২৩ বছর ধরে এমপিও ভোগ করছেন এই মাদ্রাসার দু’শিক্ষক !

পাইকগাছায় লতা ইউনিয়নের বাহিরবুনিয়া নামসর্বষ এবতেদায়ী (স্বতন্ত্র) মাদ্রাসা।মহানন্দ অধিকারী মিন্টু, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি :: ৩৪ বছরে অবকাঠামোগত অস্তিত্ব তৈরী করতে পারেনি। নেই ছাত্র-ছাত্রী, নেই মাদ্রাসার অস্তিত্ব। তবে ২৩ বছর ধরে এমপিও ভোগ করছেন দু’শিক্ষক। এটি খুলনার পাইকগাছায় লতা ইউনিয়নের বাহিরবুনিয়া নামসর্বষ এবতেদায়ী (স্বতন্ত্র) মাদ্রাসা।

এ অস্তিত্বহীণ প্রতিষ্ঠানটির কাগজে-কলমে ২৫১৮ ফুটের ৪টি শ্রেণী কক্ষ ও শির্ক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি দেখালেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা, সর্বশেষ সরকারের এবতেদায়ী পর্যায়ে জাতীয় করণের আশ্বাসে তড়ি-ঘড়ি করে পানির উপর বাঁশ-খুঁটির আস্থরণ আর শিক্ষক নিয়োগে শুরু করেছেন ভিন্ন মাত্রার দুর্নীতি।

কাগুজে প্রতিষ্ঠানে কখন কে শিক্ষক হন আর কখনই বা বাদ যান তার যেমন হিসেব নেই তেমনি কারা কোথায় পাঠ নেয় সেখানে, তাও জানা নেই এলাকাবাসীর পাশাপাশি খোদ প্রতিষ্ঠাতাদেরও। বিভিন্ন দফতরে প্রতিষ্ঠাতা ও সচেতনবাসীর আনা অভিযোগে উঠে এসেছে এমন চমকপ্রদ সব তথ্য।

প্রাপ্ত অভিযোগে জানাযায়, উপজেলার লতা ইউনিয়নের মৃত আরশাদ গাজীর ছেলে শহিদুল গাজী ১৯৮৪ সালে দূর্গম জনপদের অবহেলিত ও বঞ্চিত মুসলিম সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ইসলাম শিক্ষা প্রসারে বাহিরবুনিয়া এবতেদায়ী স্বতন্ত্র মাদ্রাসা নামে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে প্রতিষ্ঠানের স্থায়ীকরনে শহিদুল ইসলাম ও তার মা আয়ফুল বেগম ওরফে আলেয়া ১৯৯০ সালের ২৫ আগস্ট বাহিরবুনিয়া মৌজার সিএস ১১ ও ১৯ খতিয়ানের ৭৯ ও ৯৮ দাগের মধ্য থেকে ৪২৩৬ নং দানপত্র দলিল বুনিয়াদে ৫২ শতক জমি দান করেন ঐ প্রতিষ্ঠানের নামে। নতুন উদ্যমে প্রথমত প্রতিষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হওয়ায় ১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছরে এবতেদায়ী পর্যায়ে এমপিও পায় প্রতিষ্ঠানটি।

তবে এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সহকারী শিক্ষক ওয়াজেদ আলী ও আনোয়ারা খানমের অবাধ স্বেচ্ছাচারিতা ও নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে আকষ্মিক ছন্দ পতন ঘটে বিদ্যাপীঠটির সামগ্রীক শিক্ষা ব্যবস্থায়। অভিভাবকদের মধ্যে নানাবিধ আশঙ্কা তৈরী হওয়ায় শিক্ষার্থী হ্রাস পেতে পেতে চলে আসে শূণ্যের কোঠায়। এক সময় সামগ্রীক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পরিণত হয় কাগুজে প্রতিষ্ঠানে। এরপর ২০০৯ সালে প্রলয়ংকারী আইলায় প্রতিষ্ঠানটি বিধ্বস্থ হলে এর অকাল মৃত্যুতে শেষ পেরেক ঢুঁকে। এরপর আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি তারা। এমনকি ২০০৯-২০১৫ সাল পর্যন্ত কোনো প্রকার সরকারি অনুদানও পায়নি প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে অস্তিত্ব বিহীণ প্রতিষ্ঠানের নামে বেতন-ভাতা উত্তোলন থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙ্গিয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠাতাসহ এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ হলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য বহুল স্বচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর প্রেক্ষিতে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হলে গত বছরের ২৯ মার্চ ০৫.৪৪.৪৭০০.০০১.১৭.০০১.১৬-৮৫ নং স্মারকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ফেরদৌস ওয়াহিদ স্বাক্ষরিত এক নির্দেশে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফকরুল হাসান গত ১৭ মে ১৭’ তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থাগ্রহণ ও মতামত প্রদানের জন্য উভয় পক্ষকে নোটিশ দিয়ে তার কার্যালয়ে ডাকেন। যার স্মারক নং উনিঅ/তদন্ত/পাইক/খুলনা/১৭-২৮১।

এর প্রেক্ষিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ইউএনও তার প্রতিবেদনের একাংশে উল্লেখ করেন যে, এপ্রিল/১৬ থেকে জুন/১৬ পর্যন্ত শিক্ষক মিসেস আনোয়ারা খানম ও মোঃ ওয়াজেদ আলী ৭ হাজার ২ শ’ টাকা করে মোট ১৪ হাজার ৪ শ’ টাকা ও জুলাই/১৬ থেকে জুন/১৭ পর্যন্ত ২১,০০০ টাকা করে মোট ৪২,০০০ টাকা উত্তোলন করেন। যা ব্যাংক স্টেটমেন্টে প্রতীয়মান হয়। প্রতিবেদনে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। যার স্মারক নং ০৫.৪৪.৪৭০০.০১৯.১৮.০৩৫.১৮-৩১(যুক্ত)।

অন্যদিকে স্থানীয় লতা ইউপির চেয়ারম্যান দিবাকর বিশ্বাস জানান, মাদ্রাসাটির বর্তমান কাগুজে সুপার শহিদুল ইসলাম তাকে ভুল বুঝিয়ে ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই ৩নং লতা/৫১৮/২০১৮ নং স্মারকে মাদ্রাসাটি চালু আছে মর্ম্মে একটি প্রত্যয়নপত্র নেয়। তবে ২১ এপ্রিল ১৮’ ৩নং লতা/৩৬৩/২০১৮ নং স্মারকে অপর এক প্রত্যয়ন পত্রে আগের প্রত্যয়নপত্রটি এলাকার একটি মহল ভুল বুঝিয়ে নিয়েছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেটা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও অপ্রত্যাশিত ভুলের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

লিখিত অভিযোগে আরো জানাযায়, প্রথমত প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো ঘর ও ছাত্র-ছাত্রী না থাকলেও স্থানীয় জনৈক শাহাজান মাস্টারের একটি প্রাইভেট পড়ানোর ঘর মাদ্রাসা হিসেবে দেখানো হত বলে এলাকার কালাম গাজী, মোক্তার গাজী, ইব্রাহীম গাজী, শহিদুল ইসলাম, শাহরিয়ার ওয়াহিদ, মো. সেলিম গাজী, নূর ইসলাম গাজী, আমিরুল গাজী, বিল্লাল গাজী, কওছার গাজী, হাফিজুল ইসলামসহ অনেকেই জানান। তারা আরো জানান, ২০১৭ সালের দিকে বাহিরবুনিয়ার একটি খালের উপর কয়েকটি খুঁটি পুতে টিনের ছাউনি দিয়ে একটি ঘর বানালেও তার নীচে ও চারপাশে পানি থৈ থৈ করছে।

অথচ সুচতুর শিক্ষকরা বেতন-ভাতা চালু রাখতে ২৫১৮ ফুটের ৪ টি শ্রেণী কক্ষ ও বিভিন্ন শ্রেণীতে মোট ৯৬ জন ছাত্র-ছাত্রীর অস্তিত্ব দেখিয়ে বিভিন্ন দফতরে প্রেরণ করা হয়। শুধু এখানেই শেষ নয়, প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ছন্দ পতনের পর থেকে কখন কোনো শিক্ষক কোনো বিষয়ের কিংবা কখন কাকে নিয়োগ দেয়া হয় আর কাকে বাদ দেয়া হয় তার হিসেব নেই কতৃপক্ষের কাছেও।

তারা জানান, সরকারের সর্বশেষ এবতেদায়ী পর্যায়ের মাদ্রাসা গুলোকে জাতীয় করনের আশ্বাসে নতুন উদ্যমে রীতিমত নড়েচড়ে বসেছেন সংশ্লিষ্ট তথাকথিত কতৃপক্ষ। শেষ সময়ের বেসাতিতে নতুন পালক যোগ করে সাইদুর রহমান মোল্লা, শহীদুল ইসলাম ও গোলাম মোস্তফাকে স্বঘোষিত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর আগে কাউকে না জানিয়ে চুপিসারে গঠন করা হয়েছে মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদ। যেখানে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি দেখানো হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে।

এব্যাপারে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শহিদুল ইসলাম গাজী বলেন, যাদেরকে মাদ্রাসার বর্তমান শিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়েছে তাদের কাউকে এলাকায় পর্যন্ত দেখা যায়না। এমনকি তাদের অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে তাদের স্ব স্ব এলাকায় গিয়ে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।

এব্যাপারে কথিত শিক্ষক গোলাম মোস্তফার নিকট মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা শহিদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে শহিদুল ইসলাম মাদ্রাসার কেউ নন, এমনকি ইউএনও বর্তমানে মাদ্রাসার সভাপতি বলে দাবি করে তার সাথে চরম দূর্ব্যবহার করেন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সাড়ে ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবী সমিতিকে ৯ কোটি টাকার অনুদান

সাড়ে ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবী সমিতিকে ৯ কোটি টাকার অনুদান

স্টাফ রিপোর্টার :: ১৯৭৮ সাল থেকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নারীদেরকে অর্থনৈতিক ভাবে ...