শ্যামলী খান’র স্মৃতিকথা ‘কোন কোন স্মৃতি ইতিহাস হয়’

Shamoli Khan

কোন কোন স্মৃতি ইতিহাস হয়
শ্যামলী খান

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় মোহাম্মদ আসাদের লেখা একজন নাদেরের খোঁজে পড়লাম। নাদেরকে নিয়ে আমার কৌতূহল অনেক দিনের। কখনো স্মৃতি হাতরে, কখনোবা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোন লেখা পেলে যে নাদেরকে আমি এতদিন খুঁজে ফিরছি, মোহাম্মদ আসাদের লেখায় সেই নাদেরের খোঁজ পেলাম। যিনি একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা । তার আগে নাদের ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের টগবগে এক যুবক।

পুরনো অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে যা মনে ধারন করাটা এই মূহুর্তে একান্ত জরুরী । মোহাম্মদ আসাদের লেখায় আছে তাকে ভুলে গেছি আমরা। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাতেও নেই তার নাম। কিন্তু না, মোহাম্মদ আসাদ আপনার ধারনা ভুল। পুরনো ঢাকাবাসী এখনও তাঁকে স্মরন করেন পরম শ্রদ্ধাভরে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাতে তার নাম না থাকলেও পুরনো ঢাকাবাসীর হৃদয়ের তালিকাতে তার নামটি এখনও লেখা আছে স্বর্নাক্ষরে।

অনেকদিন আমার মাকে বলতে শুনেছি, আহা নাদের যদি না থাকত তাহলে আমরা পুরনো ঢাকার সমস্ত মানুষ জ¦লে পুড়ে শেষ হয়ে যেতাম। মা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল নয় মাসের ভয়ংকর সব গল্প প্রায়ই শোনাতেন। তখন মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম মায়ের বলা গল্প। অনেক গল্পই এখন ঝাপসা হয়ে গেছে স্মৃতির পাতায়। তখন ছোট্র মনে ভাবিনি কত মূল্যবান কাহিনী শুনছি, মায়ের মুখ থেকে। যখন সে সব কাহিনী লেখায় ধারন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি মা আমার চিরদিনের জন্য গল্প বলা থামিয়ে দিলেন, একই সংগে বাবাও এবং সবশেষে নানী। একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের জীবনাবসান ঘটে। যাহোক, আমি যাদের কাছে নতুন করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা,মুক্তিযোদ্ধাদের অমর বীরত্বগাঁথা শুনতে পারতাম তারা আর কোন গল্প বলার জন্য গল্পের ঝাঁপি নিয়ে আমাদের সামনে বসবেন না।

Shamoli Khanজাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের ডায়েরী’ পড়েছি। সেখানে নয়াবাজার ও ফ্রেঞ্চ রোডে আগুন লাগার কথা উল্লেখ আছে কিন্তু নাদের বাহিনী সম্পর্কে তথ্য নেই। আমি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনেক বই পড়েছি নাদের সম্পর্কে জানার জন্য। কিন্তু কোন ছিঁটে ফোটা বর্ণনাও নাদের সম্পর্কে উল্লেখ নেই কোন বইতে। কেন নেই এতে আমি প্রচন্ড বিস্ময় প্রকাশ বরছি । রাবেয়া খাতুনের ‘একাত্তরের নয়মাস’ পড়েছি। সেখানে নয়া বাজারের কাঠের গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল উল্লেখ আছে অথচ নাদের বাহিনীর সম্পর্কে কোন তথ্য নেই।

তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরনো ঢাকাবাসীর কাছে নাদের ছিলেন একটি বিশাল ঘটনা। তখন সবার মুখে মুখে তার কথা শোনা যেত। আমি নাদের সম্পর্কে মায়ের মুখে শুনেছি যে, পাকবাহিনী রাজাকারদের মদদে একটি হিন্দু পতিতা পল্লী পোড়াতে গিয়ে আগুনের সূত্রপাত ঘটায়। পঁচিশে মার্চের পরে নাদের বাহিনী যখন পাক আর্মীদের ওপর আক্রমন করে তখন হানাদারদের দল প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নয়া বাজার, শাঁখারীবাজার সহ একের পর এক আগুন লাগাতে থাকে। নাদের বাহিনী পাক আর্মীদের হটিয়ে সে আগুন নিয়ন্ত্রনেও আনে। এরপরও পুরনো ঢাকাবাসীর আতঙ্ক কাটে না। বহু পরিবার প্রানের ভয়ে জিঞ্জিরাতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ সময় অনেক পরিবারে ব্যাপক লুটপাট চলে। এবং লুটের মালামাল প্রকাশ্যে বিক্রিও করতে দেখা যায়।

রাবেয়া খাতুনের ‘একাত্তরের নয়মাস’ গ্রন্থে ১৫ পৃষ্ঠায় আছে “ঠাটারী বাজারসহ পুরনো ঢাকার কিছু মহল্লা হায়েনাদের আক্রোশে ছিন্ন ভিন্ন”। এখানে আমার শ্রদ্ধাভাজন রাবেয়া খাতুন কোন কোন মহল্লা বুঝিয়েছেন জানি না। তবে আমার জানা মতে মুক্তিযুদ্ধের গোটা সময়টাতে পুরনো ঢাকার কায়েৎটুলী লেন, আগামসিহ লেন, (বঙ্গ বন্ধুর অন্যতম খুনী, বিশ^াসঘাতক খন্দকার মোসতাক আহমেদের পৈত্রিক বাড়ি), মেথরপট্রি লেন, আগাসাদেক রোড (মরহুম হাজী আব্দুল মাজেদ সরদারের বাড়ি যিনি তৎকালীন মুসলিম লীগের অন্যতম সংগঠক ছিলেন পরবর্তিতে বি.এন.পিতে যোগ দেন এবং সম্পর্কে সাবেক মেয়র মরহুম মোঃ হানিফের শ^শুর ) সিক্কাটুলী লেন, কাজী আলাউদ্দিন রোড, হাজী ওসমান গনি রোড, আল্লার বাজার, মিঠাই গনি (মরহুম মেয়র মোঃ হানিফের পৈত্রিক বাড়ি) নাজির বাজার লেন, সিদ্দিক বাজার, সুরিটোলা , নর্থসাউথ রোড, বংশাল রোড,নবাবপুর রোড(বাটারী বাজার সংলগ্ন) কসাইটুলী, আরমানিটোলাসহ আরও কিছু মহল্লার কোন বাড়িতে হায়েনাদের আক্রমন ঘটেনি। সম্ভবত এসব এলাকায় ঘন ঘন মসজিদের অবস্থানই এর অন্যতম কারন। আবার বহির্বিশে^ ঢাকাকে ফোকাস করে এখানে পাক আর্মীদের কোন ধরনের নির্যাতন ঘটছে না প্রমাণ করার জন্যই হয়তো হানাদারের দল এখানে তাদের দমন পীড়ন ঘটায়নি। এছাড়া ভিন্ন কোন কারনও থাকতে পারে।

তবে পরাজয় আসন্ন জেনে পাক আর্মীরা যখন রাজাকারদের প্রত্যক্ষ মদদে বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করে সে সময় ১৪ ই ডিসেম্বর রাত ১ টার দিকে সিক্কাটুলী লেনের একটি বাড়িতে প্রতিবেশী দুই সহোদর আলী ও নুরুল ইসলাম [যারা ভাঙ্গারীর ব্যবসা করত] রাজাকারের সহযোগিতায় পাক আর্মীরা আব্দুল বারেক ও আব্দুল খালেক এই দুইজন পিতা পুত্রকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের পুকুর পাড়ে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরদিন পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় একটি হৃদয় বিদারক দৃশ্য সবার মাঝে ব্যপক আলোড়ন তোলে। দৃশ্যটি ছিল, সেই পিতা পুত্রের বিভৎস লাশের ছবি। লাশের ওপর থেকে কাক মাংশ খুবলে খুবলে খাচ্ছে। এই নির্মম চিত্রটি বহুদিন আমার কচি হৃদয়কে কষ্ট দিয়েছে।

গত বছর এই পরিবারটির কাছে গিয়েছিলাম ঘটনার পেছনের ঘটনা জানতে। জানি না কি অজ্ঞাত কারনে তারা মুখ খুলতে রাজী হননি। এমনকি এই দুই শহীদের কোন ছবিও তারা দিতে পারেননি। অথচ ওই পরিবারের দুটি মেয়ে নাজির বাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে আমার সহপাঠি ছিল।

আমাদের বাড়িটি কাজী আলাউদ্দিন রোডের প্রধান সড়কে। মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে আম্মা নাওয়া খাওয়া ভুলে সারাক্ষণ জানালার ফাঁক দিয়ে পাক আর্মীদের গতিবিধি নজরে রাখতেন। কিছু কিছু বিভৎস ঘটনা এখনও মনে আছে যা আমি আমার ‘ মিঠুনের মুক্তিযুদ্ধ’ গল্পে উল্লেখ করেছি। “ টহল দেয়ার সময় একজন মিলিটারী মনু মিঞার হোটেলের ঝাঁপে গুঁতো দিল। অমনি ঝাপটা ঝপাৎ করে মাটিতে পড়ে গেল। কয়েকজন খদ্দের ভেতরে বসে ভাত খাচ্ছিল দেখে, মিলিটারীরা তেলে বেগুনে জ¦লে উঠল। হুঙ্কার দিয়ে হোটেলের সবাইকে ধরে এনে রাস্তায় লাইন করে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর বন্দুকের বাট দিয়ে সবার মাথায় আঘাত করতে লাগল। একজনের মাথা ফেঁটে মগজ বেরিয়ে এল, আরেক জনের পেটে বেয়নেট দিয়ে খোঁচা দেয়াতে পেট ফুটো হয়ে ভূড়ি বের হয়ে ঝুলে পড়ল। বাকীরা সবাই রক্তাক্ত। আর খাবারের হাড়িগুলো রাস্তায় উপুড় করে ঢেলে দিল। তারপর ওরা সদর্পে ট্রাকে উঠে চলে গেলে ঝাঁকে ঝাঁকে কাক এসে খাবারের ওপর ভিড় জমাতে শুরু করল।” আরেকটি বর্ণনা ‘পাশের বাড়ির এক যুবক ছেলেকে মিলিটারীরা ধরে এনে রাস্তায় শুইয়ে দেয়। তারপর বুট দিয়ে ওর শরীর থেতলে দিয়ে টেনে হিঁচড়ে ট্রাকে তোলে। এ রকম অসংখ্য ঘটনা আম্মা দেখতেন, যা উনি আমাদের কাছে পরবর্তীতে বলেছেন।’

জুলফিকার আলি মানিকের ‘মুক্তিযুদ্ধের শেষ রনাঙ্গণ পড়ছিলাম । পড়তে পড়তে স্মৃতি হাতরে অজানা একটি গল্প মনে পড়ল, আমি তখন সিক্কাটুলী লেনের নাজির বাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। প্রায়ই স্কুলের মেয়েদের কাছে শোনা যেত, স্কুলের পেছনের অংশে অনেক মানুষ মেরে পুতে রাখা হয়েছিল। সেখানে মরা মানুষের কঙ্কাল আছে। কিছু দুষ্ট মেয়ে এই নিয়ে, মজা করত, ভয় দেখাত। ভয়ে অনেকে বাথরুমে যেতনা। আজ এত বছর পর মনে হচ্ছে হতেওতো পারে, গল্পটি নিছক কোন গল্প নয়। সেখানেও কোন ভয়ঙ্কর সত্য লুকিয়ে আছে যা আজও আমাদের অজানা।
আরেকটি জায়গার কথা মনে পড়ছে । গুলিস্থান রোড সংলগ্ন নর্থ সাউথ রোড। একাত্তরে সেটা বালুর মাঠ নামে পরিচিত ছিল। ব্লকড একটি জায়গা। এই জায়গাটি নিয়েও আমার আশঙ্কা আছে। আমার কেন জানি মনে হয় এই বালুর মাঠের নিভৃতেও কোন অজানা কাহিনী লুকিয়ে থাকতে পরে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই বালুর মাঠ ছিল কিছু লুটেরার অবাধ ও নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল।

 

Shamoli Khan

এবার নিজের পরিবারের কিছু কথা বলি। আমার মেঝ ভাই ডাঃ বাবুন অকালে মারা যান। তার কাছেও অনেক ঘটনা জানা যেত। তাঁর প্রচুর বই পড়ার অভ্যেস ছিল। সে মাকেও এসব সরবরাহ করত। মায়েরও পড়ার অভ্যেস ছিল। অস্পষ্ট একটি ঘটনা মনে পড়েছে, একদিন বেশকিছু বইপত্র তাদেরকে মাটি চাপা দিতে দেখেছিলাম। ঘটনাটি একাত্তরের কোন সময়কার সেটি আর এখন মনে করতে পারছি না। সেঝভাই বেঁচে থাকলে জানা যেত অনেককিছুই। তার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু গ্রীন রোডে ওরো ডেন্টাল ক্লিনিকের ডাঃ আব্দুল আজিজ বেঁচে আছেন এখনও। আব্দুল আজিজ ছিলেন নাজির বাজার লেনের এবমাত্র মুক্তিযোদ্ধা, যিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আর মিঠাইগলি থেকে মরহুম মেয়র মোঃ হানিফ একটি সংগঠিত বাহিনী নিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে এখনও যারা বেঁচে আছেন তাদের ভেতর লুকিয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মূল্যবান অনেক অজানা তথ্য। যে ঘটনাগুলো আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জানা একান্ত জরুরী।

এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কর্তা ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি যে, সময় কিন্তু বহুদূর গড়িয়ে গেছে। যে সমস্ত প্রবীন ব্যাক্তিরা এখনও বেঁচে আছেন এবং যারা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নানান ঘটনার সাক্ষি হয়ে আছেন আপনারা সরাসরি তাদের কাছে গিয়ে তাদেরকে অভয় দিয়ে বলতে সহায়তা করুন মূল্যবান অভিজ্ঞতার কথা । যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ,আরও পরিপূর্ণ করতে পারে।

সবশেষে মোঃ আসাদকে সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে, তার লেখা ‘একজন নাদেরের খোঁজে’ পড়ে আমি আমার সুপ্ত স্মৃতিকথা লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রাজীবের সুরে অনিতা-সুমন

রাজীবের সুরে অনিতা-সুমনের ‘বন্ধু হতে চাই’

স্টাফ রিপোর্টার :: রাজীব হোসাইনের সুর ও সঙ্গীতে নতুন একটি দ্বৈত গানে ...