অমিত গোস্বামী

অমিত গোস্বামী :: ফোনটা বাজল। স্ক্রিনে চোখ রাখল অগ্নি। টুপুর। বাঙ্গালোর থেকে ফোন করেছে। ফোনটা তুলতেই টুপুর বলল –‘ তুমি নেক্সট মান্থের সেকেণ্ড উইকে ফ্রি আছ? থাকছ কলকাতায়? অ্যাট লিস্ট ফর অ্যান হাওয়ার ?’

‘কেন? আসছ নাকি?’

‘ভাবছি যাব। দু’তিনদিনের জন্যে।‘

‘কেন? কাজ আছে কলকাতায়? ’

‘না, না। তুমি তো জানো রথ দেখতে গিয়ে কলাবেচার অভ্যেস আমার নেই।‘

‘তাহলে? আমাকে মিট করতে আসবে?’

‘ঠিক ধরেছ। জাস্ট টু স্পেন্ড অ্যান হাওয়ার উইথ ইউ। তাই জানতে চাইছি। তুমি তো আবার সেলেব এখন…।‘

‘ওই সময়ে আছি। বাইরে কোথাও যাচ্ছি না। আসতে পারো। সমস্যা নেই।‘

‘বউ-মেয়ের সাথে কোন এনগেজমেন্ট নেই তো ! দেখে বলো। একটি সন্ধ্যে যেন এক্সক্লুসিভ আমার থাকে।‘

‘আট বা নয় তারিখ করো। দিনটা শুধু তোমার জন্যে থাকবে।‘

‘ওকে। দেন মেক ইট এইটথ ইভেনিং।‘

টুপুর অগ্নির প্রথম প্রেমিকা। অগ্নি সবে তখন থার্ড ইয়ার। টুপুর ফার্স্ট। অগ্নি তখন আগুন। টুপুর মফস্বলী গন্ধমাখা। সদ্য শহরে পা দিয়েছে। কলেজ ফেস্ট। অগ্নি গাইবে রক। পিঠে গিটার। ওর অন্যান্য যন্ত্রী বন্ধুরাও হাজির। সে সময় শেখর স্যার এসে অগ্নিকে জিজ্ঞাসা করলেন – একটি মেয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইবে, বাজাতে পারবি? অগ্নি জিজ্ঞাসা করল – কে গাইবে? স্যার বললেন – ফার্স্ট ইয়ার। অগ্নি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল – ওকে, তবে স্যার দ্রুত লয়ের গান গাইতে বলবেন। আমাদের কিন্তু তবলা তানপুরা নেই। স্টেজে ছিপছিপে কাল একটি শাড়ি উঠতেই অগ্নির সব উৎসাহ দপ করে নিভে গেল। মেয়েটি বলল – মায়া বনবিহারিণী। অগ্নি ইঙ্গিতে ড্রামারকে বলল দ্রুত লয়ে ধরতে। মফস্বলী মেয়েটা ধরুক আগে। নিজেও গীটারে ঝংকার তুলল। ঠিক স্পেসে মেয়েটি গান ধরল। চমকে গেল অগ্নি। রবীন্দ্রনাথ এভাবেও গাওয়া যায়? কণ্ঠে মাত হয়ে গেল ফেস্ট। এর পরে অগ্নিরা কি গাইবে?

টুপুর। আলাপ হল। অগ্নিকে শুধু বলল – তোমার গলায় রবীন্দ্রনাথ দারুণ যাবে। এসব অর্থহীন লিরিক গাইছ কেন? অগ্নি বলল – রবীন্দ্রনাথ মায়ের বিষয়। আমি শিখি নি। টুপুর বলল –  আমি শেখাব। তুমি রক উইথ টেগোর একবার গেয়ে দেখ। ফেঁসে গেল অগ্নি। কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু ওর একটা কৌতূহল কাজ করছিল। টুপুর এল। ওদের প্রাকটিস রুমে। এসে  শেখাল ওকে- মাঝেমাঝে তব দেখা পাই। মিউজিক লো ডাউন করে দিল। কিছুদিনের মধ্যে অগ্নির শো হল শিশির মঞ্চে। রক উইথ রবি কাকা। বাবা বললেন – বিশ্বপাকা। ফুক্কুরির সীমা আছে। একে রক, তায় রবি ঠাকুরকে কাকা! টুপুর বলল – ভেবো না।

মা এসেছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে টুপুরকে খুঁজলেন। অনুষ্ঠান পুরো হিট, ফুল রকিং। কিন্তু মা টুপুরকে পেলেন না। সে ততক্ষণে ন’টা দশের ব্যারাকপুর লোকালের লেডিজ কামরায়। সেই শুরু অগ্নির এগিয়ে যাওয়ার। ফিল্মেও অফার এল। পড়াশুনো ততদিনে সাঙ্গ। অগ্নি রে ক্রমেই নাম হয়ে উঠেছে। একদিন অগ্নি টুপুরকে বলল – মা, তোমায় একদিন বাড়িতে যেতে বলেছেন। কবে যাবে? টুপুর নিঃস্পৃহ কণ্ঠে বলল – ঠিকানাটা দাও। আমি দেখা করে নেব। অগ্নি বলল – তা কি করে হয়? আমি নিয়ে যাব। এ কী বীমা বিক্রির অ্যাপয়েন্টমেন্ট? টুপুর বলল – কুল বস। ঠিকানা দিতে অসুবিধে আছে? অগ্নি ঠিকানা বলে দিল। দিন কয়েকের মধ্যে বাড়ি ফিরে অগ্নি শুনল যে টুপুর এসেছিল। সারা দুপুর খুব হৈ হৈ করে গেছে। মা’কে শান্তিনিকেতনের একটা উত্তরীয় দিয়ে গেছে। কাঁথা স্টিচের। মা খুব খুশি। বললেন – মেয়েটা বেশ মিষ্টি। গায়ের রঙ সামান্য চাপা হলে কী হবে। কী সুন্দর গানের গলা। অগ্নির সাথে ভাল মানাবে। বাবা বললেন – তুমি মুক্তোর মালার স্বপ্ন কম করে দেখলেই ভাল। যা তোমার ছেলের গান, সাজ পোশাক, বাপ রে।

দেশে তখন হার্ড রক গানের বেশ রমরমা। অগ্নির মলাটের বেশ পিছনেই চলে গেছেন  রবীন্দ্রনাথ। টুপুরও আসছে না। অগ্নির গানের বেশ নামডাক। ক্যাসেট সিডি চলছে হুড়হুড় করে। প্রচুর শো। ইনকাম সলিড। টুপুরের সাথে ফোনে কথা হয়। টুপুরের একটা রবি ঠাকুরের গানের শো ছিল সদনে। ফোনে নেমন্তন্ন করেছিল। অগ্নি মা’কে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সাথে বাবা। মা শো দেখে বেশ উৎফুল্ল চিত্তে ফিরলেন। অগ্নিকে বললেন যে টুপুরের বাবা’মা আসবেন সামনের রবিবার, অগ্নি যেন বাড়ি থাকে। রবিবার এল। অগ্নি নেই। রেকর্ডিংয়ের ডেট নিয়েছিল। টুপুরের বাবা’মা এলেন। অগ্নির মায়ের দেওয়া বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। বলে গেছেন টুপুরের মতামত নিয়ে জানাবেন। কিন্তু ওদের বাড়ি থেকে কোন উচ্চবাচ্য নেই। একদিন টুপুরের ফোন এল।

–      শোন, মাসীমাকে একটা কথা বলে দিও। আমি বিয়ের কথা এখনও ভাবছি না। মাস্টার্স করে রিসার্চের ইচ্ছে আছে। পরে ভাবা যাবে।

–      টুপুর। কে বলেছে তোমায় এখনই বিয়ে করতে? মা চেয়েছিলেন-

–      কমিটমেন্ট। সেটার কি দরকার? আমাদের মধ্যে ভালবাসাবাসি তো নেই। বন্ধুত্ব আছে। ব্যস। তাই থাক। পরে লেট মি গেট সেটলড। তুমি যদি ততদিন…।

–      যা বাবা। নিয়মিত দেখা হবে না, সাক্ষাৎ হবে না, কবে তুমি সেটলড হবে, আমায় তা ধরে বসে থাকতে হবে!

–      অগ্নি, আমি তোমায় কোন নিয়মে আটকাতে চাই না। তুমি পারবেও না। তার চেয়ে সময় ঠিক করবে আমাদের নিয়তি। আপাতত এসব কাহিনী বাদ দাও।

অগ্নির মেল ইগো তাকে মায়ের কাছে মিথ্যে বলতে বাধ্য করল। সে মা’কে বলল – ওরা গভর্নমেন্ট চাকরিওলা খুঁজছে। আমার মত গানওয়ালা নিয়ে খুঁতখুঁত আছে হয়ত। বাবা বললেন – আমি মেয়ের বাবা হলে গরমেন্ট চাকুরেই খুঁজতাম।

তারপরে দিন এগোল দিনের মত। গায়কযশ তুঙ্গে থাকতেই অগ্নি বিয়ে করে ফেলল তৃষাকে। তৃষা সরকারি অফিসার। বাবা বললেন – যাক, অগ্নির বুড়ো বয়েসে বউয়ের পেনশন তো থাকল। না খেয়ে তো মরবে না। অগ্নি এই কথা ভেবে এখনও হাসে। পশ্চিমি গানের প্রতি এখনকার বাবা-মার খুব ঝোঁক। কাজেই শো কমে গেলেও বা সিডি বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলেও অগ্নি কলকাতার নামি ইনসট্রাকটর। ফিল্মের নামী মিউজিক অ্যারেঞ্জার। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ওরই করতে হয়। আয়পয় ভালই। নিজেকে দ্রুত পালটে ফেলার গুণেই নিজের স্টার ইমেজটা অনেকটাই ধরে রাখতে পেরেছে।

আট তারিখ সকালে টুপুর ফোনে জানাল যে এসে গেছে কলকাতায়। সন্ধ্যায় ওরা ফ্লুরিজে মীট করছে। আর বলল যে আগের দিন যে স্কার্ফটা গলায় দিয়ে সে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কারটা নিয়েছে সেটা পরে আসতে। অগ্নি খুশি হল। টুপুর তার খোঁজখবর রাখে। অগ্নি এতদিন নিজের কাছে হেরে বসেছিল। টুপুর তার জীবনের একমাত্র মেয়ে যে ভদ্রভাবে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু আজ সে নিজের জয় দেখবে। এতদূর টুপুর আসছে যখন তার বুকেও নিশ্চয়ই একটা ক্ষত আছে। সেই ক্ষতটা আজ উন্মুক্ত হবে। মনটা ভাল হয়ে গেল অগ্নির।

টুপুর একেবারে ঠিক সময়ে হাজির হল ফ্লুরিজে। দৃষ্টিনন্দন শাড়ি। সামান্য সাজ। তবে বেশ খানদানী দেখাচ্ছে টুপুরকে।

–      হাই অগ্নি, কেমন আছ? বেশ মুটিয়েছো দেখছি। প্রেশার সুগার নেই তো?

–      না না, আমি ভাল আছি। কি করছ? কেমন আছ? ছেলে মেয়ে?

টুপুর বাঙ্গালোরে কলেজে পড়ায়। মিউজিক টিচার। একাই থাকে। বিয়ে করে নি।

–      কেন? বিয়ে কর নি কেন? আমার জন্যে অপেক্ষায় থেকে গেলে?

–      তা কেন? তোমার বিয়ের খবর তো পিএইচডি করার সময় পেয়েছিলাম। আসলে হয়ে ওঠে নি। তোমার স্কার্ফটা দাও তো।

অগ্নি স্কার্ফটা দিতেই সেটা নিয়ে ভাঁজ করে পাশে রাখল টুপুর। অগ্নি জিজ্ঞাসা করল –

–      এবার বলো, তেত্রিশ বছর পরে হঠাৎ আমার সাথে দেখা করতে ব্যাঙ্গালোর থেকে উড়ে এলে কেন? ফেলে আসা ভালোবাসার টানে ?

টুপুর হেসে ফেলল। অগ্নির স্কার্ফটা গলায় জড়িয়ে নিয়ে ব্যাগ থেকে একটা সাদা-কালো ছবি বার করল। রাখল অগ্নির সামনে। অগ্নির মায়ের ছবি।শান্তিনিকেতনে তোলা। এই স্কার্ফ গলায় জড়িয়ে। অগ্নির মনে পড়ল এই উত্তরীয়টি টুপুর মাকে দিয়েছিল। অগ্নি টুপুরের দিকে তাকাতেই সে বলল –

–      আমি এসেছি স্কার্ফটা তোমার কাছ থেকে নিতে। এই উত্তরীয়’র উত্তরাধিকার তোমার আর নয়। আর শোনো, আমি কাল শান্তিনিকেতন যাচ্ছি। সেখান থেকে পরশু সোজা এয়ারপোর্ট। আর দেখা হবে না।  চা খেয়েই আজ উঠব।

 

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here