ব্রেকিং নিউজ

১৭ বছর আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোটীয় সরকার আজ থেকে ১৭ বছর আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করছে, সরকার নিচ্ছে সেই ইতিহাসের নিষ্ঠুর কঠোর রক্তের প্রতিশোধ। হ্যা আমি ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সেই  ইতিহাসের কথাই বলতে চাচ্ছি, সেই নির্বাচনে যে সকল ঘটনা ঘটেছিল তার প্রায় সব ঘটনারই পুনরাবৃত্তি করছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বদলীয় নামের মহাজোটীয় সরকার। যদিও বর্তমান সরকার ৯৬ সালের তৎকালীন নির্বাচনকালীন সরকারের চেয়ে হত্যা, খুন, গুম হামলা এবং মামলায় বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে আছেন। তবে কিছু কিছু দিকে বর্তমান সরকার সেই ইতিহাসেরই কঠোর পাল্টা জবাব দিচ্ছে বলে মনে করছেন দেশের সাধরণ মানুষ এবং বিশ্লেষক মহলের একটি বড় অংশ। বর্তমান দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনকালীন সরকার দেশে যেরকম হত্যা এবং গুমের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে সেটা বাংলার ইতিহাসে  স্বভাবতই নিকৃষ্ট চ্যাম্পিয়ন বললে ভুল হবে না বলে বলাই যায়। এছারা বিরোধীজোটও বর্তমান নির্বাচনের আগে নজির বিহীন সহিংসতা চালিয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে ভয়াবহ আতংকে রেখেছে বলে আমাদের সবারই জানা।

আসুন আমরা গত ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ নির্বাচনের সেই আগের মুহুতের্র সাথে বর্তমান ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে একটু আলোচনার চেষ্টা করি।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন ষষ্ঠ নির্বাচনে বিএনপি সরকারের ওই  নির্বাচনে নিবন্ধিত ৮০টি দলের মধ্যে ৪২টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয় এবং তাতে ১৯৮৭টি মনোনয়নপত্র জমা পড়লেও শেষপর্যন্ত ১৪৫০ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্‌দ্িবতা করে। শেষ পর্যন্ত ওই নির্বাচনে বিএনপির ৪৯ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্‌দ্িবতায় জয়লাভ করে। সেই  নির্বাচনে মোট ২৭৮টি আসন পায় বিএনপি। ফ্রিডম পাটির্র ১ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ১০ জন নির্বাচিত হয়। বাকি আসনগুলোর নির্বাচন বিভিন্ন কারণে স্থগিত হলে পরে সেগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।

এদিকে বর্তমান ২০১৪  সালের দশম জাতীয় নির্বাচনে নিবন্ধিত মোট ৪০ টি দলের মধ্যে ২০ টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, এছারা এবারের নির্বাচনে ১১০৭ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলে যাচাই বাচাইয়ে ২৬০ জনের প্রার্থীতা বাতিল হয়। আপিল শুনানি শেষে ৩৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্রের বৈধতা ফিরে পান। যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থী থাকেন ৮৪৭ জন। এছারা শেষ দিনে ৩০০ জন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ায় এখন প্রার্থী রয়েছেন ৫৪৭ জন। এছারা যেখানে ষষ্ঠ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জিতেছিল মোট ৪৯ জন প্রার্থী তবে এদিকে বর্তমান দশম নির্বাচনে ১৫৪ জন প্রার্থী নির্বাচনের আগেই ইতিমধ্যে নির্বাচিত হয়ে গেছেন। যার মধ্যে আওয়ামী লীগের ১২৭ জন, জাতীয় পাটির্র (জাপা) ২১ জন, জাতীয় পাটির্র (জেপি) ১ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ৩ জন এবং ওয়ার্কার্স পাটির্র ২ জন নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।

বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় দশম নির্বাচনে যেমন আওয়ামী মহাজোট সরকার এগিয়ে তেমনি হত্যা, খুন, গুম এবং হামলা মামালয়ও ষষ্ঠ নির্বাচনের ৯৬ সালে সেই নির্বাচনকালীন সরকারে চেয়ে বেশ কয়েকগুন এগিয়ে বর্তমান মহাজোট সরকার। ৯৬ সালের নির্বাচনের আগে এক বছরে মোট খুন হযেছিল ৪৯ জন মানুষ। অথচ বর্তমান দশম নির্বাচনের আগে গত দু মাসেই সরকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকার দলীয় বাহিনী দ্বারা হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ৯৬ সালের দ্বিগুনেরও বেশি ১২০ থেকে ১৩০ জন মতো মানুষ।

গত ৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংসধোনীর মাধ্যমে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে আওয়ামী লীগ পূর্ববর্তী ৩ মাস অর্থাৎ ৯৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস সময়কালে হরতাল করেছিল ৩৬ দিন। অসহযোগ আন্দোলন করেছিল ২৬ দিন আর অবরোধ করেছিল ৯ দিন। সব মিলিয়ে তিন মাসের চূড়ান্ত আন্দোলনের সময় সে সময়ের ক্যালেন্ডারের পাতার ৯০ টি দিনের মধ্যে ৭১ দিনই ছিল আওয়ামীলীগের আন্দোলন সংগ্রাম । এদিকে বর্তমান ১৮ দলীয় জোট এবার পঞ্চোদশ সংসধোনীর মাধ্যমে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে এ পর্যন্ত মোট হরতাল এবং অবরোধ করেছে ৩০ দিনের মতো। তবে অসহযোগ আন্দোলনের  ডাক এখনো দেয়নি ১৮ দল। তবে ৯৬ সালে আওয়ামীলীগ তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিযে আনতে সক্ষম হয়েছিল কিন্তু এখন দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে  ১৮ দল তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি।

৯৬ সালে সমঝোতার অবস্থা দেখতে গেলে দেখা যায়, তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভনর্র জেনারেল স্যার নিনিয়ানসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশী ব্যক্তিত্ব সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আলোচনায় সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের কাছে কোনরূপ সরকার বিরোধী সভা-সমাবেশ, মিছিল না করার লিখিত গ্যারান্টি দাবি করা হয়। তখন বিরোধী দলের অন্যতম নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘মুচলেকা’ দিয়ে রাজনীতি হয় না। এ কথার পর পরই আলোচনা ভেঙে যায়। সরকার পক্ষের আলোচক কর্নেল (অব.) অলি অন্য তিন সহকর্মীকে নিয়ে আলোচনার কক্ষ ত্যাগ করেন, ভেঙ্গে যায় সে আলোচনার অগ্রগতি।

ঠিক তেমনি এবার দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে সমঝোতার জন্য জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগ ও  বিএনপি নেতারা চারটি পয়েন্টে ( ১. বিরোধী নেতাকর্মীদের মুক্তি, ২. মামলা প্রত্যাহার, ৩. বিরোধী দলগুলোর অফিসগুলো খুলে দেয়া, ৪. সভা-সমাবেশের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার) এই চারটি পয়েন্টে প্রথমে একমত হয়েছিলেন কিন্তু ১১ই ডিসেম্বর যখন বৈঠক প্রায় সমাপ্তির দিকে তখন আওয়ামী লীগের তরফে বলা হয় এই পয়েন্টগুলোর ব্যাপারে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনই নেয়া যাবে না। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তখন মি. তারানকো সাহেব বললেন ওয়েল আপনারা বসে আলোচনা করেন আমি চললাম। অর্থাৎ তারানকো সাহেবের সমঝোতার চেষ্টাও ভেস্তে গেল। এছারা আরো অনেক বিদেশী নেতাও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সমঝোতা করার চেষ্টা করলেও সেটা সফল হয়নি।

এমতাবস্থায় প্রায় সকল দিক বিশ্লেষন করে দেখো যায় বর্তমান নির্বাচনকালীন মহাজোট সরকারর সেই ৯৬ সালেরই কঠিন প্রতিশোধ নিচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ৯৬ সালে তৎকালীন  বেগম খালেদা জিয়া যেমন ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচন করে সরকার গঠন করেছিল, তেমনি বর্তমান সরকার প্রধান শেথ হাসিনা এবং দলের নেতাদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে বর্তমান সরকারও দশম জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে চাচ্ছে। অনেকটা ১৭ বছরের আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই করছে বর্তমান দশম জাতীয় নির্বাচনের নির্বাচনকালীন মহাজোট সরকার। তবে এহেন অবস্থায় বাংলার সাধারণ মানুষের কন্ঠস্বর থেকে আবেদন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যাই ঘটুক না কেন বাংলার মানুষ একটু শান্তি চায়। বাংলার জনগন এই রাজনৈতিক রোষানল থেকে মুক্তি চায়।

 (এস এম সাজু আহমেদ) লেখক: সাংবাদিক এবং কলামিষ্ট

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...