অহংকার করার কিছু নেই

মোঃ শাহীন

মোঃ শাহীন :: করোনা ভাইরাস ১৯৬০ এর দশকে প্রথম আবিষ্কৃত হয়। প্রথমে এটি মুরগীতে সংক্রমিত হয়।পরে সর্দি, কাশিতে আক্রান্ত রোগীতে এরকম দুই ধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস দুটি, “মনুষ্য করোনা ভাইরাস ২২৯ই ”  ও “মনুষ্য করোনাভাইরাস ওসি৪৩” নামে নামকরণ করা হয়। তবে এর পর বিভিন্ন সময় এ ভাইরাসের আরও বেশ কিছু প্রজাতি পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০১৯ সালে চীন এসএআরএস-সিওভি-২ পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাসের একটি প্রজাতির সংক্রমণ দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে প্রাথমিকভাবে ২০১৯-এনসিওভি নাম করণ করে।
.
করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এ বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আক্রান্ত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।  হাজার হাজার মানুষ কোভিড-১৯ এ  মারা গেছে। বাংলাদেশও এর প্রভাব থেকে বাঁচতে পারেনি।বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত করা হয় ৮ মার্চ ২০২০। সেদিন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সাংবাদিকদের জানিয়ে ছিলেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত তিনজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে একজন নারী ও দুইজন পুরুষ। তাদের মধ্যে দুইজন ইতালি থেকে সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন। অপর একজন তাদের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তিনি জানিয়ে ছিলেন, আক্রান্তদের মধ্যে দুইজন ব্যক্তি দেশের বাইরে থেকে এসেছেন। দেশে আসার পর তাদের লক্ষ্মণ ও উপসর্গ দেখা দিলে তারা আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করেন। পরে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হলে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। ইতালি থেকে আসা ওই দুইজন দুইটি আলাদা পরিবারের সদস্য। তাদের নমুনা সংগ্রহের সময় পরিবারের আরও চারজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেই চারজনের মধ্যে একজন নারীর করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। আজ সোমবার  (২ জুন ২০২০) পর্যন্ত মোট আমাদের দেশে আক্রান্ত হয়েছে  ৪৭ হাজার ১৫৩ জনে।হুহু করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।
.
করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের জন্য এক অনন্য শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। হয়তো করোনা ভাইরাস  এক দিন থাকবে না কিন্তু তাদের দেয়া শিক্ষা মানুষ কোন দিন ভুলতে পারবে না। আমরা আগে শুনেছি বিপদেই নাকি প্রকৃত বন্ধু চেনা যায়। আজ করোনা ভাইরাস শিখিয়েছে বিপদের দিনে কেউ কারও নয়। কি বন্ধু বান্ধব?  কি আত্মীয় স্বজন? এমনকি নিজের বাবা, মা ও ভাই বোনও যে মহাবিপদের সময় কাজে আসে না তা শিক্ষা দিয়েছে। সত্যিই করোনা ভাইরাস না এলে মানুষ হয়তো এটা অনুধাবন করতে পারতো না।
.
বিভিন্ন ধর্মে বলা আছে, মৃত্যুর পর কেউ কারও আপন থাকে না।  নিজের আদরের সন্তানও পর হয়ে যায়।  মৃত্যুর পর সবাই পর হয়ে যায়। আজকে করোনা প্রমাণ করল মৃত্যুর আগেও মানুষ মানুষের পর হয়ে যায়। কঠিন বিপদের দিনে কেউ কারও আপন নয়।বাবা ছেলের কাছে যেতে পারে না। ছেলে বাবার কাছে যেতে পারে না। মা সন্তানের কাছে যেতে পারে না। সন্তান মায়ের কাছে যেতে পারে না। এটা আমাদের জন্য এক মহান শিক্ষা।
.
একজন ডাক্তার যিনি কিনা অনেক রোগীকে করোনার চিকিৎসা দিয়েছেন। আজ তিনি করোনা আক্রান্ত হলে তিনি সঠিক সেবা পান না।তাই হয়তোবা কেউ কেউ মনের ক্ষোভে বলেন জীবনে শেষ সময়টুকু পর্যন্ত গাছ তলায় বসে হলেও ফ্রীতে মানুষের সেবা করে যাব। শুধু ডাক্তারই নন এমন অনেক মানুষ আছেন যারা করোনার জন্য নিজেকে চিনছেন, আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধব চিনেছেন।
.
করোনা ভাইরাস শিখিয়েছে টাকা পয়সা, বাড়ি গাড়ি, ধন সম্পদ এগুলো সাময়িক, এগুলো কিছু নয়। এগুলো মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে না। জীবন দেয়া ও নেয়ার ক্ষমতা কেবল  সৃষ্টিকর্তার আছে। তিনি চাইলে জীবন দিতে পারেন। আবার চাইলে জীবন নিতেও পারেন। তার ইচ্ছেতেই সব।আমরা জীবনে চলার পথে কত অহংকার করি, কত বাহাদুরি দেখাই। আমার এটা আছে, সেটা আছে।  আসলে বাস্তবে আমাদের কেউ নেই।  কিছু নেই আমাদের।  আমরা খালি হাতে এসেছি।  আবার খালি হাতে ফিরে যাব। আমাদের কর্মই থাকবে।  সঙ্গে কিছুই যাবে না আমাদের।
.
সামান্য একটি ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে প্রাণ দিচ্ছে বিশ্বের কত বড় বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,গবেষক, শিক্ষক, বড় বড় কোম্পানির মালিক।  কোন কিছুর বিনিময়ে তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারছেন না।তাদের টাকা পয়সার অভাব নেই।  তাহলে কেন পারছেন না তারা নিজেদের জীবন বাঁচাতে? আসলে সৃষ্টিকর্তার কাছে ধন সম্পদ, টাকা পয়সা, এসব কিছুই না।আমরা মানব জাতি সৃষ্টির সেরা হয়েও যে আমরা কতটা অসহায় তা মানুষ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
.
কাল পর্যন্ত যে মানুষটা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া রোগীদের সৎকারের ব্যবস্থা করতেন।  আজ কিনা তার নিজের স্ত্রী করোনা আক্রান্ত হলে চিকিৎসা পান না। করোনা আমাদের কতটা অসহায় করে তুলেছে!  হাসপাতালে  ধুঁকে ধুঁকে মানুষ মারা যাচ্ছে। অনেক মানুষ তো রাস্তা ঘাটে পড়েও মারা যাচ্ছে। কেউ কারও কাছে আসে না।  সাহায্য করে না। দূরে দাড়িয়ে দেখে যায়  আসলে মানুষের কিছু করবারও নেই। কারন করোনা এমন এক ছোঁয়াচে ভাইরাস,  যে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করবে সেই আক্রান্ত হবে।  এ ভয়েও সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসে না।
.
কোভিড-১৯ আমাদের এটা শিক্ষা দিয়েছে যে,  কোন কিছুর বড়াই করতে নেই। ধন-সম্পদ, টাকা -পয়সা, বাড়ি-গাড়ি এগুলো সাময়িক। মৃত্যুর কাছে এগুলো তুচ্ছ। মৃত্যু আমোঘ সত্য। কোন কিছুর বিনিময়ে এটাকে এড়ানো যায় না। আজ মারা গেলে কাল মানুষ আর মনে রাখবে না। কিন্তু যদি কোন মহৎ কাজ করে যাওয়া যায় সেই কাজের জন্য মানুষ সারাজীবন মনে রাখবে।
.
কি উন্নত প্রযুক্তি, কি আবিষ্কার, কোন কিছুই কিছু নয়। এগুলো সামান্য! কত প্রযুক্তি, কত আবিষ্কার কোন কিছুই ছোট্ট একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে না। কত দুর্বল আমরা। অথচ কত অহংকার আমাদের! এই ছোট্ট ভাইরাসটির থেকে কি আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত নয় ?
.
.
.
.
.
লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি।
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

৬ মাসে বিরাটের সঙ্গে মাত্র ২১ দিন কাটিয়েছি: আনুশকা শর্মা

ডেস্ক নিউজ :: ভারতীয় ক্রিকেট ও বলিউডে বরাবরের মতোই আলোচনায় বিরাট ও ...

0Shares