হার্ডিঞ্জে কাটানো একদিন


মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে
তুমি যাচ্ছো পালকীতে মা চড়ে…………….

রবিঠাকুরের শিশুমনের সেই ভাবনার মত ঘুরে আসলাম আমরা নৃবিজ্ঞান পরিবার। যদিও আমাদের সাথে মা বাবারা ছিলো না, কিন্তু অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ।

ভোরের আলো তখনো ভালো ভাবে দেখা যায়নি। চারিদিকে আবছা আবছা অন্ধকার। ঘড়িতে ঘন্টার কাঁটা ঠিক ছয়টা বাজতেই রুম থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য আপাতত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ভবন। পৌঁছাতে পৌঁছাতেই পূর্বাকাশে লাল রক্তিম সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। সূর্যের আলোকজ্জল ঝলকানিতে চারিদিক যেন উল্লাসিত।

ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে দেখি সবুজ দুবলা ঘাসের  উপর বিন্দু বিন্দু  শিশির কণা জমে আছে। মনের অজান্তেই দোলা দিয়ে গেল কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতার দুটি চরণ- ‘আকাশ হতে খসল তারা আঁধার রাতে পথহারা। প্রভাত তারে খুঁজতে যাবে-ধরার ধূলায় খুঁজে পাবে তৃণে তৃণে শিশিরধারা।’

সত্যিই পথের প্রতিটি ধুলিকণাও আজ শিশিরবিন্দু হয়ে ধরা দিল। সিরাজী ভবনে পৌঁছে গেলাম সাড়ে ছয়টার মধ্যে। সেখানে পৌঁছেই আরও একটি চমক। ভাবছিলাম সবার আগে আমিই উপস্থিত হব। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। সেখানে আমার আগে আরও অনেকেই অপেক্ষায়। ধীরে ধীরে বিভাগের বন্ধু, বড় ভাইয়া-আপু শিক্ষকরা এসে জড়ো হতে লাগলো। সবমিলিয়ে দুইশ’ জনের এক পরিবার।

এবার অমাদের মূল গন্তব্য শত বছরে পর্দাপন করা পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু। এতক্ষণ যাদের কথা বলছিলাম ‘এরা  সবাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী।’ ইতিপূর্বে ঘুরতে গিয়েছি অনেক, কিন্তু আজ যে অনুভূতি নিজের মাঝে কাজ করছে এমনটা আগে কখনো হয়নি। আজকের ভ্রমন নিয়ে নিজের ভেতর যে ভালো লাগা কাজ করছিলো তার কারণ হয়তো ক্যাম্পাস লাইফের প্রথম বিভাগের সকলের সাথে ভ্রমনে যাওয়া।

ঘড়িতে সময় ঠিক সাড়ে আটটা। বিশ্ববিদ্যালয় হতে কাঙ্খিত গন্তব্যের উদ্দেশ্য তিনটি বাস ছেড়েছে। চলছে বাসের ভিতর তুমুল আড্ডা, গান, নাচ। আজ সময় যেন আমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে। মনে হলো মুহূর্তে পৌঁছে গেলাম পাকশী স্টেশনে। ঘড়িতে তখন প্রায় ১১টার কাটা ছুঁই ছুঁই। গাড়ি থেকে নেমেই কয়েকজন বন্ধু মিলে চলে গেলাম পাকশী রেল স্টেশনে।

পাকশী স্টেশনটি সমতল থেকে বেশ উঁচুতে অবস্থিত। উপরে গিয়ে মনে হলো আমরা যেন একটা ছোটখাটো পাহাড়ের উপরে আছি। রেললাইনের উপর দাড়িয়ে মনে পড়ে গেল, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ উদ্বোধনের সময় প্রধান প্রকৌশলী স্যার রর্বাট উইলিয়াস গেইলসের আবেগঘন কন্ঠে বলা-‘যে সেতু নির্মান করে দিয়ে গেলাম, উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এ সেতু চিরযৌবন হয়ে থাকবে।’

আজ উলিয়াম গেইলস নেই, নেই লর্ড হার্ডিঞ্জ। কিন্তু রয়ে গেছে তাদের অমর র্কীতি। রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন, ‘আজি হতে শত বর্ষ পরে, কে তুমি পড়িছ বসি,আমার কবিতাখানি, কৌতূহলভবে আজি হতে শত বর্ষ পরে।’ হার্ডিঞ্জ যেন গেইলের লেখা শত বর্ষ আগের এক কবিতা। এ যেন শত বছর আগের সেই অনুরাগের রক্তরাগ। শত বর্ষ পরের প্রজন্মের জন্য ভালোবাসার এক মহান উপহার। শত অনুরাগ ও আনন্দ অভিবাদন দিয়ে গড়া এক প্রজন্ম সেতু। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখে অনুভব করছিলাম রবি ঠাকুরের সেই কবিতা আর কল্পনায় ভেসে আসছিল শত বর্ষ আগের সেই মুহুর্তগুলো। হার্ডিঞ্জ ব্রিজে হারিয়ে যাওয়া সেই মূহুর্ত, সেই কীর্তি যা আমাদের নিয়ে যায় শত বর্ষ আগে। যেখানে সময় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। এ যেন দু’টি শতাব্দীকে সংযোগকারী এক সেতু।  এ যেন বর্তমানের বুকে একখন্ড হারিয়ে যাওয়া অতীত।

রেল লাইনের উপর থেকে আশপাশের এলাকা সহজেই নজরে আসে। নিচে আঁকাবাঁকা রাসত্মার দুই কোল দিয়ে সবুজের সমারোহ। জনবসতিও চোখে পড়ে। স্টেশনে থেকে ৫০ গজ দূরেই এই হার্ডিঞ্জ ব্রিজের অবস্থান যেটি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায় অবস্থিত। দেশের বৃহতম রেলসেতু হিসেবে পরিচিত এ ব্রিজটি পদ্মা নদীর ওপর গড়ে তোলেন তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯০৯ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে। আর তার নামেই পরবর্তীতে এ ব্রিজের নামকরণ করা হয়। ব্রিজের দক্ষিণে আর একটি বিখ্যাত ও দেশের অন্যতম সড়ক সেতু ‘লালন শাহ সেতু।’

সবমিলিয়ে প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যে  চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম। উপর থেকে নদীর দুই পাশের ঈর্ষণীয় সৌন্দর্য আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। তাই আর দেরি না করে চললাম পদ্মার পাড়ে।

সূর্য তখন মধ্য গগন থেকে পশ্চিমাকাশের সামান্য ঝুঁকেছে। ঘড়িতে দু’টা বাজে বাজে। একটু ক্ষুধাও লেগেছে তবুও যেন কিছু মনে হচ্ছে না। নদীর ধারে গিয়ে নৌকা ভ্রমন, ফটো সেশন করলাম। আজকের ভ্রমনে আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমি কোন এক স্বর্গরাজ্যে আছি। বিশেষ করে নৌকা ভ্রমনে স্যারদের সাথে কাটানোর সময়টা সবথেকে বেশি স্মরণীয়। যা কখনো ভুলবার নয়।

নৌকা ভ্রমন পর রওনা দিলাম পাকশী রিসোর্টের পথে। রিসোর্টের  মধ্যে সবুজের সমারোহে আমরা মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। বিকেল ছয়টা পর্যন্ত সেখানে চলল হরদম আড্ডা, একসাথে খাওয়া, আর চতুর্থ বর্ষের শিক্ষারীদের পরিচালনায় গানের অনুষ্ঠান ‘খেলাধূলা, লটারি ইত্যাদি ইভেন্ট আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেল ছোটবেলার অতীতে। রিমিঝিমি বাতাসের দোলায় হারিয়ে ফেললাম নিজেকে।

সারাটা দিন দেখতে দেখতে কেটে গেল। সময় মনে করিয়ে দিল বিদায়ের ঘন্টা বেজে গেছে এবার ফেরার পালা। হাজারো আনন্দের মাঝে মনে মনে বেজে উঠল বিদায়ের সুর। বিষাদ ভার করল সবার মনে। এমন দিনও কী শেষ হয়ে যেতে হয়! পেছনে সোনালী একটি দিনের হাতছানি আর সামনে ব্যস্ত জীবনের আগমনী।

তাই আর দেরি না করে রাজশাহী উদ্দেশ্য আবার বাসে উঠে পড়লাম সকলে। গোধূলি বেলার শেষ আভাটুকু তখন পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। গাছগাছালির ফাঁকে দেখা মিলছে রক্তিম সূর্যের। যেন একটু খানি বাদেই ঢুপ করে ডুব দিবে। গাড়ির ভেতর শুরু হলো আবার গানের আসর, নাচ, আড্ডা। গাড়ি চলছে হাওয়ার বেগে  অতীতকে পিছে ফেলে ভবিষ্যতের সন্ধানে। কিন্তু চাইলেই কেউ কী ভুলতে পারবে এই সোনালী অতীতকে?

এ এইচ রাজু, দ্বিতীয় বর্ষ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

dsa

‘পর্যবেক্ষকরা গণমাধ্যমে কথা বলতে পারবেন না’

স্টাফ রিপোর্টার :: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা পর্যবেক্ষক হবেন তারা ভোটকেন্দ্রে ...