অটিজম সচেতনতা বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে

মো: মিঠুন

মো: মিঠুন :: বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি দিবস, যা প্রতিবছর ২ এপ্রিল পালিত হয়। এই দিনটিতে জাতিসংঘ বিশ্বজুড়ে তার সদস্য দেশগুলিকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) আক্রান্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহিত করে। দিবসটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক “৬২/১৯৯ ধারা অনুযায়ী মনোনয়ন লাভ করে।

“বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস” প্রস্তাবটি ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হয়েছিল এবং সেটি গৃহীত হয়েছিল একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজমসচেতনতা দিবস পালন করে আসছে।

আমরা অনেকেই জানিনা আসলে অটিজম বিষয়টিকি? যেকারণে আমাদের সমাজে অনেকেই আমরা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করি যে অটিজম আক্রান্তব্যক্তি বা শিশু হয়তো বা পাগল কারণ তাদের আচার আচরণের বহিঃপ্রকাশ তেমনটাই। কিন্তু অটিজম একটি নিউরোলজিক্যাল স্নায়ুবিক সমস্যা এতে অটিজম আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তির মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। একে স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার /নিউরোলজিক্যাল ডেভলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বলা হয় এতে মানসিক সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা একসাথে ঘটতে পারে। এসমস্যার কারণে শিশু জন্মের পরের ১৮ মাস থেকে ৩বছর বয়সের মধ্যেই তার আচার-আচরণে মানসিক সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে তারা মানুষের সাথে কথাবলা এবং চোখেচোখরেখে তাকিয়ে কথা বলতে পারেনা।

১৯০৮ সালে অটিজম শব্দটি সর্বপ্রথম সাইকিয়াট্রিস্ট ইউজেন ব্লিউলার অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার ধারণার জন্মদেন। অস্ট্রিয়ান মেডিকেলথিওরিস্ট হ্যান্ডস এবং আমেরিকার শিশু মনোবিজ্ঞানী লিওক্যানার ১৯৪৩ সালে ১১ জন শিশুকে নিয়ে এক গবেষণা করেন তার গবেষণায় দেখাযায় ঐসকল শিশুদের স্মৃতি সামাজিক সম্পর্ক তৈরি ডাকদিয়ে সাড়া নাদেয়া, সহনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা দক্ষতা, একইকথার পুনরাবৃত্তি ইত্যাদি সংক্রান্ত সমস্যা প্রকাশিত হচ্ছিল।

আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা সাধারণত ছেলে শিশুরাই অটিজমে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিবছরে ২৫০ জন শিশুর মধ্যে একজন শিশু অটিস্টিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ভাষাগতএবংঅধিবৃত্তের কোনো জটিলতা থাকেনা। আমরা অনেকে ইজানিনা যে, অটিজম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নানা প্রতিভা লুকিয়ে থাকে। একদিকে যেমন তারা মানুষের সাথে কমিউনিকেশন করতে পারেনা, কথা বলতে পারেনা, এমনকি অন্যান্য শিশুদের সাথে স্বাভাবিক ভাবে মিশতেও পারেনা। এতো সীমাবদ্ধতার মাঝেও এসকল অটিজম আক্রান্ত শিশুদের মাঝে অনেক প্রতিভা আছে। শুধু মাত্র প্রয়োজন আমাদের সহযোগিতা করা, যেমন অনেক অটিস্টিকশিশুরা ছবি আঁকতে পারে, নাচ করতে পারে, গান ছড়া আবৃত্তি এমনকি অভিনয় করতেপারে।

অটিজম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে আমরা যেসব লক্ষণগুলো দেখতে পাই তা মূলত নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেয়া, এরা একা থাকতে খুব পছন্দ করে, সমবয়সী বন্ধুদের সাথে মিশতে চায়না, একই শব্দ বা কথা বারবার উচ্চার ণকরে, মনোযোগের অভাব তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, অস্বাভাবিক বিষয় অগ্রাহ্য থাকা, দেরি করে কথা বলতে শিখে তারা, ইশারা ইঙ্গিতে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধকরে, এরা চাইলেই অন্যান্য শিশুদের মতো নিজেদের চাহিদাগুলো প্রকাশ করতে পারেনা, তারা কোন ছক বাঁধা রুটিন বানিয়ে চলতে পারেনা। অনেকবাবা-মা আছেন তার শিশুসন্তান অটিজম আক্রান্ত কিনা জানেন না। আবার অনেকে জেনেও লুকিয়ে রাখেন কিন্তু একাজটি একদমই ঠিকনা।

আপনার সন্তানের বিষয়ে প্রথমে যেটি করা উচিত। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া এবং আপনার শিশুর চাহিদা অনুযায়ী তাকে স্কুলে ভর্তি করা। কারণ আমাদের দেশে এধরনের অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রচুর বিশেষায়িত স্কুল আছে যেখানে তাদের বিশেষভাবে পাঠদান করা হয়। এধরনের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এর পরামর্শ নিতে পারেন। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য সরকারের নানামুখী উদ্যোগ আসলেই প্রশংসার দাবিদার।

বর্তমান সময়ের সরকার অত্যন্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বান্ধব এবং বিশেষ করে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্যনিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। সরকারের পক্ষে কখনই কোনকাজ একা করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এসকল মানুষদের জন্য কাজ করে যেতে হবে। পাশাপাশি এআইনটির যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য যথাযথকর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিতে হবে। তাই শুধু মাত্র দিবস ভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজন করলেই হবেনা। আমাদের সচেতন থেকে এসকল বৈচিত্র্যময় মানুষগুলোকে সমাজেকিভাবে অন্তর্ভুক্ত করাযায় তাদেরকে কিভাবে তাদের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা সরঞ্জাম এবং সহায়ক পরিবেশ দিয়ে সমাজের সাথে একত্রিত করাযায় সেদিকে আমাদের অবশ্যই নজর বাড়াতে হবে।

কারণ অটিজম আক্রান্ত শিশুরা যেমন আমার আপনার মত স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারেনা। তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে ঠিক তেমনি আমাদেরওকিছু সীমাবদ্ধতা আছে যেটা আমরা করতে পারিনা। যেটা ওদের মধ্যে আমরা অনেকটাই দেখতে পাই খুব সাবলীলভাবে।তাই আমাদের উচিৎ তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।তাদের শুধু সমবেদনা নয়, বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে এসকল মানুষগুলো আমাদের সমাজে তাদের স্থান করে নিবে।

 

 

 

 

ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

পরীক্ষামূলক সম্প্রচারে আসছে ইন্টারএশিয়া টেলিভিশন

স্টাফ রিপোর্টার :: আসছে ৭ জুন পরীক্ষামূলক সম্প্রচারে আসছে ২৪ ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ ...