Home / Featured / ৭ মার্চ হোক ‘জাতীয় ভাষণ দিবস’

৭ মার্চ হোক ‘জাতীয় ভাষণ দিবস’

স্থাআবুল বাশার শেখ:: চলতি বছরের ৬ মার্চ ও ৭ মার্চ আমার লেখা ‘সময়ের দাবি ৭ মার্চ জাতীয় ভাষণ দিবস’, ‘৭ মার্চ এক অবিস্মরণীয় দিন’ এবং ‘৭ মার্চ জাতীয় ভাষণ দিবস সময়ের দাবি’ শিরোনামে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় উপ-সম্পাদকীয় পাতায় ছাপা হয়। আজ যখন ইউনেস্কো ‘বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্ত করেছে তখন প্রাণটা গর্বে ভরে উঠে। সে সাথে দুঃখও হয় এ জন্য যে আমাদের দেশে এই ভাষণটিকে আমরা নিজেরা কতটুকু মূল্যায়ন করেছি।

আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এই ৭মার্চকে আমরা বাঙালীরা কতটুকু যুগ্যস্থানে রাখতে পেরেছি। যেখানে বিশ্বের বড় বড় জ্ঞানী-গুণিগণ এই ভাষণের বিচার বিশ্লেষণে পঞ্চমুখ সেখানে আমাদের দেশে আমার মনে হয় এই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে যর্থার্থ স্থানে নিতে পারিনি; কেননা ৭মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশে সবার আগে বিবেচিত হওয়ার কথা।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযোদ্ধের শুরু থেকে শেষ বিজয় অর্জন পর্যন্ত অনেক দিবস আছে তাই এই ঐতিহাসিক ৭ মার্চকে বাংলাদেশের জাতীয় ভাষণ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে। একটি ভাষণ একটি দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তাই এটিকে ছোট করে দেখার কোন যুক্তিকতা নেই। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল অবিস্মরণীয় নয়, বাঙালির জন্য অনিঃশেষ এর প্রেরণা। সুতরাং বাংলাদেশের আম জনতার দাবি ঐতিহাসিক ৭মার্চকে বাংলাদেশের জাতীয় ভাষণ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

আজ মনে হচ্ছে আমার মতো সাধারণ একজন লেখকের এই দাবি আমাদের দেশের সচেতন দু’এক জনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর জলন্ত উদহরণ বুধবারের জাতীয় দৈনিকগুলোয়- ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের (রেসকোর্স ময়দান) জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অঙ্গুলী উঁচিয়ে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন সেই অভিব্যক্তির আদলে তার ভাস্কর্য নির্মাণ কেন করা হবে না এবং একইসঙ্গে ওই দিনটিকে ‘ঐতিহাসিক জাতীয় দিবস’ হিসাবে কেন ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।

এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গত সোমবার (২০ নভেম্বর) এই আদেশ দেন। এছাড়া যে স্থানে নির্মিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়েছিলেন, পাক হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল সে স্থানে মঞ্চ কেন পুনর্নিমাণ করা হবে না রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

তিন সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, শিক্ষা সচিব, গণপূর্ত সচিব, সংস্কৃতি সচিবকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া রুলের প্রেক্ষিতে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-সে বিষয়ে আগামী ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে মন্ত্রি পরিষদ সচিব ও অর্থ সচিবকে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

সমপ্রতি ইউনেস্কোর একটি উপদেষ্টা কমিটি ঐতিহাসিক এই ভাষণটিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর উপরোক্ত দাবি সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট বশির আহমেদ।

এর আগে গত মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জয় বাংলা মঞ্চ, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ ও বাংলাদেশ মানবাধিকার আন্দোলন সংগঠনের যৌথভাবে আয়োজিত এক সমাবেশে ৭ মার্চের ভাষণকে ‘জাতীয় ভাষণ দিবস’ ঘোষণার দাবি জানান।

“এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।” বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এই ভাষণ। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ১০ লক্ষাধিক লোকের সামনে পাকিস্তানি সেনাদের কামান-বন্দুক-মেশিনগানের হুমকির মুখে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়াদী উদ্যান) মুক্তিকামী পূর্ব পাকিস্তানের আমজনতার উদ্দেশ্যে এই ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেন।

যা পরবর্তী সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ঐতিহাসিক এ ভাষণে মূলত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’-ই নিহিত ছিলো। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর বহুদর্শী ও সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা, পরিমিতি বোধের বর্হিপ্রকাশ ঘটেছিলো এই ভাষণে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ নিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বরা বিচার বিশ্লেষণ শুরু করে। তারা এক বাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে এটি একটি ঐতিহাসিক ভাষণ হওয়ার যোগ্যতা রাখে এবং এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এ কারণে এই ভাষণটি শুধু বঙ্গবন্ধুর জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণ নয়, পৃথিবীর অন্য নেতৃবৃন্দের দেওয়া ভাষণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা এদিনে বাঙলির অবিসংবাধিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদত্ত ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসের সেরা ১০ ভাষণের মধ্যে অন্যতম ভাষণ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। সর্বশেষ এই ভাষণটি বিশ্ব দরবারে আরেক ধাপ মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে ৩০ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো প্যারিসে অনুষ্ঠিত এর দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা সংস্থাটির ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে।

এখানে একটি কথা না বললেই নয় যে এটি তেলবাজি কিংবা স্বজনপ্রীতির কোন ফলাফল নয়। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা-বিশেষজ্ঞ কমিটি কর্তৃক দীর্ঘ দু’বছর ধরে প্রামাণ্য দালিলিক যাচাই-বাছাই শেষে ইউনেস্কোর মহাপরিচালকের সম্মতিক্রমে এটি সংস্থা নির্বাহী কমিটি কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর হলেও জাতিসংঘের মতো বিশ্ব সংস্থার এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বাঙালী জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তথা বাংলাদেশের বাঙালী জাতির একটি ঐতিহাসিক বিজয়।

‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রণোদনা সৃষ্টিকারী ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ মানবজাতির মূল্যবান ও ঐতিহ্যপূর্ণ সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত ও গৃহীত হল। স্বাধীনতার জন্য আত্নোৎসর্গকৃত ৩০ লাখ শহীদ আর সম্ভ্রম হারানো কয়েক লক্ষ মা-বোনসহ সকল বাঙালী জাতির জন্য এটি এক মহা-আনন্দ ও বিরল সম্মানের বিষয় হিসেবে এখন বিবেচ্য।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্বের ৪০টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ‘‘দ্যা স্পিচ বিহাইন্ড দ্যা লিবারেশন অব বাংলাদেশ” শীর্ষক এ প্রকাশনা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ৪০টি দেশের দূতাবাস কর্তৃপক্ষ প্রকাশনাটিকে সূচারু রূপে অনুবাদে সহায়তা দিয়েছেন। ক্রিয়েশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (সিডিএফ) এ প্রকাশনার সার্বিক দায়িত্ব পালন করেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে (৪৬ বছর) পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো নেতার ভাষণ সেদেশের মানুষ শ্রবণ করে আসছে কিনা সন্দেহ।

এটি এমনই ব্যঞ্জনাপূর্ণ ও গীতিময় যে, যতবার শ্রবণ করা হয়, ততবারই মনে হয় এই প্রথমবার শোনা হল, কখনও পুরনো মনে হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব অর্জনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব এবং প্রভাব নির্ণয়ে লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা অগ্রণী রিসার্জ ‘৭ই মার্চ রিচার্স প্রজেক্ট’ নামে একটি গবেষণা কাজ শুরু করেছে। যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে আমি বাংলাদেশের আম জনতার দাবি হিসেবে ঐতিহাসিক “৭ মার্চকে বাংলাদেশের জাতীয় ভাষণ দিবস” হিসেবে বাংলাদেশের দিবসের কাতারে যোগ করা হবে এমনটাই আশা করি।

 

 

লেখক: কবি, গল্পকার, সংবাদকর্মী, ভালুকা, ময়মনসিংহ। ইমেইল: basharpoet@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

উপস্থাপিকা থেকে নায়িকা চরিত্রে শারমিন প্রীতি

উপস্থাপিকা থেকে নায়িকা চরিত্রে শারমিন প্রীতি

নজরুল ইসলাম তোফা:: সাভারের মেয়ে প্রীতি পড়া শুনার পাশা পাশি অভিনয়ে জগতে ছুটছেন ...