সুন্দরবন হোক হাজারও প্রজাতির অভয়ারণ্য

hWcW12

মহানন্দ অধিকারী মিন্টু :: মায়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আগলে রাখছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও জীব বৈচিত্রের আধার সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসভূমি এই সুন্দরবন।

জাতিসংঘের শিক্ষা-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনকে ৭৯৮ তম বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সুন্দরবন নিয়ে প্রকৃতিপ্রেমী সহ বিশ্ববাসীর আগ্রহের শেষ নেই। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিশাল প্রাকৃতিক প্রাচির সুন্দরবন।

বাংলাদেশ ও ভারত অংশ নিয়ে সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০ হাজার ২ শত ৮০ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশে সুন্দরবনের অবস্থান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৫টি জেলায় (খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর ও বরগুনা)।

স্থল ও জল মিলিয়ে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বনটি বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ শতাশং এবং সমগ্র বনাঞ্চলের ৫১ শতাংশ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৩৩৪ প্রজাতির গাছ, ২৯১ প্রজাতির মাছ, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়।

এত বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও প্রাণী পৃথিবীর আর কোনো ম্যানগ্রোভ বনে নেই। বনে জালের মত ছড়িয়ে আছে প্রায় ৪৫০টি ছোট বড় নদী ও খাল। প্রাণী ও বৃক্ষের বৈচিত্রের সমাহার এই বন বৈজ্ঞানিক, নৃতত্ব ও প্রত্নতাত্বিক বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে মোট বনাঞ্চলের ৪০ শতাংশ জুড়ে থাকা এ বনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। মূল্যবান প্রাণীজ, জলজ ও বনজ সম্পদ মিলে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের আঁধার সুন্দরবন। বনের সবুজ বেষ্টনী সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করছে। এ বন আজ অস্তিতের সংকটে।

বনজসম্পদ আহরণের নামে বিভিন্ন সময়ে বনের পশুপাখি হত্যা করা হচ্ছে। নিধন করা হচ্ছে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ-মায়া হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতি পশুপাখি। নির্বিচারে উজাড় করা হচ্ছে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল সুন্দরী, গরানসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর, ২০০৮ সালের ২৫ মে আইলাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মারাত্নক ভাবে ৰতি করেছে সুন্দরবনকে।

ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করায় এর সংরক্ষণের দায়িত্ব বেশ বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা করছে সরকার। যার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় বনের সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর আগে ১৯৯৫ সালে সুন্দরবন থেকে সুন্দরি কাঠ আহরণ নিষিদ্ধ করে সরকার। ২০০৪ সালে নিষিদ্ধ করা হয় গরান কাঠ সংগ্রহ।

প্রায় ২০০বছর আগে থেকে উপকূলীয় মানুষ সুন্দরবন সম্পদ আহরণ করে জীবনজীবীকা নির্বাহ করে আসছে।

এখন সুন্দরবন সম্পদ আহরণ করে জীবন নির্বাহ করছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান করে আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে বনজীবীরা বেকার হয়ে পড়বেন। অভাব-অনটন দেখা দেবে, কর্মসংস্থান না পেয়ে অনেকেই দস্যুবৃত্তিসহ অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

আমাদের বেঁচে থাকার স্বার্থে সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ কোনো আবেগ নয়, বাস্তবতায় অত্যন্ত যৌক্তিক। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেই চলেছে। তাই এ বনের জীববৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য এখন প্রয়োজন সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস।

প্রকৃতি প্রেমীদের পদচারনায় মুখরিত হবে সুন্দরবন। বিকশিত হবে পরিবশে বান্ধব পর্যটন শিল্প। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আগমণ বাড়বে এবং দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। সে কারনে দ্রুত বাস্তবায়িত হোক বনের সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব; আর সুন্দরবন হোক হাজারও প্রজাতির অভয়ারণ্য।

 

লেখক: মহানন্দ অধিকারী মিন্টু, ইউনাইটেড নিউজ পাইকগাছা (খুলনা)প্রতিনিধি।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বোরহান উদ্দিন

এলিয়েন বা ভিনগ্রহের মানুষ !

বোরহান উদ্দিন :: পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোনো গ্রহে অন্য কোনো প্রাণী আছে কিনা ...