সার্ক সম্মেলন স্থগিত

অনিশ্চয়তা ছিল গোড়া থেকেই। গত মার্চে সার্ক দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে যখন শীর্ষ সম্মেলনের দিন-তারিখ নিয়ে কথা হয় তখনও নানা জটিলতা ছিল। চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে পাকিস্তানের অযাচিত হস্তক্ষেপের ধারাবাহিক প্রতিবাদ করছিল বাংলাদেশ।

33546_srcপাল্টাপাল্টি কূটনীতিক প্রত্যাহারের ঘটনায় সম্পর্ক প্রায় তলানীতে গিয়ে ঠেকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চলতি মাসের শুরুতে খবর রটেছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না-ও যেতে পারেন! অবশ্য তাৎক্ষণিক সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো খবরটির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। তখন বলা হয়েছিল- নিরাপত্তার কারণে শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ সার্ক বর্জন করতে পারে। কেবল বাংলাদেশ নয়, নিরাপত্তার ঘটতির বিষয়টি স্পষ্ট হলে অন্যরাও সেই পথেই হাঁটবে। অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্যিই হয়েছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারত, ভুটান এবং আফগানিস্তান সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।

ঘোষণাগুলো প্রায় কাছাকাছি সময়ে এসেছে। লঙ্কানদের তরফে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও কলম্বো এরই মধ্যে বলেছে, ভারতের অংশগ্রহণ ছাড়া এ সম্মেলন হতে পারে না। আর এর মধ্যদিয়ে সার্কের নীতিমালা অনুযায়ী আগামী নভেম্বরে ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আপাতত স্থগিত হয়ে গেল। নীতিমালা অনুযায়ী একটি দেশ ভেটো দিলেই শীর্ষ সম্মেলন স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে যায়। সেখান লঙ্কানদের হিসাবে নিলে ৫টি সদস্য রাষ্ট্রের তরফে সার্কে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে। সার্কের বর্তমান সভাপতি দেশ নেপালকে বর্জনকারী দেশগুলোর তরফে নেয়া সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের অন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও কাঠমুন্ডুর সার্ক সচিবালয়ে চিঠি (নোট ভারবাল) পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা অবশ্য মনে করছে, ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের টানাপড়েন এখানে যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তারচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সেনা ব্রিগেডে সন্ত্রাসী হামলা এবং ভারত-পাকিস্তান টানাপোড়েন ও উত্তেজনার বিষয়টি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ তার টুইট বার্তায় লেখেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সন্ত্রাস একসঙ্গে চলতে পারে না। সেখানেই তিনি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন থেকে ভারতের সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি প্রকাশ করেন।

বিকাশ স্বরূপ তার টুইটে বলেন, সার্কের সভাপতি দেশ নেপালকে ভারত জানিয়েছে, এ অঞ্চলে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ায় এবং সদস্যদেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি দেশের হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ায় এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যা নভেম্বরে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের জন্য সহায়ক নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা, কানেকটিভিটি ও যোগাযোগের ব্যাপারে ভারত তার অঙ্গীকারের ব্যাপারে অবিচল আছে। ভারত বিশ্বাস করে, শুধু সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশেই এসব এগিয়ে নেয়া সম্ভব। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষে ইসলামাবাদের প্রস্তাবিত শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়া সম্ভব নয়। বিকাশ আরও বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি, সার্কের আরও কয়েকটি দেশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ইতিমধ্যে তাদের আপত্তির কথা জানিয়ে দিয়েছে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বুধবার দুপুরে তার দপ্তরে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন। বাংলাদেশের সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রভাব আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবও দেন তিনি। বলেন, ‘অন্য কোনো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটি বাংলাদেশে নিজস্ব সিদ্ধান্ত।’

ভেন্যু পরিবর্তন কি সমাধান? ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে ৫ দেশের যোগদানে আপত্তির পর সার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারত ও পাকিস্তানে এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। সার্কের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের আলোচনা-পর্যালোচনা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর আমেনা মহসিন মনে করেন- সার্ক অতীতেও নানা সংকটের মধ্যে এগিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শীর্ষ সম্মেলনে স্থগিত হলেও আঞ্চলিক ওই ফোরাম টিকে থাকবে এবং ধীর গতিতে হলেও এগিয়ে যাবে। তবে ভারতীয় এক সংবাদ মাধ্যম বলছে, ভেন্যু পরিবর্তন করার মধ্য দিয়ে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট নিরসনের চেষ্টা হতে পারে। ভারতের সংবাদমাধ্যমের ওই পর্যবেক্ষণ প্রকাশের আগেই ঢাকার সাংবাদিকরা ভেন্যুর বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিবেচনায় উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি অবশ্য ভিন্নমত করেছেন। বলেছেন, স্থান বা ভেন্যু মুখ্য নয়। এখানে পরিবেশ পরিস্থিতি শীর্ষ সম্মেলনের সহায়ক হওয়া জরুরি।

ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, আফগানিস্তানের প্রত্যাখ্যানে সার্ক সম্মেলন স্থগিত, নিঃসঙ্গ পাকিস্তান!

মানবজমিন ডেস্ক: নয়া দিল্লির ঝটিকা কূটনীতিতে কার্যত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে পাকিস্তান। নভেম্বরে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সার্কের বার্ষিক সম্মেলন বর্জন করেছে ভারত। এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান ও আফগানিস্তান। শ্রীলঙ্কা জানিয়ে দিয়েছে, ভারতের অংশগ্রহণ ছাড়া এ সম্মেলন হতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে কার্যত এ অঞ্চলে একা হয়ে পড়েছে পাকিস্তান। এরই মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি ইসলামাবাদে সার্ক সম্মেলনে যোগ দেবেন না। এর ফলে ১৯তম সার্ক সম্মেলন স্থগিত হয়ে গেছে। কাঠমান্ডু পোস্ট ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। কাঠমান্ডু পোস্টের খবরের শিরোনাম ‘সার্ক সামিট পৌস্টপৌনড’। এতে বলা হয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ সম্মেলনে অংশ না নেয়ার কথা মঙ্গলবার জানিয়ে দিয়েছে ভারত। তারপরই নভেম্বরের এ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে সার্কের চেয়ার নেপালকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদি সার্কের কোনো একটি সদস্য এ সম্মেলনে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকে তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মেলন স্থগিত বা বাতিল হয়ে যায়। অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সার্কের বর্তমান চেয়ার নেপালকে বাংলাদেশ একটি বার্তা দিয়ে জানিয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘একটি দেশ’-এর ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ইসলামাবাদে সার্কের ১৯তম সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন হতে পারে না।

ভুটান বলেছে, তারা সার্ক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু সম্প্রতি এ অঞ্চলে সন্ত্রাসের যে বিস্তার তাতে তারা উদ্বিগ্ন। নভেম্বরে ইসলামাবাদে ১৯তম সার্ক সম্মেলন সফলভাবে সুষ্ঠু পরিবেশে সম্পন্ন হওয়া নিয়ে গুরুতর ‘কমপ্রোমাইজ’ করতে হবে। থিম্পু থেকে মঙ্গলবার পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, সন্ত্রাসের কারণে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে সার্কের কিছু সদস্য দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাজকীয় ভুটান সরকার তার সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। তাদেরকে জানাচ্ছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সার্ক সম্মেলনে অংশ নিতে পারছি না।

সূত্র বলেছে, সার্কের চেয়ার নেপালকে একই রকম বার্তা জানিয়েছে আফগানিস্তান। তাদের বার্তায় বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়া সন্ত্রাসের ফলে যে সহিংসতা ও লড়াই বৃদ্ধি পেয়েছে তা নিয়ে দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আশরাফ গনি পুরোপুরি ব্যস্ত থাকবেন। তাই তিনি সম্মেলনে যোগ দিতে পারবেন না। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা জানিয়ে দিয়েছে, ভারতের অংশগ্রহণ ছাড়া এ সম্মেলন হতে পারে না।

ভারত মঙ্গলবারই ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা জম্মু-কাশ্মিরের উরিতে সেনা ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার পর ইসলামাবাদ সম্মেলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ওই হামলায় ভারতের কমপক্ষে ১৮ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করে। মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আবদুল বাসিতকে তলব করেন। তার কাছে জানিয়ে দেন যে, উরি হামলায় নিহত এক সন্ত্রাসী ও অন্য দু’জন নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেছিল। তারা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের মুজাফফরাবাদের। এ কথা জানিয়ে দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামাবাদ সম্মেলনে যোগ না দেয়ার কথা জানিয়ে দেয় ভারত। ওদিকে আবদুল বাসিত ভারতের পররাষ্ট্র সচিবকে বলেন যে, পাকিস্তান বিশ্বাস করে উরি হামলা ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষীদের দ্বারা সংঘটিত একটি হামলা। এর মাধ্যমে কাশ্মিরের মনোযোগ অন্যদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেন। ওদিকে সার্ক সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্তকে পাকিস্তান দুর্ভাগ্যজনক বলে আখ্যায়িত করেছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নির্বাচন এক সপ্তাহ পিছিয়ে ৩০ ডিসেম্বর

স্টাফ রিপোর্টার :: একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ৭ দিন পিছিয়ে ৩০ ডিসেম্বর ...