সমকামিতাকে বৈধতা দিল ভারত

ষ্টাফ রিপোর্টার :: যৌনতায় ব্যক্তিগত পছন্দের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে এবং যৌনতা নিয়ে পুরোনো ধ্যান-ধারণাকে বদলে ফেলার তাগিদ দিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আজ এক ঐতিহাসিক রায়ের মধ্য দিয়ে দেশটিতে সমকামকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

একই সঙ্গে আদালত ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলে জারি করা আইনের যে ধারাটির বলে দেশে সমকামকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো, সেই ধারাটিকেই সংবিধান পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করে বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ বিচারপতির সংবিধান বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে এ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। অন্য বিচারপতিরা হলেন রোহিতার নরমান, এ এম খানউইলকর, ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় ও ইন্দু মালহোত্রা।

জানা যায়, ২০১৩ সালের এক রায়ে উপনিবেশ আমলের আইন ‘৩৭৭’ ধারার মাধ্যমে ভারতে সমকামকে অপ্রাকৃতিক ও অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আজকের রায়ের মাধ্যমে সে রায় নাকচ হয়ে গেল এবং দেশটিতে সমকামকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো।

‘৩৭৭’ ধারার বিধি অনুসারে যে কেউ ‘অপ্রাকৃতিক যৌনতা’য় লিপ্ত হলে ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান ছিল।

সমঅধিকার বিষয়ক কর্মীরা এ রকম একটি আইনকে বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করে দীর্ঘদিন ধরে এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। সমকামের বৈধতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছিল ভারতের সমকামী ও হিজড়া সমাজ।

অবশেষে আজ এই ঐতিহাসিক রায়ের পরপরই সমকামকে বৈধ ঘোষণার পক্ষে আদালতের বাইরে দাঁড়ানো লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়ে। আনন্দে অনেককেই কাঁদতে দেখা যায়।

প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র সমকামের পক্ষে তাঁর রায়ে বলেন, ‘যৌনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা অযৌক্তিক ও সংবিধান পরিপন্থী।’

রায়ে দীপক মিশ্র আরো জানান, পুরোনো ধ্যান-ধারণা বদলের সময় এসেছে। সব নাগরিককে সমান অধিকার দিতে হবে।

ব্যক্তিগত পছন্দ স্বাধীনতার অন্যতম শর্ত। ভারতীয় সংবিধানে এলজিবিটি (লেসবিয়ান, গে, বায়সেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার) গোষ্ঠীর সদস্যরা বাকিদের মতো একই অধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে উল্লেখ করেন অন্য বিচারপতিরা।

রায় অনুসারে, এখন থেকে স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক কোনোভাবেই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না। সমাজে এলজিবিটি কমিউনিটির নিশ্চিত হলো এ রায়ের মাধ্যমে। এখন থেকে সমকামীরা আইন অনুসারে বিয়ে কিংবা শিশু দত্তক নিতে পারবেন। তবে কোনো প্রাণীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হবে।

২০০১ সালে দিল্লি হাইকোর্টে প্রথম স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নাজ ফাউন্ডেশন ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে আপত্তি জানায় এবং ওই ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে। ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্ট জানায়, সমকামিতা কখনো অপরাধ হতে পারে না। একে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা অসাংবিধানিক। কিন্তু ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়ে সমকামিতা বা প্রান্তিক যৌনতাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে।

কিন্তু ২০১৭ সালের আরেক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, সমকামী বা রূপান্তরকামীদের যৌনতা তাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে এবং এর সাংবিধানিক বৈধতা থাকা উচিত। তার পর থেকে জোরেশোরে ৩৭৭ ধারা অবলুপ্তির দাবি ওঠে। চলতি বছরের জুলাই মাসে শীর্ষ আদালত জানায়, পুরোনো রায় কতটা সঠিক, তা খতিয়ে দেখা হবে।

প্রথাবিরুদ্ধ যৌনতার বিষয়টিকে শুধু ব্যক্তি পছন্দের হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না, বরং এর সঙ্গে মানুষের জিনের (মন ও শরীরের গঠনকাঠামো) সম্পর্ক আছে; ফলে এ অধিকার সুরক্ষিত হওয়া উচিত বলে আদালতে দাবি ওঠে।

অবশেষে সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে আজ এই ঐতিহাসিক রায়ের মধ্য দিয়ে ভারতে সমকামিতাকে বৈধতা দিল আদালত।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নির্বাচনের সঙ্গে খালেদার মুক্তির কোন সম্পর্ক নেই: গয়েশ্বর

ষ্টাফ রিপোর্টার :: নির্বাচনের সাথে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির কোন সম্পর্ক নেই ...