সাজেকে ইউপিডিএফের ৩ কর্মীকে গুলি করে হত্যা: ৬ মাসে ২৪ হত্যাকান্ড

সাজেকে ইউপিডিএফের ৩ কর্মীকে গুলি করে হত্যা

আল মামুন, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:: পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার, এক পক্ষ অন্যপক্ষকে ঘায়েলসহ শক্তির পরিক্ষায় পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের রক্তাক্ত হয়ে উঠছে পাহাড়। প্রতিনিয়তই পাহাড়ে ঝড়ছে তাজা প্রাঁণ। একের পর এক হত্যাকান্ডের ঘটনায় বাড়ছে আতঙ্ক আর উদ্বেগ-উৎকষ্ঠা। হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতায় প্রতিশোধের অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সিমান্তবর্তী উপজেলায় বাঘাইছড়ির সাজেকে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) তিন সদস্য নিহত হয়েছে।

নিহতরা হলেন- স্মৃতি চাকমা (৩২), সঞ্জীব চাকমা (২৮) ও অতল চাকমা (২৬)। এতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে কানন চাকমা নামে আরো একজন। সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাঘাইছড়ি উপজেলার দক্ষিণ করল্ল্যাছড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, রাতে উপজেলার দক্ষিণ করল্ল্যাছড়ি এলাকায় একটি বাড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ও তার সহযোগি সংগঠনের কয়েকজন সদস্য ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালের দিকে প্রতিপক্ষগ্রুপ জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের (জেএসএস) সদস্যরা তাদের গুলি করে হত্যা করে চলে যায়। পরে সকালে ঘরে তাদের গুলিবিদ্ধ লাশ দেখে স্থানীয়দের খবরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এ সময় গুলিবিদ্ধ কানন চাকমা নামে আরো একজনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফের সংগঠক ও গনতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি অংগ্য মারমা জেএসএস সংস্কার ও তাদের সহযোগিদের দায়ী করে বলেন, ইউপিডিএফ নেতাকর্মী হত্যার মিশনের অংশ হিসেবে এ হত্যাকান্ড ঘটনা হয়েছে। এটি পূর্ব পরিকল্পিত দাবী করে তিনি হত্যাকান্ডের বিচার দাবী করেন। হত্যাকান্ডের জন্য জেএসএস সংস্কারপন্থী গ্রুপকে দায়ী করা হলেও হত্যাকান্ডের তা অস্বীকার গ্রুপটি ।

রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলমগীর কবীর জানান, লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে বলে তিনি জানান।

তিন সদস্যকে গুলি করে ইউপিডিএফের নিন্দা:

ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)-এর রাঙামাটি জেলা ইউনিটের সংগঠক সচল চাকমা সংবাদ মাধ্যমে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে সোমবার (২৮ মে ২০১৮) সকালে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের গঙ্গারাম করল্যাছড়িতে সংস্কারবাদী জেএসএস-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্তৃক ইউপিডিএফ ও গণতন্ত্রিক যুব ফোরামের ৩ সদস্যকে গুলি করে হত্যা ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে তিনি এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় সেনাবাহিনীর যোগসাজশ থাকার অভিযোগ করে বলেন, গতকাল রবিবার রাতে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় একটি মাইক্রোবাসযোগে সংস্কারবাদী জেএসএস-এর ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলকে গঙ্গারাম করল্যাছড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। আজ সোমবার সকাল ৭টার দিকে ওঁৎ পেতে থাকা উক্ত সন্ত্রাসী দলটি সেখানে একটি বাড়িতে অবসস্থানরত ইউপিডিএফ সদস্যদের ওপর অতর্কিতে ব্রাশ ফায়ার করে। এতে ঘটনাসস্থলেই স্মৃতি চাকমা(৫০), অতল চাকমা(৩০) ও সঞ্জীব চাকমা (৩০) নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সঞ্জীব চাকমা গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সদস্য।

বিবৃতিতে সচল চাকমা সংস্কারবাদী জেএসএস পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসের উপস্থিতি প্রমাণ করতে পরিকল্পিতভাবে সংস্কারবাদী পেলে-সুদর্শন-অংশুমান চক্রকে স্বার্থবাদী গোষ্ঠীটি ব্যবহার করছে। তিনি পেলে-সুদর্শন-অংশুমান চক্রকে সেনাবাহিনীর খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসে সংগ্রামী জনতার কাতারে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

বিবৃতিতে তিনি নেতা-কর্মী হত্যা করে ইউপিডিএফ-কে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, গঠনলগ্ন থেকেই ইউপিডিএফ’র উপর রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। বিবৃতিতে ইউপিডিএফ নেতা অবিলম্বে ইউপিডিএফ’র তিন সদস্যকে হত্যার সাথে জড়িত সংস্কারবাদী জেএসএস সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। ইউপিডিএফ প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ নিরন চাকমা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।

লাশের মিছিলে ৬ মাসে ২৪ তাঁজা প্রাঁণ:

পাহাড়ে আধিপত্য আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেটে রেখে পাল্টাপাল্টি হত্যাকান্ডের ঘটনায় গত ৬ মাসে লাশের মিছিলে যুক্ত হলো আরো ৩ তাঁজা প্রাঁণসহ সংখ্যা হলো ২৪ জন। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিতে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের এক-দশমাংশ বাংলাদেশ সরকার অনেক ত্যাগ স্বীকার করে ভূ-খন্ড রক্ষার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর উগ্রপন্থী শান্তিবাহিনীর সাথে চুক্তি করলে পাহাড়ে আজো থামেনি রক্তের হলিখেলা।

যে চুক্তিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বা শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত। চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক অতিবাহিত হলেও সমাধান হয়নি পাহাড়ের সমস্যা। দিনদিন দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। গত ৬ মাসে ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) ও জনসংহতি সমিতি এমএন লারমার ২১ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন তিন পার্বত্য জেলায়। ধারাবাহিক খুনের অংশ হিসেবে আজ সোমবার (২৮ মে ২০১৮) আরো ৩ জনের প্রাঁণ ঝরলো অকালে।

চুক্তি পরবর্তী সময়ে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা পিসিজেএসএস নামে আঞ্চলিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করে। অপরদিকে, চুক্তির বিভিন্ন ধারার বিরোধীতা করে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মপ্রকাশ ঘটে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ’র। মতার্দশের অমিলে ২০০৭ সালে ভাঙ্গন ধরে পিসিজেএসএস এ। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রথম নির্বাচিত সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আর্দশপন্থী আত্মসমর্পণকারী পিসিজেএসএস নেতারা বিভক্ত হয়ে পিসিজেএসএস-এমএন লারমা নামে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে।

নতুন করে বিরোধ শুরু:

সবশেষ ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর ভাঙ্গন ধরে ইউপিডিএফ’র মাঝে। এনিয়ে চুক্তির পক্ষ বিপক্ষের চারটি সংগঠন দাঁড়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারীতে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠন মিঠুন চাকমাকে। শুরু হয় আবারো নতুন করে রক্তের হলিখেলা। তার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে গত ৬ মাসে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হত্যা অভিযোগ করে আসছে দলগুলো।

গত ৩ ও ৪ মে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও এমএন লারমার কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি শক্তিমান চাকমা এবং ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এর সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ৬ জন খুন হয়েছেন। সর্বশেষ গত ২১ মে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় উজ্জল কান্তি চাকমা নামে ইউপিডিএফর এক সাবেক সদস্য খুন হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। ধারনা করা হচ্ছে তপন জ্যোতি চাকমাসহ নানিয়ারচর হত্যাকান্ডের প্রতিশোধের অংশ হিসেবে সাজেকের এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, বিগত ৬ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০ জন খুন হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সংগঠন গুলোর মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ থাকলেও গত বছরের ডিসেম্বর থেকে তা আবার শুরু হয়। এতে করে উদ্বেগ বাড়ে পাহাড়ে।

নাম না ছাপানোর শর্তে একাধিক সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনের মূল কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আধিপত্য বিস্তার। ইউপিডিএফর সামরিক শাখার কমান্ডার তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা নতুন দল(গণতান্ত্রিক) ঘটনার পর থেকে ইউপিডিএফর ১০ নেতাকর্মী খুন হওয়া, চাঁদাবাজীসহ বিভিন্ন এলাকার আধিপত্য কমতে থাকে।

এছাড়া আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসন ছিনিয়ে নিতে অনেক আগে থেকে মরিয়া ইউপিডিএফ। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক শত্রু পিসিজেএসএসর সাথে সখ্যতা বৃদ্ধি করে ইউপিডিএফ। কিন্তু বিগত ছয়মাসে ইউপিডিএফর আধিপত্যের ধস মোকাবেলায় করতে গিয়ে পাহাড় অশান্ত হয়ে উঠছে।

এমএন লারমার রাজনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক বিভূরঞ্জন চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপ পাহাড়ের শান্তি চায় না। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে পাহাড়ে শান্তি ফেরার কথা। কিন্তু তাদের বিরোধীতার কারণে শান্তির পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বলয় থেকে যে বের হয়ে প্রতিবাদ কিংবা রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে তাদের তারা হত্যা কিংবা গুম করছে। যার প্রমাণ মিলে তপন জ্যোতি চাকমাসহ অন্যান্যদের খুন হওয়ার ঘটনায়। পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পাহাড়ী জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধে জেএসএসর সাথে সমঝোতার বিষয়টি আংশিক সত্য জানিয়ে ইউপিডিএফ সমর্থিত গণতান্ত্রিক যুবফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি অংগ্য মারমা বলেন, ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিরোধীতা করেনি। চুক্তির কিছু ধারার বিরোধীতা করে আসছে। বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করে চুক্তির বাস্তবায়ন করতে হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউপিডিএফর জনপ্রিয়তা বাড়ছে দাবি করে তিনি বলেন, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থি জয়ী হলেও সংসদে যেতে দেয়া হয়নি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ইউপিডিএফ যেকোন সমঝোতা করতে পারে।

সম্প্রতি সময়ের হত্যাকান্ডের বিষয়ে বলেন, তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা একসময় ইউপিডিএফর সাথে থাকলেও সাংগঠনিক বিরোধী কর্মকান্ডের অপরাধে তাকে বহিস্কার করা হয়েছি। এমএন লারমা সমর্থিতদের ছত্রছায়া সে ও ইউপিডিএফ থেকে বিভিন্ন সময় বহিস্কৃতরা মিলে নতুন সংগঠন করে। কিন্তু পাহাড়ী জনগণ সেটিকে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে নয় নব্য মুখোশ বাহিনী হিসেবে তাদের চিনে। বর্মাসহ অন্যান্য হত্যাকা-ের জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী না করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি জানান তিনি।

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মালয়েশিয়ায় ৫৫ বাংলাদেশি আটক

ডেস্ক রিপোর্ট :: মালয়েশিয়ায় ওয়ার্ক পারমিটের নিয়ম লঙ্ঘন করে কাজ করার অভিযোগে ...