেখ শাকিল হোসেনের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন- দৈনিক দক্ষিণের মশালের সম্পাদক আশেক-ই-এলাহী, স্বদেশের নির্বাহী সম্পাদক মাধব চন্দ্র দত্ত, সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আনিসুর রহিম, ভিবিডি সাতক্ষীরার সভাপতি সুব্রত হালদার, তামান্না তানজিম প্রমুখ। জলবায়ু প্রভাবে সাতক্ষীরার উপকূলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানবক্ষতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে কর্মসূচিতে বক্তরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গোটা বিশ্ব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনিতে ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। বিশ্বনেতারা এ বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না। এ সময় প্রতীকী ফাঁসিতে ঝুলে জলবায়ু সঙ্কট তুলে ধরেন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের স্বেচ্ছাসেবক শাহিন সিরাজ।

ফেনী: ফেনী : বিকালে ফেনীর ট্রাংক রোড কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে শতাধিক জলবায়ু যোদ্ধা ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে।এসময় সমবেত জলবায়ু যোদ্ধারা নানা দাবি সম্বলিত প্লাকার্ড নিয়ে জলবায়ুর ন্যায্য দাবীতে বিভিন্ন স্লোাগান দিয়ে তাদের দাবী প্রদর্শন করে। ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস ফেনী ইউনিটের সমন্বয়ক এস জেড অপুর সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন ইয়ুথনেট ফেনী ইউনিটের সহ- সমন্বয়ক মোহাইমিনুল ইসলাম জিপাত, জলবায়ু যোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান মুরাদ ও ইমাম উদ্দিম আহমেদ ইমন। এসময় ইয়ুথনেট ফেনী ইউনিটের জলবায়ু যোদ্ধা এবং বিভিন্ন উপজেলা ইউনিটের জলবায়ু যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন ।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here