ব্রেকিং নিউজ

আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যে প্রবেশাধিকার দিবস: সংকটকালে তথ্যে প্রবেশাধিকার

হীরেন পণ্ডিত :: বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ মহামারী সময়ে, ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রতিবছরের মতো এবারো ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যে প্রশোধিকার দিবস (আইডিইউএআই)। ইউনেস্কোর ২০২০ সালের প্রতিপাদ্য হলো সংকটকালে তথ্যে প্রবেশাধিকার।

তথ্যে প্রবেশাধিকার- জীবন বাঁচানো, বিশ্বাস সৃষ্টি করা, আশা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া! এই শ্লোগানটিতে এই বিষয়গুলোকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উদ্যোগটি তথ্যে প্রবেশাধিকার সম্পর্কে ভাল অনুশীলনগুলো এবং গাইডলাইনগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বিশ্বব্যাপী দিবসটির কার্যক্রম বর্তমান করোনা মহামারীতে জীবন রক্ষায় এবং এর প্রভাব  হ্রাস করার পাশাপাশি টেকসই নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে তথ্যে প্রবেশাধিকারের মূল ভূমিকাটিকে তুলে ধরবে।

সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য প্রাপ্তি জীবন-মৃত্যুর বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে, অনেক দেশের জনগণ এ বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। তথ্যে প্রবেশাধিকার নাগরিকদের সংকটকালীন সময়ে পদক্ষেপ গ্রহণ যেমন: ভ্রমণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংবিধিবদ্ধ নিয়মকানুন পালন, ভাইরাস পরীক্ষা করানো, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক সহায়তা বা প্রণোদনা প্রাপ্তি সহজলভ্য করে।

প্রতিবারের মতো এবারো তথ্য কমিশনের উদ্যোগে দেশব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক তথ্যে সর্বজনীন প্রবেশাধিকার দিবস-২০২০। উক্ত দিবস যথাযথভাবে উদযাপন এবং এর গুরুত্ব অনুধাবনে তথ্য কমিশনের এবারের প্রতিপাদ্য হলো সংকটকালে তথ্য পেলে জনগণের মুক্তি মেলে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী দেশের মালিক এদেশের জনগণ। সুতরাং দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত তথ্য জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। তাই তথ্যে অবাধ প্রবাহ সৃষ্টি এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের দেশে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ পাশ করা হয়েছে। এই আইন অনুসারে আপনি তথ্য চাইলে কর্তৃপক্ষ তথা-সব সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান আপনাকে তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য।

তথ্য অধিকার জনগণের ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা আবশ্যক। জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হলে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

তথ্য অধিকার আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে, কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার থাকবে এবং কোন নাগরিকের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে।

জনগণ ও দেশের স্বার্থেই দেশের নিরাপত্তা, অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক; বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অধিকার; আইনের প্রয়োগ; অপরাধ বৃদ্ধি; জনগণের নিরাপত্তা;সুষ্ঠু বিচারকার্য; ব্যক্তিগত গোপনীয়তা; আদালতের নিষেধাজ্ঞা; আদালত অবমাননা; তদন্তকাজে বিঘ্ন; জাতীয় সংসদের  বিশেষ অধিকারহানি; মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত ইত্যাদি বিবেচনায় কতিপয় তথ্য প্রদানকে বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছে। সরকার  জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তথ্য অধিকার প্রয়োগ করার বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেছে।

তথ্য অধিকার আইন আপনার জন্য। তথ্য চেয়ে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এখন জরুরি বিষয়। এই তথ্য অধিকার আইন ব্যবহারে উৎসাহ প্রদানে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সঙ্কটের সময়ে তথ্য জীবন বাঁচায়। কভিড-১৯ এর কারণে আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি মানুষের কাছে সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কতটা জরুরি। কভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন সময়ে মানুষ জানতে ও বুঝতে পেরেছে তাদের কি করা উচিত এবং প্রয়োজনে কোথায় যেতে হবে, কোথায় সহায়তা পাওয়া যাবে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়া কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তথ্যে প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, কভিড-১৯ মহামারীতে জনগণকে সচেতন করার জন্য কমিউনিটি রেডিওগুলো এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের ১৮টি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন এবং দু’টি অনলাইন রেডিও স্টেশন নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং অভিযোজনের জন্য ১৬৫ ঘন্টা প্রোগ্রাম সম্প্রচার করছে।

প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন মিডিয়া ও কমিউনিটি মিডিয়া কভিড-১৯ প্রতিরোধ বিষয়ে প্রচারণার ফলে জনসচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি  ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে জনমনে এ বিষয়ে যে আতঙ্ক ছিল তা ধীরে ধীরে দূর হচ্ছে এবং জনসাধারণ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এখন তারা এ সম্পর্কে তথ্য পেয়ে সচেতন হচ্ছে। ফলে  প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন মিডিয়া ও কমিউনিটি মিডিয়া বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের কাছে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

তবে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ সালে পাশ করা হলেও এখনো কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ২০১০ সালে  তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রবিধানমালা এবং ২০১১ সালে অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তি সংক্রান্ত প্রবিধানমালা ২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে। মূলত: নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তথ্য অধিকার আইন স্বীকৃতি লাভ করেছে।

তবে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকার ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ কাজ করছে, তথাপি কিছু চ্যালেঞ্জ পরিলক্ষিত হয়। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তথ্য প্রদানকারীদের সংবেদনশীলতার অভাব, আইনের বিষয়ে কর্মকর্তাদের জানার ঘাটতি, সাধারণ জনগণ ও তরুণ সমাজের সচেতনতার অভাব রয়েছে এবং এ আইন সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা কম থাকায় জনগণের মাঝে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে।

এই তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা চালানো জরুরি বিশেষ করে সাধারণ জনগণ ও যুব সমাজের মাঝে। কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও জরুরি এবং যোগ্য ও সর্বাধিক তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তাদের আরো বেশি করে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এইভাবে সমন্বিতভাবে প্রচার-প্রচারণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হলে এই আইনের সাফল্য জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হলে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

 

 

লেখক, মিডিয়া উন্নয়ন কর্মী, [email protected]

 

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নোয়াখালীতে গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ  

মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল, নোয়াখালী প্রতিনিধি :: নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার পৌরসভা ১নং ...