ব্রেকিং নিউজ

২০১৩ সাল : রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব ব্যাংকিং খাতে

ঢাকা : ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি, ঋণ কেলেঙ্কারি, জালিয়াতি নতুন কোন ঘটনা নয়। প্রতিবছর এ ঘটনা কম-বেশি ঘটে থাকে। ২০১২ সালে ঘটে যাওয়া হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারির দায়ভার নিয়ে ২০১৩ সালের যাত্রা শুরু করে ব্যাংকগুলো। তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাবে চরম মূলধন সংকটে পড়তে হয় ব্যাংকগুলোকে। মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারের বাজেটের অর্থ থেকে ৪ হাজার ১শ’ কোটি অর্থ সহায়তা পেয়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন চার ব্যাংক। এছাড়া বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাত, ন্যাশনাল ব্যাংকের হলুদ ব্যাংকিং, প্রাইম, যমুনা, শাহজালাল ইসলামী, প্রিমিয়ার, এক্সিম, সোস্যাল ইসলামী ও গত বছর অনুমোদন পাওয়া এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে শেষ হল ২০১৩ সাল।
অপরদিকে অর্থনীতিবিদরা গত বছরকে অর্থনীতি ক্ষতির বছর হিসেবে আখ্যায়িত
করেছেন। তারা বলেছেন, ব্যাংকিং সেক্টরে ২০১৩ সালে ঋণ কেলেঙ্কারি ও ঋণ খেলাপির দায়ভার অনেক বেড়ে গেছে। বিরাট প্রভাব পড়েছে ব্যাংকিং মুনফার ওপর। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব মানুষের জীবন যাত্রার এবং
ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ব্যবস্থায় গত বছর নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সেটি হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা।
হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি :
সদ্য বিদায় নেয়া বছরের শুরুতেই হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বিভিন্ন কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে সোনালী ও জনতা ব্যাংক। ঋণ জালিয়াতির সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়াসহ বিভিন্ন কারণে এলসি গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে বিদেশি ব্যবসায়ীরা। এ ঘটনায় জড়িত ব্যাংকের সাবেক পরিচালক জান্নাত আরা হেনরীকে রাজনৈতিক বিবেচনায় মুক্তি দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এমনকি তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি অর্থমন্ত্রণালয়।
এদিকে হলমার্ক কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত থাকায় সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আতিকুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ২৩ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে ন্যস্ত ছিলেন।
উল্লেখ্য, দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হওয়ার এক বছর দুই মাস পর অর্থ মন্ত্রণালয় সোনালী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করল। তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
বেসিক ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাত:
বহুল আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির সময় পরিচালনা পর্ষদের দাবি ছিল, তারা কিছু জানত না, শাখাই প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু বেসিক ব্যাংক করেছে উল্টোটা। পর্ষদই প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সব আয়োজন করে দিয়েছে। পর্ষদের মাত্র ১১টি সভায় তিন হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘৪০টি দেশীয় তফসিলি ব্যাংকের কোনোটির ক্ষেত্রেই পর্ষদ কর্তৃক এ ধরনের সিদ্ধান্ত  গ্রহণের প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় না।’ বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করে বলেছে, অধিকাংশ ঋণই গুরুতর অনিয়ম করে দেওয়া হয়েছে। এই ঋণ পরিশোধ বা আদায় হওয়ার সম্ভাবনাও কম। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু এরশাদ সরকারের আমলে বাগেরহাট-১ আসন থেকে জাতীয় পার্টির সাংসদ ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা ব্যাংকে নানাভাবে প্রচার করা হয়। ব্যাংকের পরিচালক ও সরকারের সাবেক একজন যুগ্ম সচিব এ কে এম রেজাউর
রহমান ১১ জুলাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমের কাছে একটি চিঠি দেন। আবদুল হাই সম্পর্কে চিঠিতে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে পরোয়া করেন না তিনি। চেয়ারম্যান নিজেই তিন হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাতের সুযোগ করে দিলেও ব্যাংলাদেশ ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা বয়সের নিয়মও মানা হয়নি। এমনকি পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকের নিজস্ব নিয়োগবিধিও লঙ্ঘন করেছে বলে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্তে ধরা পড়ে। এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা কানে না তোলায় অর্থ মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অপরদিকে, গোপালগঞ্জ বাড়ি এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর প্রভাবশালী সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল এমপির আত্মীয় দাবি করে চরম দুর্নীতি, অনিয়ম ও অজানা আয়ে অবৈধভাবে টাকার পাহাড় গড়েছেন বেসিক ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আ. মোনায়েম খান। বেসিক ব্যাংক শান্তিক নগর শাখা থেকে মোনায়েম খান ও ঐ শাখার ম্যানেজার মো. আলী যোগসাজস করে মো. আইনুল হক সোহেল নামক এক ব্যক্তির গুঞ্জন
ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে ১৫০ কোটি টাকা লোন দেন। যার মধ্যে বিভিন্ন গ্রাহকের ৯০ কোটি টাকা ছিল এফডিআরের অর্থ। আর ম্যানেজার মো. আলী ৬০ কোটি টাকা ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখা থেকে ওডি হিসাবে আনেন। অভিযোগ আছে, এই ৬০ কোটি টাকা ২০ কোটি টাকা করে মোনায়েম, মো. আলী ও সোহেল ভাগ করে নেন।
এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক মোনায়েমের দুর্নীতি ও বিপুল অংকের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি আগস্ট মাসে তদন্ত শুরু করে। এতকিছুর পরেও বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্যদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। শুধু আই ওয়াশ করার জন্য আগস্টে একটি এএমও স্বাক্ষর করে। এবং এ ব্যাংকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতি পর্যবেক্ষণে একজন পর্যবেক নিয়োগ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-১-এর মহাব্যবস্থাপক অশোক কুমার দে’কে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিবেচনায় ৯টি নতুন ব্যাংক:
যখন ব্যাংকিং খাতে টালমাটাল অবস্থা ঠিক তখনই গত বছর শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করে আরো ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। তবে অনুমোদন
পাওয়া এ ব্যাংকগুলো ভালো করতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত হিসাবে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের আমানত ও ঋণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৪৬০ ও ২৮৭ কোটি টাকা। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের ৩০৭ ও ২১০ কোটি, মেঘনার ২৩৯ ও ১০৯ কোটি, মিডল্যান্ডের ২৭৩ ও ১৩৫ কোটি, ফার্মার্স ব্যাংকের ১৫২ ও ১১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৪৬৩ ও ৫৬৮ কোটি, এনআরবি ব্যাংকের ১৪৮ ও ৭ কোটি ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ২৫ ও ৯১ কোটি টাকা। এছাড়া মধুমতি ব্যাংকের আমানত মাত্র ১২ লাখ।
সোস্যাল, এনআরবি কমার্শিয়াল ও এক্সিম ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতি:
বেআইনিভাবে ও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে শহিদুল আহসান নামের এক ব্যবসায়ীকে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক গুলশান শাখা, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক প্রিন্সিপাল শাখা ও এক্সিম ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় কর্পোরেট শাখা থেকে ৬৩৪ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত টিম অডিট করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তিনটি সংশ্লিলষ্ট ব্যাংকের কাছে জবাব চেয়েছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জবাব দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ওই জবাব সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছে।
সন্তুষ্ট করতে ব্যাংকের পরিচালক:
আগামী দশম জাতীয় নির্বাচনে ব্রাক্ষণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার জাকির আহম্মাদ। তিনি মনোনয়নও কিনেছিলেন। কিন্তু তাকে সন্তুষ্ট করতে ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাকে রুপালী ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন।
রাজনৈতিক কারণে এসবিএসি’র জরিমানা মওকুফ:
আমানতের নির্দিষ্ট একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমা (সিআরআর) রাখতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে। তা না হলে জরিমানা গুনতে হয়। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন অনুমোদন পাওয়া সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংক ২৮ এপ্রিল থেকে ১৩ মে পর্যন্ত প্রায় ১১৫  কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করলেও সিআরআর সংরক্ষণ করেনি। এজন্য কোনো জরিমানাও গুনতে হয়নি ব্যাংকটিকে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহাজোট সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় জরিমানা মওকুফ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন-২০১৩ পাস:
গেল ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এর সংশোধনী পাস হয়, যা ব্যাংক কোম্পানি আইন-২০১৩ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যাংকগুলোতে সর্বোচ্চ ২০ জন পরিচালক থাকতে পারবে। এর মধ্যে ৩ জন থাকতে পারবে স্বতন্ত্র পরিচালক। সংশোধিত আইনের ১৫(খ) ধারায় বলা হয়েছে, বিশেষায়িত ব্যাংক ব্যতীত অন্য কোন ব্যাংক-কোম্পানিকে উহার পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিযুক্ত বা পদায়নের পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন গ্রহণ করিতে হইবে এবং এইরূপ নিযুক্ত কর্মকর্তাগণকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে তাহার পদ হইতে অব্যাহতি দেওয়া, বরখাস্ত করা বা অপসরাণ করা যাইবে না।
সংশোধিত আইনের ১৫(ঘ) এর উপ ধারা ৬ অনুযায়ী ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক হওয়ার জন্য কমপক্ষে ১০ বছরের ব্যবস্থাপনা বা ব্যবসায়িক বা পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
গ্রামীণ ব্যাংক বিল উত্থাপন:
২৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ অধিবেশনের ১৫তম কার্যদিবসে বাংলাদেশ সরকার মনোনীত পরিচালকদের যে কোন একজনকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের আইন রেখে বহুল আলোচিত গ্রামীণ ব্যাংক বিল উত্থাপন হয়।
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের অনুমোদন:
গেল ৩০ জুলাই ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে রূপান্তর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের
লাইসেন্স ছাড়াই বাণিজ্যিক ব্যাংকের মত কার্যাবলী পরিচালনা করতে চাওয়ায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক। সেইসঙ্গে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক কে এম আব্দুল ওয়াদুদ স্বাক্ষরিত এ বিষয়ক একটি প্রতিবেদনও গত ২৯ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর ১১ নভেম্বর মন্ত্রিসভায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।
রাজনৈতিক বিবেচনায় সুদ মওকুফ:
মহাজোট সরকারের শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকে সুদ মওকুফের হিড়িক দেখা গেছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে গত ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ১শ’৪২ কোটি টাকা সুদ মুওকুফ করা হয়েছে। সুদ মওকুফকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ মালিকই মহাজোট সরকারের কর্তাব্যক্তি বলে অভিযোগ আছে। এছাড়া,  গত সাড়ে চার বছরের হিসেবে সুদ মওকুফ করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক মুনাফায় ধ্বস:
দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় গত বছরের প্রথম নয় (জানুয়ারি- সেপ্টেম্বর) মাসে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমেছে ৪৮ শতাংশের বেশি। ডিসেম্বরের হিসাব এখনো সমাপ্ত হয়নি। তবে ব্যাংকাররা জানিয়েছে ২৫ থেকে ৩০টি ব্যাংকে লোকসান হতে পারে।
সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ৩০টি ব্যাংকের মুনাফা এক হাজার ৫৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা ২০১২ সালের একই সময়ে ছিল তিন হাজার ৫০ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে ৪৮ শতাংশ। এর মধ্যে মুনাফা কমেছে ২০টি ব্যাংকের, দুটি ব্যাংকের লোকসান বেড়েছে। এছাড়া আটটি ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিচালন মুনাফা কমার তালিকায় রয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউসিবিএল, স্টান্ডার্ড ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, এসআইবিএল, এনসিসি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর মধ্যে বছরের নয় মাসে সবচেয়ে খারাপ করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ওই সময়ে তাদের লোকসান হয়েছে ৩৮৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আর ২০১২ বছর ওই সময়ে তাদের মুনাফা ছিল ১২০ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা চেয়ে আইজিপিকে চিঠি:
এ বছর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এমনই ভয়াবহ ছিলো যে, ব্যাংকের বুথগুলো টাকা শূন্য হয়ে পড়ে। বিরোধীদলের ডাকা টানা হরতালে ব্যাংকের বুথগুলোতে টাকা নিয়ে যেতে এবং বুথ পাহাড়ায় আতঙ্কে ছিলো নিরাপত্তা কর্মীরা। একারণে ব্যাংকগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার দাবি জানিয়ে আইজিপিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়ে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
৯১ হাজার কোটি টাকার অলস টাকা:
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকে সৃষ্টি হচ্ছে নগদ অর্থের পাহাড়। ব্যাংকের এ উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ কেবলই বেড়ে চলেছে। নভেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৭৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
ব্যবসায়ীদের বিশেষ ছাড়:
রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের নাজুক পরিস্থিতির কারণে রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে ১ শতাংশ হারে সুদ কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া, ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পুনঃতফসিলে ১ শতাংশ সুদ কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যবসায়ীদের খেলাপী হিসেবে চিহ্নিত করার সময়সীমা ১৮ মাস থেকে ২৪ মাস করতে ২৩ ডিসেম্বর ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়ে সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রিজার্ভ ১৮ বিলিয়ন:
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১৯ ডিসেম্বর বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ১৮.০৬ বিলিয়ন ডলার। এটা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
রেমিটেন্সে ভাটা:
২০১৩ সালে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব গিয়ে পড়েছে প্রবাসীদের মধ্যেও। ফলে ভাটা পড়েছে রেমিটেন্স প্রবাহে। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (নভেম্বর পর্যন্ত) রেমিটেন্স এসেছে ৫৫৫ কোটি ১৭ লাখ ডলার। অথচ গত ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (নভেম্বর পর্যন্ত) এসেছিল ৬১১ কোটি ৫৭ লাখ ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতামত:
২০১৩ সালের ব্যাংকিং খাতকে কিভাবে নিচ্ছেন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দীন আহমেদ  বলেন, সার্বিকভাবে ১৩ অর্থনীতির ক্ষতির বছর। ব্যাংকিং সেক্টরে ১৩ তে ঋণ কেলেঙ্কারি, ঋণ খেলাপির দায়ভার অনেক বেড়ে গেছে। ব্যাংকিং মুনফার ওপর বিরাট প্রভাব পড়েছে। মানুষের জীবন যাত্রার ওপর ছাড়াও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব ব্যাংকিং খাতেও পড়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। দক্ষ লোক নিয়োগ দিতে হবে। এর জন্য দরকার সুশাসন নিশ্চত করা। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া ব্যাংক ব্যবস্থা চললে এ খাতে উন্নয়ন ঘটবে। এর জন্য প্রথমে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের প্রথম কাজ সুশাসন নিশ্চিত করা। আর তা করা হলে অর্থনীতিকে আগের অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সার্বিকভাবে গত বছর অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক। ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাংকগুলোর মুনাফার মাত্রা কমে গেছে। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকগুলো আরো খারাপ অবস্থানে যাচ্ছে। এর কারণ হলো ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উত্তপ্ত ছিল দেশ

ঢাকা : বিদায় নিয়েছে ২০১৩ সাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সদ্যবিদায় নেওয়া বছরটি ...