শামসুদ্দিন হীরা-এর বিশেষ ছোটগল্প ‘মৌরশী’

Shamsuddin Hira

শামসুদ্দিন হীরা :: শ্রাবণের শেষ সময়ের কোন এক বিকেলে প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টিতে আকাশ যেন ধুয়ে নেমে আসতে চায় পৃথিবীর কোলে।নিশ্ছিদ্র অন্ধকার বিদীর্ণ করে বিদ্যুতের ফলা মূর্হু মূর্হু আঘাত করছে এখানে সেখানে। খুব কাছেই একটা তালগাছে বাজ পড়লো সব কিছু আলোকিত করে ; বোধ হয় মরন খুব কাছে এসে দেখা দিলো। কি তুমুল আলোড়ন তুলে যায় অজানা আগন্তুক। জেগে থাকা নয় পুনর্জন্ম দিয়ে গেল সে,এ অনুভব শরীরময়। ভয়ের এই এক অন্যরকম শিহরন এমনি কোন একসময় নির্ভুল স্বরলিপি গেয়ে যাবে মাতাল অন্ধকারের পারাপারহীন পথে।
অনু এসব কি ভাবছে, বৃষ্টি থামলেই তো তাকে যেতে হবে অন্য এক যুদ্ধে এ যুদ্ধ প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয় নিয়তির বিরুদ্ধে।

বৃষ্টিটা বোধ হয় থেমেই গেলো, এখনো বাতাস, ভিজে যাওয়ার মতো বৃষ্টি ; তবুও নৌকো ঘাটে পৌঁছতেই হবে। জাজিরা কুঞ্জনগর যাওয়ার একমাত্র পথ, রাত সাতটা/সাড়ে সাতটার পরে আর নৌকা পাওয়া যায় না। এই হাটে পরিচিত কেউ নেই অনু’র। ঐ গাঁয়ের গল্প এই হাটের গল্প বাবার কাছে অনেক শুনেছে। শেষ যখন জাজিরায় আসা তখন অনু করি ক্লাস নাইনে পড়ে।

নৌকায় গোটাকয়েক মানুষ। গলুইয়ের মাথায় গিয়ে কাঠের উপর বসে পড়লো অনু। গভীর আগ্রহে নৌকা থেকে সামনে তীরের দিকে তাকাচ্ছে অনু। এখনো মাথাভর্তি কোকড়াচুল, মুখে দাড়ি,শ্যামলা গড়ন। ওকে দেখে বয়স বুঝা যায় না, তবে অনুমান করা যায় যৌবন শেষের পথে। পরনে খাদি সট পাঞ্জাবী জিন্সের প্যান্ট।

একসময় খুব ফ্যাশন করতো, সে তাল অনেকটাই ধরে রেখেছে। সাথে আছে লাল টকটকে একটা ব্যাকপ্যাক, এধরনের ব্যাগ সাধারনতঃবিশ্ববিদ্যালয়ের তরুন’রা ব্যবহার করে।

হালকা বৃষ্টির কণা এখনো বাতাসে, বেশ লাগছে, অদ্ভুদ এক আলো অন্ধকারের খেলা। মাঝে মাঝে আকাশে বিদ্যুৎ রেখা, নদীর পানিতে প্রতিবিম্ব হয়ে খানিকটা আলো বাড়িয়ে দেয়। নৌকা থেকে চোখ গেলে পাশেই তীর ঘেষা প্রকান্ড অশ্বত্থ গাছটার দিকে।

কিছুক্ষণ আগে যে বৃষ্টি হয়েছে। তা পাতাতে এখনো জড়িয়ে আছে, তার মধ্য দিয়ে বাতাসের জড়তা ভাঙছে সুপ্তোত্থিত পাখিদের ঝাপটানো ডানায়। নৌকাটা গাছসমেত ভিটাটা পার হয়ে যাচ্ছে, তবুও অনু ঘুরে তাকাচ্ছে। অস্পষ্ট মনে পড়ছে, একটা গৃহস্থ একতলা বাড়ী ছিল, গাছের ফাঁকে অন্ধকারে তার হালকা রেখা দেখা যাচ্ছে, বোধ হয় কেউ আর এখানে বসবাস করে না।

ভরা শ্রাবনে নদী পূর্ণযৌবনে। পানিতে স্রোত বেশ।উত্তরের বন্যার পানি দক্ষিনে নেমে আসছে।

এখন আর বৃষ্টি নেই, বাতাসও কমেছে খানিকটা। তীরের দু’ধারেই জনশূন্য ফসলি জমি। এ অঞ্চলে আগে পাট চাষ হতো বেশ, এখন আমন ধানের ক্ষেত। আমন ধানের মজার একটি বিষয় আছে, পানি বাড়লে পাল্লা দিয়ে গাছও বাড়ে। তাই হয়তো আমনকেই কৃষকরা বেছে নিয়েছে।

মাথার উপর দিগন্তবিস্তৃত আকাশ, মেঘের কারনে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না ; তবে বেশ আলো আছে। নৌকায় যে কয়জন যাত্রি আছে তারা নিজেদের সাংসারিক আলাপে ব্যাস্ত। সবাই স্থানীয়, আশেপাশে গ্রামের মানুষ। সবচেয়ে বয়স্ক যে মানুষটি তিনি শুনছেন, কোন উত্তর করছেন না। এবার বয়স্ক লোকটি অনুর দিকে ফিরে প্রশ্ন করলো, “তোমারে তো চিনতে পারলাম না! কাগো বাইত্তে যাইবা?”

অনু মুহুর্তে কেমন যেন আনমনা হয়ে তাকায় বয়স্ক মানুষটার দিকে, অনেকটা ঘোরের মধ্য জবাব দেয়, জাজিরাকুঞ্জনগর ঘাটে নামবো।
“তা কোন বাড়ীতে যাইবা? এবার অনু জবাব দেয়, এ গ্রামেই খাঁ বাড়ী। “তয় তোমার বাবার নাম কি?” আমার বাবাকে হয়তো চিনবেন না!

জমির খান। “আচ্ছা তুমি কি জহির খা’র নাতি?”Shamsuddin Hira 2

হু। অনু খুব বিব্রত। অনু এবার নৌকার বাকী লোকদের আলোচনার বিষয়ে চলে এলো। খাঁ বাড়ীর ইতিহাস ঐতিহ্যের বর্ননা। অনু’র দাদা একসময় এই অঞ্চলের প্রধান ছিলেন। জহির খাঁ জীবত থাকা কালীনই জমির খাঁ যুবক বয়সে যাত্রাদলে যোগ দিয়ে দেশান্তরী হয়। এর পর নিজ ইচ্ছেয় বিয়ে, নিজের মতো চলার কারনে বাপ-বেটার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মাঝে মধ্যে আসতোও কিন্তু বাড়ীতে উঠতো না। ছোট ভাই সমির আর মা’কে দেখা দিয়েই চলে যেতো।
অনু যে কয়বারই দাদা বাড়ী এসেছিল, মা’য়ের হাত ধরে। জহির খা, ছেলেকে গ্রহন না করলেও জমিরের স্ত্রী রোমেলাকে বেশ পসন্দ করতো।
বোধ করি, অনু’কে চাইতো ও তার দাদা’র কাছে থাকুক।
জাজিরাকুঞ্জ ঘাট আর বেশী দুরে নয়, ক্রমেই দু’তীরে গাছ-গাছালী গৃহস্থবাড়ী ঘন হচ্ছে।
বড় নদী থেকে শাখা আরেকটি নদী বের হয়েছে,

স্থানীয় লোকে হয়তো খাল বলে, ভরা বর্ষায় এই খাল এখন সম্পূূর্ণ নদী। মাঝি নৌকা থামায় একটা খাড়ির মতো টিবিতে, ওখানে দু’জন নেমে গেলো। মাঝিকে জিগ্যাস করলাম এ ঘাটের নাম কি? এবার বয়স্ক লোকটি বল্লো “এটা ঢালী’গো ভিটা, ঐ যে দেখছো বাড়ীগুলান ওটা ঢালীকান্দি।” নৌকা আবার চলতে লাগলো।

পাশেই একটা মাছধরার নৌকা ক্রস করছিলো,
জেলে নৌকা থেকে ডেকে উঠলো ‘ব্যাপারির পো মাছ নিবেননি?’ বয়স্ক লোকটি জবাব দিলো, “এই রাইতে মাছ নিলে তোমার চাচি ঘরে জায়গা দিবো না ব্যাটা।” অনু কি যেন ভাবছিল, নৌকা ঘাটে এসে ভীড়লো একটা ঝাকুনি দিয়ে।
জাজিরা কুঞ্জনগরে খেয়াঘাটের পাশেই বালির স্তুপ। নদীর পার কেটে ছোট ছোট খাড়ি করে বালু তোলার চিহৃ। প্রকৃতিকে একহাত দেখিয়ে নদী দূষন করে চলেছে ক্ষমতাধর লোকেরা।

সাঁড়াশি প্রবাহে নদী হচ্ছে খাল ; খাল হচ্ছে নালা। নদীর সুপেয় পনি আজলা ভরে কতো বছর খাওয়া হয়নি অনু’র। নদীর কাছে এলেই মাঝ বয়সি মানুষ কতোটা শিশু হয়ে উঠে।

নৌকা থেকে নেমে অনু কতো কি ভাবছে, কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে ; কেনইবা এখানে আসা। এখন আকাশ পরিস্কার কিছুটা আলো নারকেল গাছের পাতার ফাঁকে বিকিরন ছড়াচ্ছিলো নদীর পানিতে। আজলা ভরে পানি খেয়ে গাঁয়ের পথ ধরলো অনু।ছেলেবেলার মায়ের সাথে শেষ কবে এসেছিলো অনু তা অস্পষ্ট মনে আছে, এই গাঁয়ের কুঁড়েঘরগুলো এখন অনেকটা মারাত্বক বাড়ী হয়ে গেছে। জানালা দরজায় আধুনিকতার কর্কশ ছাপ।

এ’বাড়ী ও বাড়ী পেরেতেই খাঁ বাড়ী। আদি প্রাকৃতিক জঙ্গলে ঘেরা শতাব্দির নীরবতা স্তব্ধ করে থামিয়ে দিলো অনু কে। গাছের ফাঁকে রাত্রির হালকা আলো অদ্ভত খেলা করছে। অনু ভাবে জন্মের প্রবাহিত রক্তের প্রেম আর পরিনামের কথা। নিয়তি ঠিক থাকলে এই বাড়ী এই গাঁ তাকে কতটা গভীর ভাবে অভ্যর্থনা করতো। দুর আকাশের দিকে প্রশ্ন জাগে এ দায় কার? এখন অনু র থাকার জায়গাও নেই কেউ ডাকবে না, দাদু ভাত বেড়েছি খেতে আয়। না একটি রাত এভাবে পরিত্যক্ত ভিটায় নষ্ট করা ঠিক হবে না। প্রাচীন স্নেহ ফিরে আসে না ; যা আছে করুনা অনুগ্রহ।

বিস্ময়ে ডুবন্ত দুই চোখে অনু দেখলো পুরনো ভিটা। হৃদয়ে রুক্ষ পাথরে বুক, নিষ্করুণ কারুকার্যে অহল্যার মত আজ এখানে নিশ্চুপ, ক্ষয়ে যাওয়া চৌকাঠ দরজা জানালা। দূরমগ্ন দুই চোখ ধীরে ধীরে আশ্চর্য করতলে চিন্তামগ্ন ললাটের মতো অসহায় রাত্রি। বুকে প্রস্তরের দাহ। বাপের ভুলের খেশারত সন্তানকে গুনতে হয় কড়ায়গণ্ডায়। নাহ্ এসব ভেবে আর কি হবে এখন। এ গাঁয়ে আসা তো দু’দন্ড জিরানো নয়!

আগে দাদা দাদির কবর জিয়ারত তার পর যে কারো বাড়ীতে আশ্রয় নেয়া। একদিন এখানে সব ছিল, আজ আর কিছুই নেই, এই উঠুনে হ্যাজেক বাতি জ্বলতো আজ ঘুটঘুটে অন্ধকার।
নিজের পরিচয়টি ও পুরনো বইয়ের মতো ধুলো ময়লায় আচ্ছাদিত।

অনু’র বাবা জমির খার বেশ ভালো কিছু শুভাকাঙ্খি ছিল, তাদের বেশীর ভাগই শহরে স্থায়ী ভাবে বসবাস। এই গাঁয়ে এক চাচা ছাড়া দুরসম্পর্কের অনেকেই আছে। অনু হিসেব করে আসে নি কার কাছে উঠবে। মন কিছুতেই সায় দেয় না চাচা সমির খা’র বাড়ীতে যাওয়ার।
দাদার পুরনো বাড়ী ছেড়ে রাস্তার পাশেই বিশাল বাড়ী বানিয়েছে সমির খা।

বাবা মারা যাওয়ার পর ওদের আর্থিক অবস্থা বেশ নাজুক ছিল। অনু’র মা বেশ কয়েকবার এসেছিল সমিরের কাছে। কিছু টাকা পয়সার জন্য। এই বিশাল সম্পদের অংশ তো তাদেরও প্রাপ্ততা। অনু’র দাদা তো তার বাবাকে ত্যাজ্যপুত্র করেন নাই। শুধু সম্পর্কের একটি দেয়াল ছিল মাত্র। আজ অনু’র মা বেঁচে নেই। চাচা’র প্রতি প্রচন্ড একটা ক্ষোভ গেঁথেই আছে, কিছুতেই সরাতে পারছে না।

অনু’র বাবা বরাবরই সংসার বিবাগী লোক ছিলেন। কিন্তু ছোট ভাই সমিরের প্রতি তার দায়িত্ববোধ বেশ প্রখর ছিল। অনু’র বাবার চাচাতো বোন সাহনাজ। পাশের গ্রামেই বিয়ে হয়েছে। অনু’র মায়ের সাথে বেশ কয়েকবার সানু’ফুফুদের বাড়ী গিয়েছে। অনু’কে অনেক আদর করতো। সানু’ফুফুর খবর নেয়া হয় না অনেক বছর। যাক আজ তা হলে সেখানেই যাওয়া যাক। অনু কতো কি ভাবছে! মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা সংকোচ।
মনে অংকিত অপভ্রংশ পেরিয়ে নিদারুণ আনন্দ
পাওয়া যায় না। নির্বাচিত সম্পর্কটাও এমনোই।

অধীকার সম্পর্ক যুক্ত। বাবা’র সাথে যে সম্পর্ক প্রজন্মভেদে তার গুরুত্ব কমে যায়। অনু’র দাদা বাড়ী থেকে মাইল খানিক দুরত্ব সৈয়দপুর গ্রাম।
রাত প্রায় ১০টা, সানুফুফুদের বাড়ী যেতে অনুর আরো আধ ঘন্টার মতো লাগবে।

নদীর পাড় ধরেই হাটঁছে অনু। দেয়ালঘেরা বাড়ীর প্রহরাআলোতে নদীর পানিতে অন্যরকম একটা আবহ সৃষ্টি হয়েছে। বাড়ীটার গেট বরাবর যেতেই চোখে পড়লো, খা ভিলা। এটাই চাচা সমির খার বাড়ী। কেউ কেউ ডিলারের বাড়ী বলেও চিনে। এই ধুলোমাখা পথে বিস্তীর্ণ শূন্যতা।

নিয়মবাঁধা প্রাকৃতিক শৃঙ্খলে কোথায় যেন বাঁধা, অনুর মন চঞ্চল হয়ে উঠলো। দ্রুত পার হতে হবে তাকে। মৌরশির টান এড়ানো বড় কঠিন।জাতিস্মর প্রত্যাশায় যাযাবর বেশে এই গ্রামীন মেঠোপথ ধরে গিরগিটির মতো বদলে যাওয়া মানুষের খুঁজে তারপর না হয় কেবল হাঁটতেই থাকে, গন্তব্যহীন হাঁটা। একসময় খা বাড়ীর প্রহরাআলো ক্ষীণ থেকে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রহিমা আক্তার মৌ

‘জল ও জীবন’

রহিমা আক্তার মৌ :: আমাদের প্রাণপ্রিয় নগরী ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। অপ্রিয় ...