লক্ষ্মীপুরে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন যিনি

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুজ্জামানজহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: চিন্তা-চেতনা এবং কর্মে, সমাজে ব্যক্তিত্বের আদর্শের স্বাক্ষর রাখা মানুষের সংখ্যা দিন-দিনই কমে যাচ্ছে। যার কারণে আমাদের শ্রদ্ধার জায়গাগুলো দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। তবে এর মধ্যেও কেউ কেউ নানাভাবে আলোকিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজন সদ্য বিদায়ী লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুজ্জামান।

সাহসী তরুণ নুরুজ্জামান ছিলেন লক্ষ্মীপুরে অসৎ লোকের আতঙ্ক। তিনি অসৎ লোকদের বিরুদ্ধে মাবাইল কোর্ট পরিচালনা করতেন। যে কারণে অপরাধীরা আতঙ্কে থাকতো। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ছাড়াও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় শিক্ষার মান উন্নয়নে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন।

এ উপজেলাকে শতভাগ শিক্ষার উপযুগী করে গড়ে তোলার জন্য তিনি তার চেষ্টা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার মানন্নোয়ন, শিক্ষার্থীদেরকে নিয়মানুর্বতিতা, স্বাস্থ্য সচতেনতা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবনাচরণ ও মূল্যবোধের বিষয়ে গাইডলাইন তৈরী করে সচেতনতা বৃদ্ধি করেছেন। উপজলোর প্রতিটি প্রইমারী, হাই স্কুল ও মাদ্রাসার শ্রেণীকক্ষে এসব অনুসরনীয় নির্দশেনা টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়েছে।

নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে তার হাতে থাকা বরাদ্দের বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দিয়েছে। বরাদ্দের টাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাঠ ভরাট, সংযোগ সড়ক, গার্ড ওয়াল ও বাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণ, গভীর নলকূপ স্থাপন, ভবন সংস্কার, শ্রেণী কক্ষ নির্মাণ ও বেঞ্চ তৈরীর করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থীদরে জন্য আর্কষণীয় করে গড়ে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন তিনি।

এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরচিালনার জন্য এল ই ডি মনিটর বিতরণ, ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর বিতরণ, ডিজিটাল হাজিরা মেশিন স্থাপন ও কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থীদরে জন্য আর্কষণীয় করে গড়ে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন তিনি।
২০১৫ সালের ৮ আগস্ট লক্ষ্মীপুর জেলায় যোগদান করেন মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। দু-বছর সাত মাস লক্ষ্মীপুরে দায়িত্ব পালন করেন। লক্ষ্মীপুরে দায়িত্ব পালনকালে অসংখ্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন এ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালকে দালাল মুক্তকরণ, হাসপাতালে পরিবেশ উন্নয়োনে ও চিকিৎসার মান উন্নয়োনে কার্যকরী ভূমিকা রাখেন। জেলা শহরের অবস্থিত বিভিন্ন পাইভেট হাসপাতালে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে পাইভেট হাসপাতালে রোগীদের নিম্মমানের চিকিৎসা, অতিরিক্ত টাকা আদায়, পরিষ্কার-পরিচন্নতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে জরিমান প্রদান করেন। জেলার বিভিন্ন ডায়গনষ্টিক সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করে নিন্মমানের ল্যাব, প্রশিক্ষিত কোন জনবল না থাকা, পরিস্কার পরিচ্ছন্নসহ অনুমোদনহীন ডায়গনষ্টি সেন্টর বন্ধ ও জরিমানা করেন।

চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করা ডাক্তার না হয়ে ভূয়া ডাক্তার সেজে সাধারণ মানুষকে হয়রাণী কারসহ বিভিন্ন অভিযোগে ভূয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জেল-জরিমান করেন। জেলা শহরে অবস্থিত ফার্মেসিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ওষুধ অধিদপ্তরের অনুমোদনহীন ওষুধ, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বিক্রি এবং অনুমোদনহীন পট বা ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি বন্ধে ভূমিকা রাখেন।

খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোদে বিসিক শিল্প নগরিসহ বিভন্ন বেখারীর কারখানায় অভিযান পরিচালনা, বিভিন্ন নামি-দামী খাওয়ারের হোটেল ও মিষ্টান্ন ভান্ডারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তা বন্ধসহ জেলা-জরিমানা করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন এবং সেগুলোর পরিবেশ উন্নত ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন। রোজায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল প্রতিরোধের লক্ষ্যে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন।

ঈদে লক্ষ্মীপুর শহরের বিভিন্ন শপিংমলে অতিরিক্ত মূল্যে পোশাক বিক্রির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দোকানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে পোশাকের দাম কমে আসে এবং জনমনে স্বস্তি দেখা দেয়। ঈদে গণ পরিবহনে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করায় তাদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট করে তাদের জরিমানা করেন এবং যাত্রীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অতিরিক্ত ভাড়া প্রেরত দেয়।

এছাড়া সদর উপজেলায় বাল্য বিবাহ রোধ, মাদক নিয়ন্ত্রন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সরকারি জমি ও খাল থেকে অবৈদ দখলদার উচ্ছেদ, অবৈদভাবে ভূ-গর্বস্থ বালি উত্তোলন বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণসহ বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকান্ডে কঠোর ও উদ্যোগী ভুমিকা রেখেছেন।

এরই প্রেক্ষিতে জনগণের মাঝে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন নুরুজ্জামান। কাজের স্বিকৃতি স্বরুপ একবার চট্টগ্রাম বিভাগে ও দুবার জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার পুরুস্কার পান তিনি।

লক্ষ্মীপুরে আসার পর জনবান্ধব এ মানুষটি নিজে থেকেই সাংবাদিকদের সাথে পরিচিত হন। অনেক সময় নিজেই অভিযানের তথ্য পাঠিয়েছেন। দীর্ঘদিন এ মানুষটিকে কাছ থেকে দেখছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই রকম ছিলেন।

সদা নম্র, ভদ্র, বিনয়ী, নরম সুরের দিলখোলা, সৎসজ্জন, অতিথিপরায়ণ এ মানুষটি লক্ষ্মীপুরে কাজের সময় শেষ করে বিদায় নিয়েছেন। লক্ষ্মীপুর থেকে মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের বিদায় অসৎ লোকের কাছে আনন্দের হলেও সচেতনমহলের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

প্রশাসনের একজন বলিষ্ঠ দেশপ্রেমিক এবং আদর্শবান মানুষটি আশা করি তার নতুন কর্মস্থানেও জ্ঞান-গরিমা, মনন-মেধা, প্রজ্ঞা-পান্ডিত্য দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে ভালো কাজের অগ্রপথিক হবেন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

লক্ষ্মীপুরে ৩ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে

লক্ষ্মীপুরে ৩ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: আগামী ১৯ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরে প্রায় ৩ ...