সামাজিক অবক্ষয় এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী

ঝর্না চৌধুরী :: মানুষ নিজেদের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই সমাজ গড়ে তুলেছে আর এই সমাজে নানারকম অনুশাসন, রীতি-নীতি মেনে চলার প্রথা প্রবর্তন করেছে। এর মূলমন্ত্রই হচ্ছে মানুষের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা-নির্ভরতা, সহযোগিতা-সহমর্মিতা সর্বোপরি মানবতাবোধকে অটুট রাখা। কিন্তু এই সমাজে নানাবিধ কারণে ঘুণে ধরেছে বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে! সামাজিক অবক্ষয়ের এই ক্ষত এত দ্রুত বহুমুখী বিস্তার লাভ করছে যে, সমাজ অস্তিত্বহারার সংকটে ভুগছে! তাই এখনই প্রতিরোধে সোচ্চার না হলে সমাজের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!  আমাদের সামাজিক অবক্ষয় দ্রুত বাড়ার কারণগুলো হলো— অধিক জনসংখ্যা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, অভাব-অনটন, বেকারত্ব, প্রেমে-ব্যর্থতা, সঙ্গদোষ, অভিভাবকের অসচেতনতা, সুশিক্ষার অভাব সর্বোপরি দেশের আইনের দুর্বল প্রয়োগ নীতি! যেহেতু আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি, সেহেতু প্রতিকার করার সকল পন্থাও আমাদের দ্রুত অবলম্বন করতে হবে নিজেদের মঙ্গল চিন্তায় পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ে তোলার আশায়। আমাদের শারীরিক ক্ষত সারাতে যেমন ওষুধের প্রয়োজন তেমনই সামাজিক ক্ষত সারাতে মানুষের জাগ্রত বিবেকের প্রয়োজন। মানবতাবোধের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রেখে সামাজিক ক্ষত সারাতে হবে দ্রুতগতিতে- যাতে আমাদের এই মহৎবোধ বিলুপ্ত বা নিঃশেষ হতে না পারে।  আমাদের বর্তমান যুবসমাজ বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে বিবেক বর্জিত হয়ে কুকর্মে ব্যবহার করছে! মানুষের কল্যাণ চিন্তা না করে অকল্যাণে কাজে লাগাচ্ছে! বিবেককে কাজে না লাগিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে। বেকারত্ব অলসতা বাড়িয়ে দিয়ে কর্মক্ষম মস্তিষ্ককে বিকল করে দিচ্ছে! প্রথমে মানুষকে সুশিক্ষিত করে কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এই ক্ষেত্রে দেশের সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে দেশও দেশের মানুষদেরকে ভালোবেসে, মানুষ আর সমাজের কল্যাণে।  দেশের বিত্তশালী ব্যক্তিগণ তাদের অর্থ ব্যাংকে ফেলে না রেখে কল-কারখানা তৈরি করে বেকার সমস্যার সমাধানে সরকারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। যুবসমাজের বেকারত্ব দূর হলে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ইত্যাদি দূর হবে। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলেই মানুষ পরিবার, সমাজ সর্বোপরি দেশের মঙ্গল চিন্তায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে সচেতন হবে। সুশিক্ষা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে বিবেকহীন কাজে বাঁধা দেবে।  সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে নারী-পুরুষ উভয়ই নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে কোন না কোন ভাবে তবে পুরুষদের চাইতে  নারীরা অনেকগুণ বেশি তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।শুধু যে পুরুষরাই নির্যাতন করছে তা কিন্তু নয় অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই হচ্ছে নারীর শত্রু! তারা পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে নারীদেরকে অত্যাচার করে আর পুরুষদেরকে সহযোগিতা করে এগিয়ে দেয়। চলুন একটু দেখে আসি- নারী নির্যাতন কোথা থেকে শুরু হয় আবার কোথায় গিয়ে শেষ হয় এবং কি কি পদ্ধতিতে এই সহিংসতা ঘটানো হয়-এই সহিংসতা বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত পর্যন্ত বিস্তৃত! যৌতুক, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, খুন, জখম, অপহরণ, আটক, অবরোধ, পাচার, ফতোয়া, অসম বিচার, সামাজিক বর্জন, মৌখিক বাক্যবাণে ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মানসিক নির্যাতন।  শুধু মাত্র নারী হবার কারণেই নারীরা যে নির্যাতনওনিষ্ঠুরতার শিকার হয় বা প্রতিনিয়ত হচ্ছে, সেখানে মানবতাবোধের এক চিলতে মমতার সন্ধান কী পাওয়া যায়? মানুষের প্রতি মানুষের মমতা না থাকলে মানবতাবোধ শব্দটির আদৌ কোন মূল্য আছে কী? হাহাকার বোধ ছাড়া!  আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষেরা নারীদেরকে শুধু দুর্বল, অক্ষম, সেবাদাসী, ভোগের সামগ্রী, মমতাময়ী, সন্তান উৎপাদনকারী আর অসম্পূর্ণ একজন নারীই ভাবে, পূর্ণাঙ্গ মানুষ ভাবে না।তারা নিজেরাই পরিপূর্ণ আর নারীরা অসম্পূর্ণ। নারীরা যে, পরিবার, সমাজ, দেশ, সমগ্র বিশ্ব এমন কি পর্বত শৃঙ্গ থেকে মহাকাশ পর্যন্ত নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দেখাচ্ছে তবুও তারা তাদের ছানিপড়া চোখে স্পষ্ট দেখতে পায়না!  নারীদেরকে সুযোগ-সুবিধা,অধিকার-স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রেখে নিজেরা সব ভোগ করে একক ভাবে বাহবা কুড়াবার কৌশল তারা কুক্ষিগত করেছে আর যুগের পর যুগ তারা সফল ও হচ্ছে! তাদের এই মন-মানসিকতার জন্য নারীরা এক পা এগিয়ে দশ পা পিছিয়ে যায় এটা কী তাদের ব্যর্থতা নয় ?নারী-পুরুষ সবাই পরিপূর্ণ মানুষ এই ভাবনার মধ্যে যে মানবতাবোধ লুকিয়ে আছে তা তাদের বোধগম্য করাতে হবে সুশিক্ষার মাধ্যমে বিবেককে জাগ্রত করে।এই ক্ষেত্রে দেশের সরকারের দায়িত্ব সর্বাধিক।  বেকার সমস্যার সমাধানকরে, কঠোর আইন প্রয়োগ করে, বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ বন্ধ, সব ধরণের নারী নির্যাতন রোধকল্পে নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত নারী যেন থানা বা কোর্টে গিয়ে দিনের পর দিন ধর্না দিতে না হয়, বিচার কার্য যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে অসহায় নারীর আত্মবিশ্বাস জাগায়, এই ব্যবস্থাগুলো দ্রুত গ্রহণ করা সরকারের অবশ্যই করণীয় এবং পরিবার, সমাজ ও দেশের জনগণকে স্ব-স্ব স্থান থেকে আন্তরিক হয়ে নিজেদের কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে, সমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে।  আমরা জানি, কোন পদক্ষেপ গ্রহণ ই কার্যকর করা যায় না গণসচেতনতা ছাড়া। আর এই গণসচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে, সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো, বিভিন্নপ্রচারমাধ্যমগুলো, সংবাদপত্রগুলো, সাংবাদিকগণ এবং  লেখকগণ। সাংবাদিক ও লেখকগণ সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ, ধরণ ও প্রতিকারের উপায় বা দিক নির্দেশনা দিতে পারেন কিন্তু প্রথম এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে এবং প্রয়োজনে দ্রুত কঠোর আইন প্রয়োগ করে।  ‘প্রথম আলো-২৫শে নভেম্ভর ২০১৪’—‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’উপলক্ষে প্রকাশিত তথ্য-চার বছরের প্রতিবন্ধী শিশু থেকে পঞ্চান্ন বছর বয়সী নারীও ধর্ষণের নির্যাতনের নিষ্ঠুরতা থেকে রক্ষা পায়নি!!বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে চলতি বছর ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ বছরে নারীরা শুধু ধর্ষণের শিকার ই হয়েছেন তিন হাজার বিরানব্বই জন!  তাছাড়া যৌতুক, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ইভ-টিজিং, খুন, জখম, অপহরণ, আটক, অবরোধ, পাচার, ফতোয়া, অসম বিচার, সামাজিক বর্জন, মৌখিক বাক্যবাণেও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কতো নারী যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অকালে প্রাণ হারাচ্ছে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে, সারা জীবন ধুঁকে-ধুঁকে মরছে-তাদের কতোজনের খবর আমরা রাখতে পারছি?     উপরোক্ত নারী নির্যাতন অপরাধগুলো আমাদের দেশে মারাত্মকভাবে সংঘটিত হতে দেখা যাচ্ছে। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা, পরনির্ভরশীলতা, দারিদ্র্যতা এবং ধর্মীয়ও সামাজিক ভাবে নারী-পুরুষের ভেদাভেদপূর্ণ ধ্যানধারণা নারী নির্যাতনকে দ্রুতগতিতে তরান্বিত করছে। যদিও নারী শিক্ষার উন্নয়ন, বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ বন্ধের আইন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে বিভিন্ন কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ ব্যবস্থা শিথিল।  এই শিথিল অবস্থা থেকে দ্রুত গতিশীল করে, প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রয়োগ করে, আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে নারী নির্যাতনরোধ ও সামাজিক অবক্ষয়রোধ করে, আইনের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনতে এবং পরিচ্ছন্ন সমাজ উপহার দিতে আশা করি মাননীয় সরকার যথাসম্ভব দ্রুত সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।    লেখক: ঝর্না চৌধুরী, লেখক, ময়মনসিংহ। ইমেইল: jharnachowdhury45@yahoo.com    ঝর্না চৌধুরী :: মানুষ নিজেদের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই সমাজ গড়ে তুলেছে আর এই সমাজে নানারকম অনুশাসন, রীতি-নীতি মেনে চলার প্রথা প্রবর্তন করেছে। এর মূলমন্ত্রই হচ্ছে মানুষের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা-নির্ভরতা, সহযোগিতা-সহমর্মিতা সর্বোপরি মানবতাবোধকে অটুট রাখা। কিন্তু এই সমাজে নানাবিধ কারণে ঘুণে ধরেছে বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে! সামাজিক অবক্ষয়ের এই ক্ষত এত দ্রুত বহুমুখী বিস্তার লাভ করছে যে, সমাজ অস্তিত্বহারার সংকটে ভুগছে! তাই এখনই প্রতিরোধে সোচ্চার না হলে সমাজের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!

আমাদের সামাজিক অবক্ষয় দ্রুত বাড়ার কারণগুলো হলো— অধিক জনসংখ্যা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, অভাব-অনটন, বেকারত্ব, প্রেমে-ব্যর্থতা, সঙ্গদোষ, অভিভাবকের অসচেতনতা, সুশিক্ষার অভাব সর্বোপরি দেশের আইনের দুর্বল প্রয়োগ নীতি! যেহেতু আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি, সেহেতু প্রতিকার করার সকল পন্থাও আমাদের দ্রুত অবলম্বন করতে হবে নিজেদের মঙ্গল চিন্তায় পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ে তোলার আশায়। আমাদের শারীরিক ক্ষত সারাতে যেমন ওষুধের প্রয়োজন তেমনই সামাজিক ক্ষত সারাতে মানুষের জাগ্রত বিবেকের প্রয়োজন। মানবতাবোধের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রেখে সামাজিক ক্ষত সারাতে হবে দ্রুতগতিতে- যাতে আমাদের এই মহৎবোধ বিলুপ্ত বা নিঃশেষ হতে না পারে।

আমাদের বর্তমান যুবসমাজ বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে বিবেক বর্জিত হয়ে কুকর্মে ব্যবহার করছে! মানুষের কল্যাণ চিন্তা না করে অকল্যাণে কাজে লাগাচ্ছে! বিবেককে কাজে না লাগিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে। বেকারত্ব অলসতা বাড়িয়ে দিয়ে কর্মক্ষম মস্তিষ্ককে বিকল করে দিচ্ছে! প্রথমে মানুষকে সুশিক্ষিত করে কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এই ক্ষেত্রে দেশের সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে দেশও দেশের মানুষদেরকে ভালোবেসে, মানুষ আর সমাজের কল্যাণে।

দেশের বিত্তশালী ব্যক্তিগণ তাদের অর্থ ব্যাংকে ফেলে না রেখে কল-কারখানা তৈরি করে বেকার সমস্যার সমাধানে সরকারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। যুবসমাজের বেকারত্ব দূর হলে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ইত্যাদি দূর হবে। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলেই মানুষ পরিবার, সমাজ সর্বোপরি দেশের মঙ্গল চিন্তায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে সচেতন হবে। সুশিক্ষা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে বিবেকহীন কাজে বাঁধা দেবে।

সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে নারী-পুরুষ উভয়ই নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে কোন না কোন ভাবে তবে পুরুষদের চাইতে  নারীরা অনেকগুণ বেশি তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।শুধু যে পুরুষরাই নির্যাতন করছে তা কিন্তু নয় অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই হচ্ছে নারীর শত্রু! তারা পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে নারীদেরকে অত্যাচার করে আর পুরুষদেরকে সহযোগিতা করে এগিয়ে দেয়। চলুন একটু দেখে আসি- নারী নির্যাতন কোথা থেকে শুরু হয় আবার কোথায় গিয়ে শেষ হয় এবং কি কি পদ্ধতিতে এই সহিংসতা ঘটানো হয়-এই সহিংসতা বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত পর্যন্ত বিস্তৃত! যৌতুক, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, খুন, জখম, অপহরণ, আটক, অবরোধ, পাচার, ফতোয়া, অসম বিচার, সামাজিক বর্জন, মৌখিক বাক্যবাণে ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মানসিক নির্যাতন।

শুধু মাত্র নারী হবার কারণেই নারীরা যে নির্যাতনওনিষ্ঠুরতার শিকার হয় বা প্রতিনিয়ত হচ্ছে, সেখানে মানবতাবোধের এক চিলতে মমতার সন্ধান কী পাওয়া যায়? মানুষের প্রতি মানুষের মমতা না থাকলে মানবতাবোধ শব্দটির আদৌ কোন মূল্য আছে কী? হাহাকার বোধ ছাড়া!

আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষেরা নারীদেরকে শুধু দুর্বল, অক্ষম, সেবাদাসী, ভোগের সামগ্রী, মমতাময়ী, সন্তান উৎপাদনকারী আর অসম্পূর্ণ একজন নারীই ভাবে, পূর্ণাঙ্গ মানুষ ভাবে না।তারা নিজেরাই পরিপূর্ণ আর নারীরা অসম্পূর্ণ। নারীরা যে, পরিবার, সমাজ, দেশ, সমগ্র বিশ্ব এমন কি পর্বত শৃঙ্গ থেকে মহাকাশ পর্যন্ত নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দেখাচ্ছে তবুও তারা তাদের ছানিপড়া চোখে স্পষ্ট দেখতে পায়না!

নারীদেরকে সুযোগ-সুবিধা,অধিকার-স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রেখে নিজেরা সব ভোগ করে একক ভাবে বাহবা কুড়াবার কৌশল তারা কুক্ষিগত করেছে আর যুগের পর যুগ তারা সফল ও হচ্ছে! তাদের এই মন-মানসিকতার জন্য নারীরা এক পা এগিয়ে দশ পা পিছিয়ে যায় এটা কী তাদের ব্যর্থতা নয় ?নারী-পুরুষ সবাই পরিপূর্ণ মানুষ এই ভাবনার মধ্যে যে মানবতাবোধ লুকিয়ে আছে তা তাদের বোধগম্য করাতে হবে সুশিক্ষার মাধ্যমে বিবেককে জাগ্রত করে।এই ক্ষেত্রে দেশের সরকারের দায়িত্ব সর্বাধিক।

বেকার সমস্যার সমাধানকরে, কঠোর আইন প্রয়োগ করে, বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ বন্ধ, সব ধরণের নারী নির্যাতন রোধকল্পে নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত নারী যেন থানা বা কোর্টে গিয়ে দিনের পর দিন ধর্না দিতে না হয়, বিচার কার্য যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে অসহায় নারীর আত্মবিশ্বাস জাগায়, এই ব্যবস্থাগুলো দ্রুত গ্রহণ করা সরকারের অবশ্যই করণীয় এবং পরিবার, সমাজ ও দেশের জনগণকে স্ব-স্ব স্থান থেকে আন্তরিক হয়ে নিজেদের কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে, সমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে।

আমরা জানি, কোন পদক্ষেপ গ্রহণ ই কার্যকর করা যায় না গণসচেতনতা ছাড়া। আর এই গণসচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে, সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো, বিভিন্নপ্রচারমাধ্যমগুলো, সংবাদপত্রগুলো, সাংবাদিকগণ এবং  লেখকগণ। সাংবাদিক ও লেখকগণ সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ, ধরণ ও প্রতিকারের উপায় বা দিক নির্দেশনা দিতে পারেন কিন্তু প্রথম এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে এবং প্রয়োজনে দ্রুত কঠোর আইন প্রয়োগ করে।

‘প্রথম আলো-২৫শে নভেম্ভর ২০১৪’—‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’উপলক্ষে প্রকাশিত তথ্য-চার বছরের প্রতিবন্ধী শিশু থেকে পঞ্চান্ন বছর বয়সী নারীও ধর্ষণের নির্যাতনের নিষ্ঠুরতা থেকে রক্ষা পায়নি!!বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে চলতি বছর ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ বছরে নারীরা শুধু ধর্ষণের শিকার ই হয়েছেন তিন হাজার বিরানব্বই জন!

তাছাড়া যৌতুক, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ইভ-টিজিং, খুন, জখম, অপহরণ, আটক, অবরোধ, পাচার, ফতোয়া, অসম বিচার, সামাজিক বর্জন, মৌখিক বাক্যবাণেও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কতো নারী যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অকালে প্রাণ হারাচ্ছে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে, সারা জীবন ধুঁকে-ধুঁকে মরছে-তাদের কতোজনের খবর আমরা রাখতে পারছি?

উপরোক্ত নারী নির্যাতন অপরাধগুলো আমাদের দেশে মারাত্মকভাবে সংঘটিত হতে দেখা যাচ্ছে। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা, পরনির্ভরশীলতা, দারিদ্র্যতা এবং ধর্মীয়ও সামাজিক ভাবে নারী-পুরুষের ভেদাভেদপূর্ণ ধ্যানধারণা নারী নির্যাতনকে দ্রুতগতিতে তরান্বিত করছে। যদিও নারী শিক্ষার উন্নয়ন, বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ বন্ধের আইন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে বিভিন্ন কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ ব্যবস্থা শিথিল।

এই শিথিল অবস্থা থেকে দ্রুত গতিশীল করে, প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রয়োগ করে, আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে নারী নির্যাতনরোধ ও সামাজিক অবক্ষয়রোধ করে, আইনের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনতে এবং পরিচ্ছন্ন সমাজ উপহার দিতে আশা করি মাননীয় সরকার যথাসম্ভব দ্রুত সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

লেখক: ঝর্না চৌধুরী, লেখক, ময়মনসিংহ। ইমেইল: jharnachowdhury45@yahoo.com    

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আরিফ চৌধুরী শুভ

বই পড়ার মাথাপিছু বরাদ্দ মাত্র ৬০ পয়সা!

আরিফ চৌধুরী শুভ :: একুশ শতকের গ্রন্থাগার এখন আর কেবল জ্ঞানের সংগ্রহশালাই নয়, ...