ব্রেকিং নিউজ
Home / Featured / সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষিকার ছবি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের সম্মান প্রদর্শন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষিকার ছবি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের সম্মান প্রদর্শন

জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেনমো: রফিকুল আনোয়ার :: ‘আজি হতে চির উন্নত হল শিক্ষা গুরুর শির, সত্যি তুমি মহান উদার বাদশাহ আলগীর।’ শতবছর আগে এটি এক শিক্ষকের উচ্ছাস ভরা উচ্চারণ। কিন্তু এখন আর তা নেই। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষকদের মর্যাদাও ক্ষেত্র এবং সময় বিশেষে বৈপ্লবিক হারে লংগিত হচ্ছে। রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার দাপটে অসহায় ইতিহাসের সেই মর্যাদাশীল পেশা শিক্ষকতা। সংসদ সদস্যের হাতে শারিরীক লাঞ্চনার শিকার শিক্ষক এইতো নিকট অতীতের।

মাত্র ২/৪ দিন আগে আরেক শিক্ষিকা লাঞ্চিত আরেক জনপ্রতিনিধির হাতে। ইতিহাস বলে যুগে যুগে অতি অত্যাচারী শাসকও নত শিরে গুরুর সামনে দাড়িয়েছেন। গুরুকে অসম্মানের দৃষ্টতা কেউ দেখাননি। কিন্তু বর্তমান সময়ে তা তিরোহিত। শিক্ষক মানব সভ্যতার অগ্রনায়ক নন মহানায়কও বটে। জাতি গঠনের সত্যিকারের কারিগর। শিক্ষকের হাত ধরে মানব সভ্যতার সূত্রপাত। সভ্যতার লালন পালন পোষন সবই শিক্ষকের হাতে। শিক্ষক আছেন বলেই সভ্যতা আছে।

কিন্তু আজকাল শিক্ষকদের ন্যূনতম ঘটনায় অপমান অপদস্থ করা হচ্ছে। প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করা হচ্ছে শিক্ষকতা পেশাকে। দেশে শিক্ষকদের তেমন একটা মূল্যায়ন নেই বললেই চলে।

সম্প্রতি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার খলাচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার শ্রেণিকক্ষে ঘুমের ছবি স্যোশাল মিডিয়া ফেসবুকে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে জানা গেছে ৫ম শ্রেণীর মডেল টেষ্ট পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে এই স্কুলের শিক্ষিকা দ্বীপ্তি রাণী বিশ্বাস শারীরিক দুর্বলতায় টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন।

এরই মাঝে স্কুল পরিদর্শনে আসেন উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন। তিনি অফিস কক্ষে না গিয়ে সরাসরি চলে যান শ্রেণীকক্ষে। শ্রেণীকক্ষে গিয়ে তিনি শিক্ষিকাকে ঘুম থেকে না জাগিয়ে শিক্ষিকার ছবি তুলতে ব্যস্ত থাকেন। শুধু ছবি তোলেই তিনি ক্ষান্ত হননি, এই ছবিগুলো জামাতপন্থী সাংবাদিক কেএম মামুনকে দিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন। একজন উপজেলা চেয়ারম্যান পূর্ব ঘোষনা ছাড়া যে কোন বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে পারেন এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠেছে এই বিদ্যালয়টি পরিদর্শন উপজেলা চেয়ারম্যানের গতানুগতিক কর্মসূচীর অংশ নাকি পরিকল্পিত? একটি বিদ্যালয়ে বর্তমান সময়ে ৪/৫জনের নীচে শিক্ষক নেই। তাহলে উপজেলা চেয়ারম্যানের বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় বাকী শিক্ষকরা কোথায় ছিলেন? উপজেলা চেয়ারম্যান যখন শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করেন ছবিতে তার সাথে কোন শিক্ষককে দেখা যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে উপজেলা চেয়ারম্যানের খলাচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন নিয়ে।

সচেতন মহল মনে করছে একটি মহল পরিকল্পিত ভাবে উপজেলা চেয়ারম্যানকে দিয়ে এই স্কুলটি পরিদর্শন করিয়েছেন। এখানে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে উপজেলা চেয়ারম্যান শ্রেণীকক্ষ পরিদর্শনের সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা অন্যকোন শিক্ষককে সাথে নিলেন না কেন? যতটুকু জানা যায় উপজেলা চেয়ারম্যান উপজেলা বিএনপির একাংশের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান আহবায়ক কমিটির সদস্য। কিছুদিন পূর্বে তিনি বরখাস্ত হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলায় চার্জশিট আদালতে গৃহিত হওয়ায় মন্ত্রণালয় থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।

জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন

জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন

বিভিন্ন সূত্রমতে, বিজ্ঞমহল অনুমান করছে উপজেলা চেয়ারম্যানের স্কুল পরিদর্শনটি পর শিক্ষিকাকে তিনি শ্রেণীকক্ষে ঘুমন্ত অবস্থায় পেলেও তিনি প্রসাশনিক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি শিক্ষিকার ছবিটি ফেসবুকে পোষ্ট করে দেন। সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে একজন ঘুমন্ত শিক্ষিকার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান শিক্ষকতা পেশার প্রতি কতটুকু সম্মান প্রদর্শন করলেন?

একজন শিক্ষিকার শ্রেণীকক্ষে ঘুমানো দায়িত্ব অবহেলার শামিল। আর এজন্য সরকারী চাকুরী বিধিমালা মোতাবেক সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারত সতর্কতা বা তিরস্কার। উপজেলা চেয়ারম্যান এটা জানতেন। এটা জানতেন না তা কেউ বিশ্বাস করার কথা না। অনেকে মনে করছেন, শিক্ষিকার ঘুমের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ উদ্দ্যেশে ছাড়া হয়েছে তা এখন দিবালোকের মতো পরিস্কার। বিএনপি নেতা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়তো অন্য কাউকে এই স্কুলে আনার জন্য দ্বীপ্তি রাণীকে এই স্কুলে থেকে তাড়ানোর কৌশলী প্রচারণার অংশ হিসেবে তার ঘুমন্ত ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন।

আবার রাজনৈতিক মহল বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে দ্বীপ্তি রাণী যেহেতু হিন্দু সেহেতু আওয়ামী লীগের নামাবলী তার গায়ে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকালীন সময়ে আওয়ামীপন্থীরা দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করে না এটা বুঝানোর জন্য ছবিটি পোস্ট করে থাকতে পারেন। অবশ্য শিক্ষিকা দ্বীপ্তি রাণী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন-‘তিনদিন ধরে আমার শরীর খুব খারাপ। আমার স্বামী বাড়িতে এসে ঔষধ দিয়ে গেছেন।

আজ সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে হেড স্যারের কাছে ছুটি নিতে চেয়েছিলাম কিন্তু ছুটি না নিয়ে নিজের দায়িত্বের প্রতি সম্মান আর সহকর্মীদের সহযোগিতা ভেবে স্কুলে গেলাম। যাওয়ার পর পরীক্ষার ডিউটিতে ছিলাম। শরীর মোটামুটি ভালই আছে। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম, মাথা ঘুরাচ্ছে। তাই চেয়ারে গিয়ে বসলাম। এরপর হঠাত মাথা টেবিলে লেগে গেলে নিজেই বুঝতে পারি নাই। ৫/৬ মিনিট পরে দেখি শরীর কাপছে।

এমতাবস্থায় দেখি জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান উনার সহকারী দিয়ে ছবি তুলাচ্ছেন। পরে স্কুলের অফিসে গিয়ে উনি আমার নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করেন এবং আমার সামনে কেএম মামুন নামের একজনকে ফোন দিয়ে ছবিগুলো পাঠান। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কেন তিনি এমনটি করলেন। উনারও তো একটি পরিবার আছে। এরপরই এই অপ্রস্তুত ছবিগুলো ফেসবুকে ভাইরাল হয়। তা অত্যন্ত দু:খজনক। আমার এই অসুস্থ শরীরের ঘুমের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’

দ্বীপ্তি রাণীর ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি যে ক্ষমা চেয়েছেন তার জন্য লজ্জ্বা হচ্ছে আমাদের। কেননা স্কুলে ৫/৭ মিনিট ঘুমিয়ে দ্বীপ্তি রাণী এমন অপরাধ করেননি যার জন্য তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লক্ষ কোটি মানুষের সামনে ক্ষমা চাইতে হবে। যারা একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেয় প্রতিপন্ন করে মজা পায় তাদের বিরুদ্ধে সজাগ হতে হবে। মর্যাদা পেতে শিক্ষিকদের সংগ্রাম করতে হবে। নিজেদের জন্য না হোক, শিক্ষক জাতিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে আন্দোলনের বিকল্প নাই।

 

লেখক পরিচিতি: লেখক সম্পাদক, দৈনিক নোয়াখালী প্রতিদিন ও আহবায়ক, নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন সমন্বয় কমিটি।

email:noakhalipratidin@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আসিফের ‘নেই প্রয়োজন’

আসিফের ‘নেই প্রয়োজন’ (ভিডিওসহ)

স্টাফ রিপোর্টার :: এ বছরের শুরুতে ধ্রুব মিউজিক স্টেশন (ডিএমএস) এর ব্যানারে ...