শরীয়তপুরে প্রেমের কারণে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

Shariatpur Nirjaton picসৈকত দত্ত, শরীয়তপুর: শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুন্ডেচর ইউনিয়নে প্রেমের কারণে মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে এক তরম্নণ ও কিশোরীকে। প্রকাশ্যে দুই জনকে একই সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে বিদ্যালয় মাঠে জুতাপেটা এবং জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছে কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন মল্লিক ও তার ভাতিজা ইউপি সদস্য কালাম মল্লিক তার ভাগিনা ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটে ৭ ফেব্রুয়ারী (রবিবার) আবদুল মান্নান মল্লিককান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে। এ ঘটনায় দোষিদের দৃষ্টান্ত মূলক শা্তির দাবীতে এলাকাবাসী সোমবার (২২ ফেব্রুয়ারী) মিছিল ও মানববন্ধন করেছে।

দুই সপ্তাহের আগে সংঘটিত এই ঘটনাটি শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেইজ বুকে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্যাতনের শিকার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সোনামিয়া ছৈয়াল এর মেয়ে আইরিন আক্তার (১৫) আবদুল মান্নান মলিস্নককান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। তার সাথে পাশের বাড়ির আসমত খাঁ’র ছেলে স্বপন খাঁ’র (১৮) সাথে দীর্ঘ দিনের প্রেমের সর্ম্পক গড়ে উঠে। এক পর্যায়ে তারা প্রেমের টানে বাড়ি থেকে পালিয়ে যওয়ার সিদ্ধানত্ম নেয়। ৬ ফেব্রুয়ারী (শনিবার) তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। ওই দিনই বিকাল ৫টার দিকে মুন্সীগঞ্জ জেলার হাসাইল যাওয়ার পথে ট্টলার থেকে কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন মল্লিকের নেতৃত্বে তার ভাতিজা ইউপি সদস্য কালাম মলিস্নক, ভাগিনা ও সহযোগীদের সাথে নিয়ে তাদের আটক করে। আটক করার পর থেকে ইউপি সদস্য কালাম মলিস্নক তার ভাগিনা ও সহযোগীরা রাত ১১টা পর্যন্ত তাদের উপর মধ্যযুগীও কায়দায় অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন মলিস্নকের বাড়িতে। সেখানেও খাটের সাথে বেঁধে চলে রাতভর অমানুষিক নির্যাতন। পরদিন সকালে (৭ ফেব্রুয়ারী) এলাকার আবদুল মান্নান মল্লিককান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে প্রকাশ্যে দুই জনকে একই দড়ির সাথে বেঁধে বিদ্যালয় মাঠে মধ্যযুগীও কায়দায় অমানুষিক নির্যাতন করে ইউপি সদস্য কালাম মল্লিক, ভাগিনা ও তার সহযোগীরা। পরে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী উপস্থিত এলাকাবাসীর সামনে জুতাপেটা এবং জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর হয় পুরো মাঠ।

আক্তার মল্লিক, আলমগীর মুন্সীসহ এলাকাবাসীরা বলছে, তারা যদি অপরাধও করে থাকে তাদেরকে ধরে পুলিশে না দিয়ে নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা অনেকেই বলছে ডিজিটাল যুগে এসে মধ্যযুগীও কায়দায় একটি মেয়ের গায়ে প্রকাশ্যে এরকম অমানুষিক নিযার্তন করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হতে পারে সে প্রশ্ন এখন সবার মাঝে। তরুণ-তরুণী উভয় পরিবারই গরিব অসহায়। ইউপি সদস্য সহ যারাই ভালোবাসার অপরাধে দুইজনকে এরকম অমানুষিক নির্যাতন করলো তাদের বিরম্নদ্ধেও অভিযোগ কম ছিল না এলাকাবাসীর।

আবদুল মান্নান মলিস্নককান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী মাহিমা, সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী রম্নপা, মৌসুমী জানায়, ডিজিটাল যুগে একটি মেয়ে ও একটি ছেলে তাদের মত প্রকাশের জন্য প্রেম করতেই পারে। প্রেমের কারণে এই এলাকার প্রভাবশালী সাবেক চেয়ারম্যান ও তার ভাতিজা সহ তাদের সহযোগীরা এরকম মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানুষিক নির্যাতন করতে পারে। তাহলে কি এ দেশে প্রভাবশালীদের জন্য কোন আইন নেই। এই যুগে এসে একটি স্কুল পড়ুয়া ছাত্রীকে প্রকাশ্যে নির্যাতন করবে? আমরা শিক্ষার্থীরা আমাদের সহপাঠিকে যারা এরকম প্রকাশ্যে অমানুষিক করল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিচার চাই।

নির্যাতিতা আবদুল মান্নান মল্লিককান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী আইরিন আক্তার জানায়, আমার সাথে স্বপনের দীর্ঘ দিনের প্রেমের সর্ম্পক ছিল। আমরা একে অপরকে ভালোবাসী। তাই আমাদের ভালোবাসার স্বপ্ন পূরণ করতে আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছিলাম। আমাদের মধ্যে কোন অসামাজিক কার্যকলামও ঘটে নি। কিন্তু কুন্ডেরচর সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন মল্লিকের ভাতিজা ইউপি সদস্য কালাম মল্লিক, ভাগিনা ও সহযোগীরা আমাদের হাসাইল যাওয়ার পথে আমাদের দুই বেঁধে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করে। ওরা অনেক প্রভাবশালী। আর আমরা অনেক গরিব তাই আমাদের উপর এত অত্যাচার। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই অমানুষিক নির্যাতনের বিচার চাই।

নির্যাতিতা মেয়ের বাবা সোনামিয়া ছৈয়াল জানান, আমরা গরীব তাই আমার মেয়র উপর এত বড় নির্যাতন। আমার মেয়ে যদি অপরাধ করেই থাকে তাহলে পুলিশে ধরিয়ে দেন। কেন এই ভাবে সবার সামনে প্রকাশ্যে আমার মেয়েকে মারল আমি আইনের কাছে সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন মলিস্নক, তার ভাতিজা ইউপি সদস্য কালাম মলিস্নক ও ভাগিনা সহযোগীসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিচার চাই।

নির্যাতিতা ছেলের বাবা আসমত খাঁ জানান, ঘটনার দিন (৭ ফেব্রুয়ারী) বিদ্যালয় মাঠে আমার ছেলেকে মারধর করে কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন মলিস্নক নেতৃত্বে তার ভাতিজা ইউপি সদস্য কালাম মলিস্নক ও ভাগিনা ও সহযোগীরা। আমার ছেলে অন্যায় করলে তাকে ধরে পুলিশে দিত। কেন ওরা প্রকাশ্যে আমার ছেলেকে জুতা দিয়ে পিটালো। ওরা এলাকায় প্রভাবশালী আর আমরা গরীব তাই। ঘটনার সময় আমার আব্বা (হানিফ খা)কে চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাইলে বলে এখান থেকে শোরে যা বুইরা। না হইলে তোর নাতি সাথে তোরেও জুতার মালা দিয়ে ঘুরাবো।

কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন মল্লিক বলেন, আমি ঘটনাটি শুনেছি। তবে আমি কাউকে মারধর করতে হুকুম দেইনি। তার বিরুদ্ধে এলাকায় মিছিলের হচ্ছে এ ব্যাপরে সাংবাদিকদের প্রশ্ন উত্তরে তিনি বলেন এলাকায় পক্ষ বিপক্ষ থাকে। এ কারণেই মিছিল হচ্ছে বলে তার মন্তব্য। তার ভাতিজা ইউপি সদস্য কালাম মলিস্নক পলাতক থাকায় তার বক্ত্যব নেওয়া সম্ভব্য হয়নি।

সোমবার সকালে আবদুল মান্নান মল্লিককান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে বিদালয়টি বন্ধ পাওয়া যায়। মোবাইল ফোনে বিদ্যালয়ের কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব্য হয়নি।

এ ব্যাপারে জাজিরা থানার এসআই সঞ্জয় কুমার বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইজবুকের মাধ্যমে একটি ছেলে ও মেয়েকে প্রেমের কারণে অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনাটি দেখি। ঘটনাটি আমার থানা এরিয়ার মধ্যে। আমি উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নির্দেশে সোমবার সকালে আমার ফোর্সসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলে জানান তিনি।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানা

শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার

স্টাফ রিপোর্টার :: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবপুর উপজেলার শিবনগর গ্রামে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে একটি ...