‘ভুল সবি ভুল, পাতায় পাতায় সবি ভুল’

লেখক: নাসির উদ্দিন আহমেদ

‘ভুল লিখতে ভুল করিও না’ বাংলায় অল্প/বেশী শিক্ষিত কারো এ বাক্যটি অজানা থাকার কথা নয়। তারপরও ভুল হয় এবং ভুল করা মানুষের ধর্ম।

এ প্রবাদ মতে আগেও ভুল হয়েছে, এখন হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তবে অজ্ঞতার কারণে যে ভুল হয় তা শোধরানো যায় কিন্তু অসাবধনতার কারণে হওয়া ভুল শোধরানো গেলেও যে ক্ষতি হয় কখনো কখনো তার কোন সীমা পরিসীমা থাকেনা।

বিশেষ করে সরকারী যন্ত্রের কোন ভুলের খেসারত দিতে হয় পুরো জাতিকে। আর কোন ঘটনাকে বিকৃত রূপ দিতে ইচ্ছাকৃত ভুলের হীন মানসিকতার পরিনাম হয় অতি ভয়াবহ। সব ধরণের ভুল আমরা কেউ কেউ অহর্নিশি করে যাচ্ছি অত্যন্ত নিপুণভাবে আর এ ভুলকে ভুল বলার মত যাজক খুজে বের করার মত কেউ আছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না।।

যে সব ভুল সচরাচর হচ্ছে দৈবাৎ এর কোনকোনটি শোধরানো হলেও বাকী সব ভুলই থেকে যাচ্ছে শুদ্ধের খাতায়। এমনি একটি ‘ভুল’ গত ১৫ আগষ্ট প্রচার মাধ্যমে প্রদত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও কৃষি ব্যাংকের। বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে লিখা অন্নদা শংকর রায়ের ভুবন বিজয়ী সে কবিতাটি মুখস্ত আর ঠোটস্ত করার অভ্যাস করতে গিয়ে ‘দাদখানি চাল’ কবিতাটির মতো সবাই একযুগে হয়তোবা খেই হারিয়ে ফেলেছেন। আর তা না হলে বিকৃতির হীন মানসিকতা নিয়ে তাদের যাত্রা কেবল শুরু হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নিকট কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ পুরো বাঙালি জাতির অভিব্যক্তিকে কবি অন্নদা শংকর রায় ৮ টি চরণের মাধ্যমে এভাবে প্রকাশ করতে চেয়েছেন,

যত দিন রবে পদ্মা মেঘনা

গৌরি যমুনা বহমান

তত দিন রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান

দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা

রক্তগঙ্গা বহমান

নাই নাই ভয় হবে হবে জয়

জয় মুজিবুর রহমান

কিন্তু সোনালী, জনতা আর অগ্রণী ব্যাংক মিলে গত ১৫ আগস্ট শোক দিবসের ডিসপ্লে বিজ্ঞাপনে কবিতাটির ৪ টি চরণ প্রকাশ করলো ঠিক এভাবে,

যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, গৌরী বহমান

ততদিন রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান

ব্যাংক ৩টির বিশাল জনশক্তির জোরে কবিতাটির এ করুণ দশা হলো নাকি তাদের ভেতরের কবিত্ব দ্বারা কবিতাটিকে সংশোধন করে প্রকাশ করলো তা বুঝা যায়নি। এ দায়িত্ব তাদের নয়। কারো যদি কবিতাটি পড়তে ভাল না লাগে তবে পড়বেনা।

কিন্তু  এমন ভাবে কাটাছেড়া করার কোন অধিকার তাদের নেই। যেহেতু এরা জনগণের টাকায় সরকারী বেতনভূক্ত তাই উপরের কর্মটি সংশ্লিষ্ট জনসংযোগ বিভাগ গুলির কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করে বসেন তবে তার অতি সহজ উত্তর ব্যাংকগুলির কাছে জমা আছে বলে মনে হয়না। আর নিজেদের ভুলের কারণে কারো নিকট এজন্য তাদেরকে জবাব দিহি করতে হবে এমন কোন নজীরও নেই।

বরং যাদের তথাকথিত উর্বর মাথায় এ ভুলকে ‘ভুল’ বলে মনে হয়েছে যত হা-পিত্যেশ তাদের এবং ভুল বলার জন্য পরোক্ষভাবে ঐ মাথাকে চড়াদামও দিতে হতে পারে। কারণ কবিতাটির ভুল ভাবে প্রকাশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে থাকলে তাতে দৃশ্যমান ভুল হলেও প্রকৃতপক্ষে ‘তাদের’ ভুল হয়নি ।

একই ভাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবসে তাদের অনুভূতি প্রকাশে ডিসপ্লে বিজ্ঞাপনে কবিতাটির প্রথম ৪ লাইন প্রকাশ করলো ঠিক এভাবে,

যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরি মেঘনা বহমান

ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান

আবার এ ব্যাংকেরই ময়মনসিংহ অঞ্চলের অফিসার্স এক্য পরিষদ শোক দিবস উপলক্ষে ১৬ আগষ্ট এক মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পত্রে ছাপালো-

যতদিন রবে

পদ্মা মেঘনা যমুনা বহমান

ততদিন রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান

এ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মন্ত্রী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিবৃন্দের চোখেও সম্ভবত বিষয়টি ধরা পড়েনি। ‘দাদখানি চাল’ কবিতার ন্যায় এমনিভাবে বিকৃত হতে হতে একদিন হয়তো এ কবিতাটি স্বর্গ থেকেও আর নিজের দাবি করতে পারবেন না অন্নদা শংকর রায়। এদেশের রাজনীতির ‘ছিনতাই’ নাটকের বাস্তব রূপে এটিও প্রকাশ হবে হয়তো তখন অন্য নামে। তখন শেখ মুজিবুর রহমানের এর স্থলে —- রহমান এসে স্থানটি জবর দখল করলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।

 

লেখক: নাসির উদ্দিন আহম্মেদ, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আজকের বাংলাদেশ, ৩৩ ছোট বাজার, ময়মনসিংহ

মোবাইল-০১৭৪০৯১৪০৬৯, তারিখ-২৩/৮/১৪ইং

 

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...