সাতক্ষীরা সীমান্তে দিয়ে বানের মত আসছে গরু ও ফেন্সিডিন

কোরবাণীর ঈদকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার চোরাকারবারীরা আবারো বেপরোয় হয়ে উঠেছে। সাতক্ষীরার ১২টি চোরাচালানিঘাট দিয়ে প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার ভারতীয় গরু বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। আর এসব গরু আনার পাশাপাশি বানের স্রোতেরমত আসছে মরণনেশা ফেনসিডিল। পক্ষানত্মরে একই সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশি রসুন। এদিকে সীমান্ত চোরাঘাট দিয়ে প্রতিদিন ভারতীয় রোগাক্রান্ত এবং আনথ্রাক আক্রান্ত গবাদিপশু বিভিন্ন রোগ-জিবানু বহন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে দাবি করেছে সদর উপজেলা প্রানি সম্পদ অধিদপ্তরর। তাদের মতে পরিক্ষা-নিরিক্ষা ছাড়াই ওই সমসত্ম পশু বাংলাদেশে নিয়ে আসা প্রানি ও মানব সম্পদের জন্য হুমকি স্বরুপ। কারণ নিয়ে আসা অধিকাংশ ভারতীয় গরু দেহে ক্ষুরা রোগ ও আনথ্রাক্র জীবানু বহন করে থাকে। সীমানত্ম পথে নিয়ে আসা এসব ভারতীয় গরু কোরিডোর ছাড়াই লাখ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। প্রতিদিন সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও চাঁদাবাদির প্রায় অর্ধকোটি টাকা চলে যাচ্ছে গরুর ঘাট নয়ন্ত্রক, বিজিবি, কতিপয় সাংবাদিক, কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও সদর থানা পুলিশের পকেটে।

সংশিষ্ট সূত্র মতে, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা, গাজীপুর, কুশখালী, তলুইগাছা, শাঁখরা এই ছয়টি সীমানেত্ম গরুর ঘাটসহ সাতক্ষীরার ১৩৮ কিলোমিটার সীমান্তের ১২টি চোরাচালানীঘাট দিয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ২/৩ হাজার ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আর এসব গরুর সাথে আনা হচ্ছে বসত্মাভর্তি হাজার হাজার বোতল ফেনসিডিল। এদিকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গরু প্রতি কোরিডোর বাবদ ৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন ২০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা। অথছ দুই থেকে তিন’শ গরু করিডোর দেখিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টাকা পকেটস্থ করার উৎসবে মেতে উঠেছে সীমানেত্মর কয়েকটি সঙ্গবদ্ধ চক্র। বিজিবি কর্মকর্তাদের নামে গরু প্রতি আদায় করা হচ্ছে (করিডোর বাদে) আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। গরুপ্রতি প্রকাশ্য চাঁদা আদায় করা হলেও বিজিবি কর্মকর্তারা অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকায় রয়েছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ ভারতীয় গরু আসছে তাতে করিডোর বাবদ গড়ে ২০ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারি রাজস্ব খাতে জমা হচ্ছে মাত্র লাখ খানেক টাকা। করিডোরের বাইরে প্রতিদিন বাড়তি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে আরও প্রায় ৩০ লাখ টাকা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য প্রতিদিন গড়ে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চোরাচালান সাম্রাজ্যের অধিপতি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা গ্রামের আনিছুর রহমান, তলুইগাছা গ্রামের আব্দুল খালেক ও রেউই গ্রামের বাশার। মাত্র বছর খানেকের মধ্যে তারা কোটিপতি বনেগেছে। পুলিশ কর্মকর্তা, কতিপয় সাংবাদিকসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বাড়িতে তাদের নিয়মিত যাতায়াত করতে দেখা যায়। প্রভাবশালী এসব ব্যক্তিদের সহযোগিতা নিচ্ছে গরুর ঘাট নিয়ন্ত্রক খালেক, জলিল ও রেউই গ্রামের বাশার বিজিবি কর্মকর্তাদের নামে গরু প্রতি আদায় করা হচ্ছে (করিডোর বাদে) আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। গরুপ্রতি প্রকাশ্য চাঁদা আদায় করা হলেও বিজিবি কর্মকর্তারা অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকায় আছে।

সমপ্রতি গরুর ঘাটের নাম দেয়া হয়েছে গরুর বীট। ঘোনার বীটে দায়িত্বে রয়েছে মনিরুল, বৈকারীর বীটে মফিজুল ও জুলু, তলুইগাছার বীটে খালেক ও রেউই গ্রামের বাঁশার, কুশখালীর বীটে গোলাম মোরশেদ, গাজীপুরের বীটে জাকির, শাখরার বীটে খোকন গরুপ্রতি করিডোর বাদে অতিরিক্ত ২৩’শ থেকে আড়াই হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০ লাখ টাকা গরুর বীট থেকে চোরাচালান সিন্ডিকেটের আয়। খালেক ও বাশার এই টাকার মোটা একটি অংশ সাতক্ষীরার জনৈক এক এপিপি’র মাধ্যমে বিজিবির সাতক্ষীরাস্থ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছেন। এর একটি নির্ধারিত অংশ প্রবাভশালী একটি জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক ও যশোর থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের নাম ভাঙ্গিয়ে গরুর বীট নিয়ন্ত্রক চোরাচালান সম্রাট হিসেবে খ্যাত একাধিক মামলার আসামি আব্দুল খালেক ও বাশারের কাছ থেকে আদায় করছে। এসব অপকর্ম করে সঙ্গবদ্ধ চক্রটি একদিকে সরকারকে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে অন্যদিকে গরু ব্যবসায়ীদের বাড়তি গচ্চা লাগিয়ে দেশীয় মাংসের বাজারকে অস্থির করে তুলছেন। এসব চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রকাশ্য বিজিবি কর্মকর্তাদের নামে চাঁদা আদায় করলেও অজ্ঞাত কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা।

গরু ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান, সোহরাব আরও জানান, যেদিন গরু দেশের অভ্যনত্মরে আসবে তার আগের দিন সীমানত্ম দালালদের হাতে হিসাব করে টাকা পৌঁছে দিতে হয়। তা না দিলে পরদিন গরু সীমানত্ম পার হয়না। আবার গরু পার হয়ে আসলেও এসব গরুর সাথে আনা হচ্ছে হাজার হাজার বোতল মরণনেশা ফেনসিডিল। এসব ফেনসিডিল পরে বিভিন্ন পরিবহন, মোটরসাইকেল-ইঞ্জিনভান ও পেক-আপযোগে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। পক্ষানত্মরে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে রসুনের মূল্য বেশি হওয়ায় প্রতিদিন শত শত মন রসুন ওই সব সীমানত্মদিয়ে বিজিবি’র সদস্যদের চোখের সামনে দিয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে ভারতে। সীমানত্ম খাটালে বন্ধ করে রাখা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গরু ব্যবসায়ীসহ কাথণ্ডা বাজারের ডা. শফিকুল ইসলাম শফি জানান, সাতক্ষীরার পশ্চিম এলাকার এক ডজন চোরাচালানি ঘাট নিয়ন্ত্রণ করে তলুইগাছার সম্রাট নামে পরিচিত চোরাঘাট পরিচালক আব্দুল খালেক, জলিল ও রেউই গ্রামের বাঁশার। প্রতিটি ঘাটে তার নিযুক্ত লোকজন রয়েছে। এরাই নিয়মিত চাঁদার টাকা উত্তোলন করে থাকে। বিজিবি হেটকোয়াটারের কাছ থেকে সীমানত্ম ঘাট ইজারা নিয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, তুলইগাছার ৩টি চোরাঘাট পরিচালনা করেন সীমানত্ম কিং প্রায় অর্ধডজন মামলার আসামি আব্দুল খালেক পার্র্শ্ববর্তী কুশখালি সীমানেত্মর ৩টি চোরাঘাট পরিচালনা করেন গোলাম মোরশেদ সে তার নিজস্ব লোক দিয়ে এখানের ৩ টি ঘাট চালাচ্ছেন। পাশাপাশি বৈকারি সীমানেত্ম ধুড় ঘাটের দায়িত্বে থেকে চাঁদা উত্তোলন করছে কাথণ্ডা গ্রামের মৃত মোনত্মাজ এর ছেলে আব্দুর রউফ। পাশাপাশি ঘোনা সীমানেত্মর কয়েকটি চোরাঘাট চলছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নিজস্ব লোক আনিছুর ও মনিরুলকে দিয়ে। এরা সকলেই চোরাঘাটের চাঁদার টাকা উত্তোলন করে তলুইগাছার আব্দুল খালেক এর নিকট পৌঁছে দেন। এভাবেই চলছে চোরাচালানি নেটওয়ার্ক। তবে সামপ্রতিক সময়ে বেপরোয়া গরু আসার ঘটনায় সীমানত্মবাসী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। সেদেশ থেকে আসা গরুগুলো এ্যাণ-্রাক্স আক্রান্ত কি না তা পরিক্ষা করার কোন ব্যবস্থা সীমানেত্ম করা হয়নি।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা প্রানি হাসপাতালের ভেটেনারী সার্জন ডাঃ জয়দেব কুমার সিংহ জানান, সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ভারতীয় গরু রোগ-জীবানু বহন করে বাংলাদেশে ঢুকছে। তা পরিক্ষা-নীরিক্ষা ছাড়াই প্রবেশ করছে। এটা প্রানি ও মানবসম্পাদের জন্য হুমকি স্বরুপ। ভারতীয় এসব গরু ক্ষুরা রোগ ও এনথ্রাক রোগের জীবানু বহন করে থাকে।

সাতক্ষীরা ৪১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: কর্নেল এনায়েত করিম সাংবাদিকদের জানান, গরুগুলো যাতে করিডোর হয় সেজন্যই বীটপ্রথা চালু করা হয়েছে। করিডোর ফি ছাড়া আর কোন টাকা নেয়ার বিধান নেই। গরু প্রতি অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। খোঁজ-খবর নিয়ে তিনি ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/নাজমুল হক/সাতক্ষীরা

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বছরে আত্মহত্যায় মারা যায় ৮ লাখ মানুষ

নিউজ ডেস্ক :: প্রত্যেক বছর প্রায় ৮,০০,০০০ মানুষ আত্মহত্যা করেন। । এমনটাই ...