শিবগঞ্জের মসজিদে গুলির ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতংকঃ আটক ২

আতংকতানসেন আলম, বগুড়া প্রতিনিধিঃ : বগুড়ার শিবগঞ্জের হরিপুওে শিয়া সমপ্রদায়ের মসজিদে গুলির ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদেও জন্য দুই জনকে আটক করেছে পুলিশ। এরা হলো, শিবগঞ্জের মাঝি হট্ট ইউনিয়নের সৈয়দ দামগড়া গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে আনোয়ার হোসেন ও আটমূল ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান’র ছেলে জুয়েল।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৮টি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে। অন্য দিকে, নিহত মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়ীতে কান্না রোল পড়েছে। বার বার তার স্ত্রী কমেলা বেগম আলৱার কাছে হাত তুলে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে অপরাদীদের বিচার দাবি করছেন। সমবেদনা জানাতে মোয়াজ্মে হোসেনের বাড়ীতে শত শত মানুষ সকাল থেকেই ভীড় জমিয়েছে।

আতংকে রয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জের হরিপুরের শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। শোকের ছায়া নেমেছে শিয়া-সুন্নিসহ সব মহলেই। হঠাৎ কেনই বা গুলির ঘটনা ঘটলো। কি কারণে গুলি করে নামাজপড়া মানুষকে হত্যা করা হলো তা ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছেনা এলাকার লোকজন। গুলির ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতেই শিবগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মসজিদের পশ্চিম দিকে ফাঁকা মাঠ । সেখানে কোন জনবসতি নেই। একটু অদূরেই পরিত্যক্ত একটি ইটভাটা। মাত্র অল্প দূরে উত্তর পাশে বগুড়া – জয়পুরহাট সড়ক। মসজিদের দক্ষিণ পাশ দিয়ে একটি পাকা রাস্তা বেয়ে গেছে। মসজিদের দু’ পাশেই শিয়া -সুন্নি মতাদর্শের লোকের বসবাস।

শুক্রবার ভোর থেকেই এলাকার লোকজন ঘটনাস’ল আল – ই-মোস্তফা মসজিদে ভীড় জমিয়েছে। মসজিদের ভীতরে রক্তের ছোপ ছোপ চি‎হ্ন দেখা যায়। মসজিদের পিলারে গুলির দাগ এখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চারিদিকে পুলিশ – র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন অবস্থান করছে। আশ-পাশের লোকজনের ভাষা যেন থেমে গেছে। সবাই ঘটনার কারণে হতবাক হয়ে পড়েছে।

গুলিতে আহত আফতাব হোসেন বলেন, প্রায় পনের ষোল জন নামাজ আদায় করছিলাম। নামাজ আদায় শেষে দোয়া পড়ছিলাম, এসময় হঠাৎ করে পর পর গুলির শব্দে দিশা হারা হয়ে মসজিদের মধ্যে এদিক ওদিক ছুটা্‌ছুটি করতে থাকি। গুলিতে কয়েক জন মসজিদের মধ্যে লুটিয়ে পড়লে অনেকেই মসজিদের বিভিন্ন স্থানে ভয়ে ও আতংকে উপর হয়ে শুয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী মুসল্লি পাশের চলিৱশছত্র গ্রামের আব্দুল মজিদ বলেন, মসজিদের দরজা দিয়ে দূর্বৃত্তরা প্রবেশ করে পিছন থেকে গুলি চালায়। পর পর গুলি করে তারা মসজিদের নির্মাণাধীন প্রাচির টপকে মাঠের মধ্যে দিয়ে পশ্চিম দিকে দিয়ে পালিয়ে যায়। দৌড়ে বের হয়ে এসে বুঝতে পারি দুর্বৃত্তরা মসজিদের ভীতরে এসে মসজিদের মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়।

হরিপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ আবু জাফর বলেন, ’৮২ সালে ঢাকায় ইরানি দুতাবাসে গিয়ে তাদের কিছু বই নেই। আমি কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলাম। ওই সব বই নিয়ে পড়ে রুশ ফরাসি বিপ্লবের সাথে ইরানের বিপ্লব মিলানোর চেস্টা করি। আমিই প্রথম এলাকায় শিয়া মতাদর্শের উদ্বুদ্ধ হই। পরে এলাকায় ইসলামীয়া ষ্টাডি সার্কেল নামে একটি টাঠাগার গঠন করি। সেখানে নারী পুর্বষদের মধ্যে বই বিতরণ এবং আলোচনা শুরু করি। আস্তে আস্তে লোকজন শিয়া মতাদর্শের দিকে আসতে শুরু করে।মসজিদের মুয়াজ্জিনকে প্রতিমাসে যে এক হাজার টাকা দেয়া হতো সে টাকা প্রদান করতেন ইরানে বসবাসকারী আমার পীর সাহেব আয়াতুল্লাহ শাহ রফি। এছাড়াও আমরা নিজেরা কিছু টাকা দিতাম।

তিনি আরও বলেন, মাঝে মাঝে এলাকার বিভিন্ন ইসলামী জলসা থেকে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে উসকে দেয়ার জন্য বলা হতো- শিয়ারা কাফের। গুলির ঘটনা ওই সব উসকে দেয়ার কারণ থেকে হতে পারে। তিনি আরও বলেন, প্রায় বছর খানেক আগে শিবগঞ্জ উপজেলার আলীয়ারহাট এলাকায় এক জলসা থেকে এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন প্রধান বক্তা। গুলির ঘটনায় আমরা হতভম্ব হয়ে পড়েছি। আমরা কাউকে আঘাত করি না। কেন এমনটি হলো? আতংকে রয়েছি।

ওই এলাকার সুন্নি মতাদর্শের হায়দার আলীসহ অনেকেই জানান, এলাকায় কখনও শিয়া- সুন্নি দ্বন্দ, বিবাদ ছিল না। ওই মসজিদে শিয়া-সুন্নি দুই মতাদর্শের মানুষই নামাজ পড়তো। আমাদের মধ্যে খুবই সম্পর্ক ভাল।

মসজিদ থেকে অল্প একটু দূরেই সাবিনা বেগমের বাড়ী। তিনি জানান, আছরের নামাজ পর মসজিদ থেকে একটু দূরে পরিত্যক্ত ইটভাটার পাশেই সবজি তুলতে যাই। সেখানে দেখতে পাই একটি মটর সাইকেলে করে ৩ জন যুবক আসে। প্রত্যেকে প্যান সাট পড়া। তারা মটর সাইকেল রেখে ইটভাটায় ঘোরা ফেরা করতে থাকে। এক জনের পিছনে ব্যাগ ছিল।

ওই তিন জন মসজিদের দিকে আসে সন্ধ্যায়। বাড়ী কাছা কাছি থাকায় মাঠে সবজি তুলছিলাম। সন্ধ্যার পর ওই তিন জন যুবক মসজিদের দিক থেকে মাঠের মধ্যে দিয়ে যখন যাচ্ছিল, তখন দুই মুখোশ পড়া ছিল। তারা ইটভাটার দিকে চলে যায়। একটু দূরে থাকায় গুলির শব্দ শুনতে পাইনি।

শিবগঞ্জ থানার ওসি আহসান হাবিব বলেন, আজ শুক্রবার ভোরে আনোয়ার হোসেন ও জুয়েল নামে দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। ঘটনার রাতেই মসজিদের কোষাধ্যক্ষ সোনা মিয়া বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছে। ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে আটটি গুলিল খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন মোতায়েন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাজ পর মসজিদের ভীতরে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের গুলিতে মসজিদের ইমাম শাহীনুর রহমান, মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন, মুসলিৱ আবু তাহের ও আফতাব উদ্দিন আহত হন। আহতদের দ্র্বত উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে মসজিদের মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন মারা যায়।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানা

শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার

স্টাফ রিপোর্টার :: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবপুর উপজেলার শিবনগর গ্রামে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে একটি ...