আজিজুল বারি হেলাল’র সমসাময়িক ভাবনা ‘জৈব অস্ত্রের জৈব সন্ত্রাসঃ বদলে যাবে বিশ্ব’

জৈব অস্ত্রের জৈব সন্ত্রাসঃ বদলে যাবে বিশ্ব

আজিজুল বারি হেলাল

শিশু করোনাভাইরাসের সুতিকাগার নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। কিন্তু বস্তুজগতে আবির্ভাবের পর কোভিড-১৯ নামের ছোঁয়াছে ছাড়পত্র নিয়ে ক্ষুদ্র ভাইরাসটি ছুঠে চলেছে, দেশ হতে দেশ দেশান্তরে। অতপর মানব-মানবী’র অঙ্গ-প্রতঙ্গের কোমল স্পর্শে সহিংস হয়ে সোজা ঢুকে পরে হোমো সেপিয়েন্সের ফুসফুসে।তারপর কোভিড-১৯ নামের ছাড়পত্রের প্রভাবে অসহায় মানুষ নি:শ্বাস- প্রশ্বাস ক্রিয়ায় অক্সিজেনের অভাবে দম ফুরিয়ে চলে যায় পৃথিবী ছেড়ে। কেউ বলছে বাদুড়, গন্ধগোকুল প্রভৃতি প্রাণীর মুখ নি:সৃত লালা বেয়ে ভুমিষ্ট হয়েছে ভাইরাসটি, কেউ বলছে সেখান হতে শিশু ভাইরাসটি বিজ্ঞানের পরীক্ষাগার থেকে অসাবধানতায় লোকালয়ে সটকে পড়েছে। অথবা বনরুই এর শরীর থেকে লাফিয়ে পড়ে ভাইরাসটি মানব-মানবীর দেহে সংক্রমিত হয়েছে।কিন্তু বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে যে মতবাদটি স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো বিজ্ঞানের পরীক্ষাগার থেকে পালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনুজীব ভাইরাস হয়ে নয়, পুরোপুরি লায়েক হয়ে বায়োলজিক্যাল উইপেন বা জীবাণু অস্ত্র হিসাবে।

পৃথিবীতে এযাবৎকাল বিজ্ঞানের কৃৎ কৌশলে প্রাণ-প্রকৃতি বিধ্বংসী যত প্রকার মারাত্মক মারনাস্ত্র মানুষ তৈরী করেছে, দৃশ্যত অভিভাবক হীন এই জীবাণু অস্ত্রটির অন্যান্য মারনাস্ত্রের তুলনায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট রয়েছে।
আধুনিক কালের, মিসাইল, ব্যালিষ্টিক মিসাইল, রকেট ল্যান্চার, পারমানবিক বা রাসায়নিক প্রভৃতি অস্ত্র প্রয়োগ করতে যন্ত্র বা প্রযুক্তিতে দক্ষ সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত জনবলের প্রয়োজন হয়। এই সকল মারনাস্ত্র সুচিন্তিত একটি বিশেষ কতৃপক্ষীয় অনুমতিতে সুপরিকল্পিত ভাবে একটি সুনিদৃষ্ট পরিসরে প্রান-প্রকৃতির উপর আঘাত হানে। এবং সীমাবদ্ধ সময়ের জন্য এর বিধ্বংসী প্রভাব সমাজ ও জনপদে বিরাজ করে।
তবে করোনাভাইরাস নামে জীবানু অস্ত্রটি প্রকৃতিতে স্বতস্ফুর্ত উপায়ে কিংবা ল্যাবরেটরীতে জেনেটিক্যালি মডিফাইড হয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে কিনা সে বিতর্ক পাশ কাটিয়ে, নি: সন্দেহে বলা যায় অস্ত্রটির প্রভাব ও সন্ত্রাস কোন নিদৃষ্ট পরিসরে সীমাবদ্ধ নয় বরং দ্রুত বেগে ধাবমান এবং তাবৎ বিশ্বের সর্বত্র বিরাজমান।
সুতরাং যে কোন প্রান্তের মানব-মানবীই নিজের অজান্তে এই জৈব অস্ত্রের আত্মঘাতী বাহক হয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে জীবজগতে এ্যানামেলিয়া পর্বের ম্যামাল বর্গের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান প্রজাতি হোমোসেপিয়ান্সকে।
ফলে দেশে দেশে নির্বিচারে কালে-অকালে ঝরে পড়ছে হাজার-লক্ষ তাজা তাজা প্রাণ।
জড় কিংবা জীব জগতে প্রকাশ্যে দিবালোকে কিংবা আঁধার রাতে যত্রতত্র পড়ে থাকলেও বুদ্ধিমান হোমোসেপিয়েন্স প্রজাতি খালি কিংবা চশমা চোখে দেখতে পায় না আনুবীক্ষনিক এই জৈব অস্ত্রটিকে। মানুষ শুধু এতটুকুই জানে জীবানু অস্ত্রটির কোভিড-১৯ নামে ছোঁয়াছে ছাড়পত্র আছে। সুতরাং এর প্রয়োগ কিংবা ব্যাবহারে সুপরিকল্পিত বা সুচিন্তিত কোন কতৃপক্ষীয় অনুমতির প্রয়োজন নেই। বরং নিজের শারীরিক ছোঁয়ায় প্রান হারানোর সমূহ সম্ভাবনা শুধু নিজের নয় পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ রাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যাপী বসবাসরত মানবগোষ্টীর অনেকের।
যুদ্ধকালীন শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত ও নিরাপত্তার নামে বর্তমান কালে বৃহৎ শক্তির দেশগুলি নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে, প্রাণ-প্রকৃতি বিধ্বংসী নতুন নতুন মারাত্মক পারমানবিক- রাসায়নিক ক্ষেপনাস্ত্র প্রভৃতি প্রস্তুত ও মজুদ করে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।
রাজনৈতিক পরিকল্পনায় দেশে দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে, জাতিতে জাতিতে-গোষ্টীতে গোষ্টীতে সংকট তৈরী করা হয়। আবার সেই সংকট মোকাবিলা ও সমাধানের তত্ত্ব হিসাবে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার থিওরি উদ্ভাবন করে তাদের মজুদকৃত অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি করে দুর্বল সামরিক শক্তির দেশে বহুমুল্যে সেই অস্ত্র বিক্রয় করা হয়।
প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থ উপার্জনের তাগিদে অস্ত্র বেচাকেনার ব্যাবসা চালিয়ে দুনিয়ায় নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এলিট হিসাবে জাহির করে।যা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ-জাতী-গোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক থ্রেট বা হুমকি হিসাবে দেখা দেয়।
এছাড়া অনেক দেশ প্রতিবেশী দেশের তুলনায় সামরিক সরন্জামাদি উৎপাদন ও মজুদে দুর্বল হওয়ায় প্রতিবেশীর হুমকি মোকাবিলায় নিজেদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে এলিটগোষ্টীর কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকার প্রয়োজনীয় অস্ত্র ক্রয় করে। যুদ্ধ ছাড়াও অনেকক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থে এলিটগোষ্টীর সংগে সুসম্পর্ক গড়তে সামরিক অস্ত্র অপ্রয়োজনে বেচাকেনা হয়।
সাধারন চোখে বিমুর্ত জীবানু অস্ত্র করোনাভাইরাস নিজেই সমগ্র বিশ্ববাসীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিপক্ষ।
হোক সে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক এলিট কিংবা সামরিক পরাশক্তি।
জীবানু অস্ত্র করোনাভাইরাসের চারিত্রিক বৈশিষ্ট ফ্রান্ককেইন স্টাইন দানবের মত।তাই পুরনো কায়দায় অস্ত্রের প্রস্তুত ও মজুদ করার ঝুঁকি নিয়ে, শক্তির প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ নেই। তবে জীবানু অস্ত্রটির প্রভাব কমাতে ও বিস্তার ঠেকাতে মেডিক্যাল সাপোর্ট প্রস্তুত ও মজুদ এবং জীবানুটির প্রতিষেধক আবিষ্কার করার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন নতুন এলিট বা এলিটগোষ্টী হিসাবে নিজেকে জাহির করার যথেষ্ট সুযোগ তৈরী হয়েছে। তাই দুনিয়াজুড়ে রাজনীতিক নেতা ও দেশে দেশে শাসক গোষ্টী এবং পুরনো এলিটদের তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে নিশংক চিত্তে শান্তির ঘুম নেই। যত দ্রুত সম্ভব জৈব অস্ত্রটির প্রভাব ও বিস্তার প্রতিরোধে, দিন রাত ল্যাবরেটরীতে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মানব কল্যানে এবং আর্থিক লোভে জীবানুটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধক এবং প্রতিষেধক প্রস্তুত ও মজুদ প্রক্রিয়ার পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ।
সুতরাং যতদিন পর্যন্ত মানুষ করোনাভাইরাস নামক জীবানু অস্ত্র মোকাবেলার পরীক্ষায় পরাজিত হবে ততদিন পর্যন্ত মাটির পৃথিবীতে মানুষের আবাসভুমি থেকে শুরু করে তাদের নির্মিত চলমান সমাজ-সভ্যতা বিপর্যয়কর অবস্হার মুখামুখি হবে। কিন্তু বুদ্ধিমান হোমোসেপিয়েন্স প্রজাতি তার অস্হিত্বের প্রয়োজনে, বদলে দেবে পুরনো সংসার-সমাজ-সভ্যতার ভীত। নতুন সৃষ্টির সুতীব্র চিৎকারে বদলে যাবে মানুষের অভ্যাসগত সংস্কৃতি।এই সময়ে মানুষের যাতায়ত, পারস্পারিক কিংবা সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক এমন কঠিন ও কঠোর নজরদারিতে নিয়ন্ত্রন হবে যে, ভেঙে পড়বে দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামো, বিলুপ্ত হবে পুরনো ঐতিহ্যগত সামাজিক প্রথা। পাল্টে যাবে পারস্পারিক ব্যাক্তি সম্পর্ক গড়ার ধরন অথ্যাৎ রাষ্ট্র দখল করে নেবে সমাজ কাঠামো ও বিন্যাস এবং স্হান করে নেবে পারস্পরিক ব্যাক্তি সম্পর্কের ভিতরে। আত্নঘাতী জীবানু অস্ত্রের বাহক কে তা নির্ণয়ে চালু হবে রাষ্ট্রীয় নজরদারি।স্বাস্হ্য সেবার নামে ব্যাক্তিগত শারীরিক নজরদারিতে মানুষ বন্দী হয়ে যাবে। সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে মানুষ হবে সমাজ বিচ্ছিন্ন জীব।
সুতরাং মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, এই পুরনো কথাটি বদলে মানুষ হবে রাষ্ট্রীয় নজরদারীর অধীনস্হ জীব। সুতরাং রাষ্ট্রের একচেটিয়া নজরদারি সামাজিক ও ব্যাক্তি মানুষের অধিকার হরণ করবে।
এই জীবানু অস্ত্রের জৈব হুমকি বা বায়ো-থ্রেটের সমুচিত জবাব বা মোকাবিলা করতে ব্যার্থ হলে পাল্টে যাবে আমাদের আবাসভুমি পৃথিবীতে মানুষের যাপিত জীবন। জৈব সন্ত্রাস বা বায়ো টেররের ফলে বাঁচার তাগিদে আমদের সামনে আসবে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ।
সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহনে সমাজ-সভ্যতা-দেশ-কালের চিরায়ত ঐতিহ্যের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে বদলে যাবে রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যাবসা বানিজ্য প্রভৃতি।
মুক্ত ময়দানে জনসমাবেশ, পাবলিক মিলনায়তনে কিংবা বিলাসবহুল কনভেনশন সেন্টারে আলোচনা সভা-সেমিনার, ঝলমলে বিপনী বিতান, সুরম্য অট্রালিকার মত শপিংমল কিংবা গ্রাম-গন্জের হাট-বাজারে মানুষে মানুষের যোগাযোগ কলোহল থমকে যাবে।সমস্ত কর্মযজ্ঞের অন্যতম স্হান বা জনপরিসর হবে ভার্চুয়াল জগতের সেলুলয়েডে নির্মিত রঙ্গীন পর্দা।
শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত হবে দুরশিক্ষন পদ্ধতিতে অথ্যাৎ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
বায়োলজিক্যাল উইপেনের সৃষ্ট বায়ো টেররের প্রভাব ও বিস্তার রোধের প্রতিযোগিতায় যিনি সিকান্দর তিনিই হবেন চলমান বিশ্বের নেতা বা গ্লোবাল এলিট।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নোবেলের বিরুদ্ধে ভারতে মামলা দায়ের

ডেস্ক নিউজ :: ভারতীয় টিভি চ্যানেল জি বাংলার রিয়্যালিটি শো ‘সারেগামাপা’তে অংশ ...