সুফিয়া কামাল হলে রক্ত দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ছাত্রীরা

 সুফিয়া কামাল হলে রক্ত দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ছাত্রীরাস্টাফ রিপোর্টার :: ‘‘কিছু মেয়ে দেখে চিৎকার করছে। কিছু মেয়ে নিচে নেমে এলে তাদেরকে বলছে- ‘তেলাপোকা দেখে চিৎকার দিছে, কিছু হয় নাই।’ কিন্তু ফ্লোরে-সিঁড়িতে রক্ত দেখে হলের মেয়েরা একত্রিত হইছে। এর মধ্যে এশা ওই মেয়েদের নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিছে। তারপর হলের হাউস টিউটর মেমরা এসে মেয়েটাকে হাসপাতালে পাঠাইছে এবং হলের মাঠে সব মেয়েরা তখন ক্ষ্যাপা।’’

-এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী সাফিয়া শারমিন মঙ্গলবার রাতের পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন।

এ হলে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ছাত্রী মোরশেদা আক্তারকে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান এশার নেতৃত্বে মারধর করা হলে ছাত্রীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

একপর্যায়ে তারা আক্রান্ত ছাত্রীকে উদ্ধার করেন এবং ছাত্রলীগ নেত্রীকে মারধরের পর একটি কক্ষে আটকে রাখেন।

এ ঘটনার খবরে বিভিন্ন হল থেকে হাজার হাজার ছাত্র মিছিল নিয়ে সুফিয়া কামাল হলের সামনে এসে জড়ো হন। পরে রাতভর টিএসসিতে অবস্থান করে বিক্ষোভ করেন তারা।

এ ঘটনায় গভীর রাতেই ছাত্রলীগ সভাপতি এশাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেন উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান। এ ছাড়া তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি।

সুফিয়া কামাল হলের বাসিন্দা রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাস্টার্সের ছাত্রী সাফিয়া শারমিন সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন।

এতে তিনি বলেন, ঘটনার সূত্রপাত আনুমানিক রাত ১২টার দিকে। সারা দিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গেছিলাম। এক ফ্রেন্ডের ফোনে ঘুম ভাঙছে। লাফিয়ে উঠে নিচে দৌড় দিলাম। ৯ তলা থেকে নামতে নামতে দেখলাম ৩-৪ তলায় সিঁড়িতে রক্ত, ফ্লোরে রক্ত।

ভিড় ঠেলে নিচে নামলাম, আপুদের কাছে জিজ্ঞাসা করার পর বলল তিন দিন ধরেই অত্যাচার চলতেছিল নীরবে, যারা পলিটিক্যালি হলে উঠেছে তাদের ওপর, এখন এক মেয়ের পা কেটে দিয়েছে। কেউ ভয়ে মুখ খুলে নাই বলে উল্লেখ করেন সাফিয়া।

হলে প্রত্যয় ও প্রদীপ্ত নামে দুটি মুখোমুখি ভবন আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ নেত্রী এশা প্রত্যয় ভবনের ছাত্রীদের মারার সময় প্রতীপ্ত ভবনের কয়েকজন ছাত্রী তা দেখে চিৎকার করেন।

সাফিয়া বলেন, কিছু মেয়ে নিচে নেমে এলে তাদের বলছে- ‘তেলাপোকা দেখে চিৎকার দিছে, কিছু হয় নাই।’ কিন্তু ফ্লোরে-সিঁড়িতে রক্ত দেখে হলের মেয়েরা একত্রিত হয়। এর মধ্যে এশা ওই মেয়েদের নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন।

এর পর হলের আবাসিক শিক্ষকরা এসে আক্রান্ত ছাত্রীকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। তখন হলের মাঠে জড়ো বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা ছাত্রলীগ নেত্রী এশার বহিষ্কার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।

ওই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে সাফিয়া বলেন, এর মধ্যে এশাকে কিছু মেয়ে মাঠে নিয়ে আসছে, তখন কিছু মাইরও খাইছে। এর মধ্যে ভাইয়ারাও চলে আসছে হলের সামনে।

তিনি আরও বলেন, মেমরা জানতে চাইল- আমরা কী চাই? বললাম এশাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার, ওকে জুতার মালা পরাব আমরা। যেহেতু কোটা সংস্কার আন্দোলন অহিংস আন্দোলন, তাই মারব না।

এ সময় প্রক্টর অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী ছাত্রীকে উদ্ধার করতে সুফিয়া কামাল হলে এসে উপস্থিত হলে ছাত্রীরা তাকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন।

এর পর বেশ কিছুক্ষণ আলোচনার পর অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেত্রী এশাকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য ছাত্রীদের সামনে নেয় প্রক্টর।

সাফিয়া জানান, তখন ছাত্রীরা এশাকে জুতার মালা পরাতে চাইলে প্রক্টর এতে অসম্মতি জানান। এ নিয়ে ছাত্রীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। একপর্যায়ে ছাত্রীরা এশা ও অন্যদের মারধর করেন। তখন দুই ভবনের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়।

এর পর ছাত্রীরা হল ক্যান্টিনের পেছনের ফটক দিয়ে মূল ফটকের সামনে এসে জড়ো হন। ওই সময় বিভিন্ন হল থেকে আসা ছাত্রীরা বাইরে অবস্থান করে স্লোগান দিতে থাকেন।

সুফিয়া জানান, ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে ছাত্রলীগ নেত্রী এশাকে জুতার মালা পরানো হয়। এ সময় হলের আবাসিক শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছ থেকে মৌখিক বিবৃতি নেয়া হয়।

এর পরও ছাত্রীরা প্রক্টর ও এশাকে নাজেহাল করতে থাকলে আবাসিক শিক্ষকরা তাদের ‘হাউস টিউটর ভবনের’ ভেতরে ঢুকিয়ে কলাপসিবলগেট বন্ধ করে দেন।

তখন ছাত্রীরা ভবনটির সামনে অবস্থান নিয়ে তিন দফা দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- সুফিয়া কামাল হলে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থাকবে না, হলের ছাত্রীদের নির্যাতনের বিচার এবং আন্দোলনকালে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের বিচার করতে হবে।

সাফিয়া জানান, ভোররাত ৪টার দিকে সুফিয়া কামাল হলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এর পর ছাত্ররা সেখান থেকে চলে যায়। অন্যদিকে ছাত্রীরা তাদের দাবি আদায়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করতে থাকেন।

জানা গেছে, ছাত্রলীগ নেত্রীর হামলায় আহত মোরশেদাকে উদ্ধার করে হলের পাশে ফুলবাড়িয়ায় সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে তাকে মগবাজারে স্থানীয় অভিভাবকের বাসায় পাঠানো হয়।

এই ছাত্রীর পা ছাত্রলীগর নেত্রী এশা কাটেনি, বরং তিনি দরজায় লাথি দিলে পা কেটে যায় বলে একটি আলোচনা আছে। তবে হলের ছাত্রী সাফিয়া শারমিন এ দাবিকে বানোয়াট আখ্যা দেন। তিনি বলেন, একটা গুজব ছড়ানো হচ্ছে যে, মেয়েটি (মোরশেদা) পা নিজে কেটেছে, এটি পুরাটাই বানোয়াট।

এদিকে প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী জানিয়েছেন, নির্যাতনের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেত্রী এশাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নির্যাতিত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার ব্যবস্থাও তিনি করেন।

মোরশেদাকে নির্যাতনের বিষয়ে মঙ্গলবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, একজন ছাত্রীর ওপর আরেকজন ছাত্রী নির্মামভাবে যে আচরণ করেছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই।

তিনি জানান, ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত দর্শন বিভাগের ছাত্রী ইফফাত জাহান এশাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এশাকে বহিষ্কারের কথা রাতেই হল প্রশাসনকে জানানোর পাশাপাশি আজ এ আদেশ কার্যকরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হবে বলে জানান উপাচার্য।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সুপার ফোরে বাংলাদেশ

ডেস্ক নিউজ ::  আবুধাবির শেখ জায়েদ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের কাছে বিশাল ...