রোকেয়া ইসলাম’র ছোটগল্প ‘যে নদী এপাড় ওপাড়’

Rokeya Islam

যে নদী এপাড় ওপাড়
রোকেয়া ইসলাম

নগরের যাপিত জীবনে অভ্যস্ত অনিন্দিতার নদী পারাপারে অভ্যাস নেই বললেই চলে। তাও আবার গভীর রাতে। থমকে দাঁড়ায়। দল ততক্ষণে নৌকায় আসন খুঁজছে হৈ হৈ করে। কবি বলে কথা। সবকিছুতেই কাব্য খেয়াল খোঁজে। সবকিছুই উপভোগ করে হৃদয় দিয়ে। আঁধারে কেউ একজন হাত বাড়িয়ে দেয়।
নৌকার মাঝখানে চাদর পাতা। আয়োজকরা মনে হয় মাঝিকে আগেই সেভাবে নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিল। সুস্থির হয়ে বসে অনিন্দিতা।
নদীর নাম- “সই অঞ্জনা” মনে মনে সুর তোলে। কেউ একজন নদীর নাম বলে- “হাতানিয়া দোয়ানিয়া”। বেশ ছন্দময় নাম নদীর। নদীর জলে পূর্ণবতী চাঁদ তার পরিপূর্ণ যৌবন নিয়ে ভাসছে। কলস ভাঙ্গা সোনালী আলো ছড়িয়ে পড়ছে নদীর কালো জলময় শরীরে। বাতাস সখীর সাথে শলা করে ইচ্ছেমতো অবাধ সাঁতার দিচ্ছে চাঁদ। চাঁদ আর নদীর জলে তাকিয়ে থেকে এলেমেলো বাতাসে ভাসতে ভাসতে হঠাৎই ওর চোখ দু’টো ছলছল করে ওঠে অচেনা বেদনার চেনা কষ্ট নিয়ে। যন্ত্রণা দাবড়িয়ে উঠে সমস্ত হৃদয় জুড়ে।
-কবি দেখেছেন কেমন অপরূপ জ্যোৎস্না নদীর জলে?
পাশে বসে থাকা কবির কথায় চমকে যায় অনিন্দিতা। বেদনার জৈব সারে তড়তড়িয়ে বেড়ে ওঠা কষ্টটাকে ঠোঁটে শাসিয়ে দিয়ে প্রস্ফুটিত হয় আপন মহিমায় অমলিন হাসিতে।
নৌকার একদম কিনারে চলে আসে অনিন্দিতা। উবু হয়ে হাত দিয়ে ছুঁইয়ে দেয় নদীর শীতল জল। সারাদিনের জল স্পর্শহীন শরীরটা যেন আদ্র হয়ে পড়ে মসৃণ জলের ছোঁয়ায়।
জ্যোৎস্না, জল, নদী আর কবিতা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় শব্দ সূধা খোঁজা কবিদের আলোচনায়। আধুনিক ও উত্তরাধুনিক কবিতার শরীরে জ্যোৎস্নার পেলব মমতা খুঁজছে ওরা। তর্ক থেকে ছিটকে পড়া শব্দ থেকে মুক্তো কুঁড়ায় অনিন্দিতা।
ওর শরীর জুড়ে জ্যোৎস্নার প্রভা। হাতে জলের স্পর্শের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে দেহ মনে। ওরা এসেছে “বকখালি কবিতা উৎসবে”।
কাব্য-টানের সাথে যোগ হয়েছিল মনের সবগুলো জানালা আটকে যাওয়া আবদ্ধ বাতাসের ছটফটানি। নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়ার জন্য কিছুটা সময় চাই অনিন্দিতার।
সেই গোপন গহন হৃদয়পোড়া সময়ে এলো বকখালি কবিতা উৎসবের আমন্ত্রণ পত্র। সাথে সাথেই সম্মতি জানিয়ে দিলেও অফিস থেকে ছুটি ম্যানেজ করতে প্রচন্ড হ্যাপা সামলাতে হয়। তারচেয়েও ঝামেলা পোহাতে হয় সংসার থেকে নিজেকে নিজের ছুটি দিতে। কবিতার অবিনাশী টানে সবকিছুকেই তুচ্ছ করে কাব্যসূধাময় বন্ধুর পথে বুকের সবটুকু ভালবাসা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এখন হাতানিয়া দোয়ানিয়া নদীতে জ্যোৎস্না ধোয়া জলে ভাসছে। মাথার উপর কলঙ্ক নিয়ে হাসছে অতি পুরনো চাঁদ নতুন পরিপূর্ণ আলোতে।
দীর্ঘ হাঙ্গামাপূর্ণ ভ্রমণের পর বেশ গভীর ঘুম হয়। গোসল সেরে বাইরে বেরিয়ে দেখে সকাল এগারটার কাছাকাছি সময়। সঙ্গীরা যার যার মতো ঘুরতে বেরিয়ে। একা পরে আছেও। মন খারাপ করে লবিতে বসে পড়ে।
একা একা বেরিয়ে পড়ে অনিন্দিতা। টো-টো থামিয়ে ভাড়া সংক্রান্ত কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, তার আগেই চোখ পড়ে টো-টোর গায়ে দর্শনীয় স্থান সমূহ ও ভাড়ার তালিকা লেখা আছে।
প্রথমেই বকখালি সমুদ্র সৈকতে। দূর থেকে চোখ পড়ে সমুদ্র আর বালিতে হামলে পড়েছে রোদ, রূপালী আল্পনা আঁকছে জলের সফেদ শরীরে। বালির গায়ের খিল খিল শব্দ ফুটে উঠছে চিক চিক নিরব স্বাক্ষরে।
চায়ের দোকানের ফাঁকা বেঞ্চে বসে পড়ে। মাটির ভাড়ে চায়ে চুমুক দিতে গিয়েই থমকে যায় অনিন্দিতা।
সমুদ্র দর্শন শেষ করে ফিরছে ওর সাথে আসা কবিকুল। “ওকে একা ফেলে কেন তাদের এই সমুদ্র দর্শন”? কঠিন তীরটা কোমলভাবে ছুঁড়তেই টিম লিডার বিখ্যাত কবি স্ব¯েœহে জানায় ওকে বিশ্রামের সুযোগ দিতেই তাদের চলে আসা।
একজন কবি এখন অনিন্দিতাকে সঙ্গ দিতে চায় জানাতেই সহাস্যে এড়িয়ে যায়। দলের সাথে সেও ফিরে যায় হোটেলে।
-দিদি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? কবিতা আবৃত্তি করবেন আজ?
স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলছে এক শক্তপোক্ত বৃদ্ধা। নিজে নিজেই বলছে। এখানকার প্রতিবারের কবিতা উৎসবের কথা। প্রত্যেক কবি তার হাতে তৈরী চায়ের কত প্রশংসা করে সেটা জানাতেও ছাড় দেয় না।
-আপনি কি বাংলাদেশের মানুষ?
অনিন্দিতার প্রশ্নে মুখর হয় বৃদ্ধা।
-ময়মনসিংহে আমার বাবার বাড়ি ছিল গো। বিয়ে হয়েছিল নদিয়া গাঙ্গনাপুর।
-নদীয়া থেকে কাকদ্বীপ?
-ঘুরতে ঘুরতে এসেছি গো। এই কপাল টেনে এনেছে এখানটায়। আমার মেয়ের বরের বাড়ি এখানে।
-দোকান কি মেয়ের জামাইয়ের?
-না গো না-দোকানটা আমারই।
অনিন্দিতার হাতে সময়ের বেশ টানাটানি। তবুও বৃদ্ধা যে আলাপ জমাতে চাইছে সেটা বুঝতে পারে। বৃদ্ধার কণ্ঠ আর শরীর জুড়ে পেলবতা ওকে আঁটকে দেয়। আরেকটা বিষয় খুব আকর্ষণ করে অনিন্দিতাকে, বৃদ্ধার যথেষ্ট আত্মসম্মানবোধ আছে।
শ্বশুরবাড়িতে স্বামীর সাথে অভাব থাকলেও সুখেই দিন কাটছিল মনোরমার। সুখটা ফিকে হয়ে আসে পরপর তিন কন্যা জন্ম দেবার পর। ফিকে সুখটা টেনে টেনেই তিন কন্যাকে পাত্রস্থ করে যোগেন দাস ও মনোরমা দাস। একদিন হুট করে মারা যায় যোগেন দাস। আত্মীয়-স্বজন টিকতে দেয় না মনোরমাকে স্বামীর ভিটায়। যৎসামান্য সম্বল নিয়ে ছোট মেয়ে সুপর্না দাসের বাড়িতেই আশ্রয় হয়। সম্বলটুকু দিয়েই এই চায়ের দোকান করেছে মনোরমা। নিজেই সামলায় দোকান। মাঝে মাঝে পাশের বাড়ির মা মরা এক কিশোর হাত লাগায়। ওকে আবার কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্কুলে পাঠায় মনোরমা।
অনিন্দিতা দোকানটায় চোখ বুলায়। দরমার বেড়ার উপর টিনের চাল বেশ পোক্ত করে দেয়া। ঝাপ আছে একখানা। চারটে বেঞ্চ এমন মাপে যে, একেকটায় চাপাচাপি করে চারজন, আরাম করে তিনজন আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু’জন বসতে পারে। মোটামুটি দশবারোজনের একটা ভীড় থাকে তার দোকানে।
পানির বোতল, বিস্কিটের বয়োম, টুকটাক এটা সেটা পেছনের র‌্যাকে। সামনে কমদামী টেবিলে পলিথিন বিছিয়ে রাখা চায়ের ছোট ছোট কাঁচের কাপ, পাশে ডাই করে রাখা বেশকিছু মাটির ভাড়। ছোট চৌকির পাশে গ্যাস সিলিন্ডার। তার পাশে গ্যাসের চুলো টিন দিয়ে ঘেরা।
কত অল্প পুঁজি খাটিয়ে মনোরমা চমৎকার এক দোকান সাজিয়েছে। এই দোকানের পেছনে রয়েছে আত্মসম্মানবোধ, পরিশ্রম করার অদম্য মনোবল, আত্মনির্ভরশীলতা। বৃদ্ধার জন্য মমত্ব পোষনের সাথে সাথে শ্রদ্ধাও জেগে ওঠে, বীজ থেকে শেকড় বের হবার মতো।
-বাংলাদেশে যেতে আসতে কত খরচা হতে পারে গো দিদি। মনোরমার প্রশ্নে তাজ্জব খেয়ে যায় অনিন্দিতা।
-যেতে চান আপনি?
-পিতৃভূমির ঋণ গো দিদি, শোধ দিতে পারব না। স্বীকার করে আসব মাটি ছুঁয়ে।
-আপনার পাসপোর্ট আছে?
অনিন্দিতার হাতের সময় লাল দাগ অতিক্রম করছে। তবুও বসে থাকে।
-আপনার পাসপোর্ট, ভিসা হলে ট্রেনে গিয়ে বাংলাদেশ বিমান বন্দর ষ্টেশনে পৌঁছাবেন। এটুকুই আপনার খরচ। বাকিটা আমার, ফিরতি ট্রেনে তুলে দেয়া অবধি।
বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে বৃদ্ধা তাকিয়ে থাকে অনিন্দিতার দিকে। অনিন্দিতা এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধার হাত দুখান নিজের হাতের মুঠোয় ধরে রাখে। স্পর্শের ক্ষমতা অপরিসীম। মনোরমার চোখ থেকে অবিশ্বাসের ছায়া উড়ে যায় সমুদ্রের জলছোঁয়া বাতাসে।
-তোমাকে পাব কিভাবে গো?
-আমি ঠিকানা লিখে দেব, ফোন নম্বর দিয়ে যাব।
-তাহলেই হবে গো দিদি, বাংলাদেশ তো আমার শিকড়।
-বিকেলে থাকবে তো?
-আমি আছি গো রাত অবধি।
-ঠিক আছে, তখন ঠিকানা দেব। এবার টো-টো ঠিক করে দাও তো। হেনরীজ আইল্যান্ড যাব।
মনোরমা বীরভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে মুখে পিতৃভূমির ঋণ স্বীকারের অঙ্গিকার দীপ্রভাবে ফুটে ওঠে।
টো-টো পেরিয়ে আসে বেশ খানিকটা পথ। এবার হেঁটেই যেতে হবে অনিন্দিতাকে। পর্যটকদের জন্য তৈরী হচ্ছে আরামদায়ক পথ। মাঝে মাঝে দৃষ্টিনন্দন কালভার্ট। তাতানো রোদ শরীরে বিঁধছে। গা করেনা অনিন্দিতা।
থমকে দাঁড়ায়। ঘর ছাড়ার আহবানে বাঁশি বাজাচ্ছে সমুদ্র। অনিন্দিতার বুকের ভেতর কাঁপন তোলে “একবার ডাকো সমুদ্র বলে”। কবে কখন কেউ একজন একবার ওকে এমন হৃদয় ছেঁড়া আর্তি জানিয়েছিল সেদিন কেন অনিন্দিতা তার সেই আর্তিতে সাড়া দেয় নাই?! সেদিন যদি তার ডাকে সাড়া দিতো তবে কি আজ ওর ভেতর এমন বিষন্ন বেদনার সুর শুনতে পেত? ভাবতে ভাবতে ও’ নিজেই সমুদ্র পানে ছুটছে।
দু’পাশের বৃক্ষ শখা মিলেমিশে গোলাকৃতি সুরঙ্গ পথ তৈরী করেছে প্রকৃতি।
প্রতিদিনই এই পথ দিয়ে সমুদ্রের জল এপারে চলে আসে, ভিজিয়ে দিয়ে যায় তৃণগুল্ম। সারাদিন রৌদ্র পরশেও অমলিন স্মৃতির মত লেগে থাকে জোয়ারের জলে ভিজে থাকার সুখময় সময়টুকু। আর প্রতীক্ষায় থাকে নব জোয়ারের। পুরো বিষয়টুকু ওর কাছে নারী পুরুষের প্রাকৃতিক অনিবার্য মিথুন মন্ত্রের মত মনে হয়। প্রকৃতি আর প্রেমের বিষয়টুকু বুঝি এমনই অলঙ্ঘনীয়।
ধুধু বালি, সফেদ জল আর সূর্যালোকের কি অসীম প্রেম-কাব্য হেনরীজ আইল্যান্ডে। কখনও মনে হচ্ছে তিনজনই প্রেম-দেবতা। পূজারী অনিন্দিতা। ও’ কাকে বেছে নেবে? সমুদ্রতটের বালুকা না গভীর সূর্যালোক?
ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সমুদ্রের কাছে। ভালবেসে ওর পায়ের পাতা ছুঁয়ে যায় সমুদ্রের আঁছড়ে পড়া ঢেউ। ভিজে যায় শাড়ীর পাড়।
তীরের বৃক্ষরাজি ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। গাছগুলো কক্সবাজারের ঝাউ গাছের মত নয়। নাম খুঁজে দু-একজন দর্শনার্থীকে জিজ্ঞেস করেও সঠিক উত্তর পায় না। থাক গুগলে ঢুকে জেনে নেবে। এখন সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে থাকবার সময় অচেনা বৃক্ষে।
বিকেলে নীলাভ সবুজ জামদানীতে নিজেকে সাজিয়ে সমুদ্র পাড়ের কবিতা উৎসবে যোগ দেবার উপযোগী করে। যাবার আগে পরম যতেœ মনোরমা দাসের জন্য লিখে নেয় ঠিকানা ও ফোন নম্বর, ম্যাপটাও এঁকে দেয় সাথে।
দিনের প্রথমভাগে দেখা সমুদ্রের সাথে শেষভাগে দেখা সমুদ্রের মিল অমিল খুঁজতে খুঁজতেই উৎসবে আসা কাব্য প্রেমিকদের সাথে মিশে গিয়েও একা খুঁজতে থাকে সমুদ্রের রূপ, রঙ, সূধা, সৌন্দর্য্য।
বকখালি সমুদ্র অভিজ্ঞজনরা কেন যেন শঙ্কা প্রকাশ করছে আজকের শান্ত সমুদ্রের রূপে।
সঞ্চালক অনুষ্ঠান শুরু করে দেয়। প্রায় সব কবির কবিতা জুড়েই সমুদ্র বন্দনা।
বিশেষভাবে সম্মানিত করা হল বেশ কয়েকজন অতিথি কবিকে।
সন্ধ্যা নেমেছে বেশ আগেই। কাব্যময় সময়ও প্রায় শেষ পর্যায়ে।
সমুদ্র ওর এতো কাছে যান্ত্রিক শব্দ, নিয়ন আলো সইতে পারছেনা আর। অথবা ওর প্রতি এতো ভালবাসা প্রকাশের জবাব দেবার জন্যই প্রস্তুত হয়ে যায়।
প্রচন্ড ধুলি ঝড়ে চারদিক ধুসর হয়ে যায় প্রচন্ড গর্জনের সাথে। বাতাসও তার সর্বশক্তি নিয়ে সমুদ্রের পাশে। ধুলি, গর্জন আর বাতাসের সাথে মৃদু বৃষ্টিও যোগ দেয়।
দৌড় দৌড় দৌড় দিকবিদিক মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে। অনিন্দিতার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় ওর সহযাত্রী কবি।
কোথা দিয়ে কিভাবে দৌড়ে এসে একেবারে ডলফিন হোটেলের লনে দাঁড়িয়ে হাঁফ ছাড়ে। প্রকৃতিকে জয় করেই মানুষের জয়যাত্রা।
বাথরুমে শাওয়ার ছেড়ে ধুয়ে ফেলে বকখালি বালুকাবেলার ধুলি ঝড়ের স্বাক্ষর।
রাতেই সিদ্ধান্ত হয় ওরা সকাল সাতটা আটটা নাগাদ বেরিয়ে পড়বে কলকাতার উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে যার যার গন্তব্যে।
রাতের হাতানিয়া দোয়ানিয়ার রূপও দিনে বদলে গেছে পুরোটাই। সময়ের সাথে সাথে মানুষও তো বদলায় এমনি করে।
নদী আজ খুব ব্যাস্ত। শতশত গাড়ী পার করছে, সাথে মানুষ, মালপত্র। আজ যেন ওর সাথে কথা বলারও সময় নেই। ভুলে গেছে এক তৃষ্ণার্ত নারী ওর বুকে সেদিন রাতে হাত ছুঁইয়ে দিয়েছিল। রোমাঞ্চিত হয়েছিল। ওকে ভালবেসেছিল।
অনিন্দিতা অভিমানী দৃষ্টিতে তাকায় হাতানিয়া দোয়ানিয়ার ব্যস্ত শরীরে।
চমৎকার কৃষ্ণচূড়া ছাওয়া পথ পেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ী।
গাড়ীর ভেতরে ইতিহাস আর কাব্যকথায় মুখর কবিগণ। অনিন্দিতা ঝিনুক কুড়াচ্ছে সবার কাছ থেকে। নিজেকে সমৃদ্ধ করার খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।
হুগলি নদীর পাড়ে গাড়ি থামে। এই জায়গাটা ওদের সবারই খুব চেনা। পাশের গঙ্গা-ভবনে ছিল ওরা অনেক আগে ডায়মন্ড হারবারে কবিতা পড়তে এসে।
রোদ চড়া থাকলেও হুগলি পাড়ে দাঁড়াতে মন্দ লাগছে না কারোই। স্মৃতিকাতর জনেরা তাদের অভিজ্ঞতা বলে পরষ্পরের কাছে।
রাস্তা পেরিয়ে এপারে এসে দেখে ভ্যান ভর্তি ডাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রেতা ওদের গাড়ির পাশেই।
তৃষ্ণার্ত কবিরা এবার অন্ন-জলে মগ্ন হন। হলুদ সবুজ দুই ধরনের ডাবের জলের স্বাদ নেয় সবাই। স্বাদের তারতম্য টের না পেলেও জলের আধিক্য বুঝতে পারে প্রবলভাবে। তবুও পেটে চালান করে দেয় জীবনী শক্তির জন্য।
দাম মেটানোর ভারটা অনিন্দিতা স্বেচ্ছায় নেয়। খুচরো রাখতে গিয়ে একটা বড় নোটের সন্ধান পায়। বের করে আনে।
নোট নয়, এটা এক টুকরো কাগজ। যা ও’ কাল দুপুরে নিজের হাতে লিখেছিল নাম, ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর মনোরমা দাসের জন্য।
কাগজটা ব্যাগে রাখতে গিয়েও রাখেনা, হাতে রাখে। ওর বুকের ভেতর জেগে থাকে একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নারীর নির্ভরতায় ছোঁয়া এক জোড়া চোখ।
জানালার কাঁচ নামিয়ে ফেলে বিষন্ন চোখে বাইরে তাকায়। একটা প্রশ্ন বারবার ওকে অবিন্যস্ত করে দেয়। হাতের কাগজটা অতি তুচ্ছ এখন, সেটা কেন ওর হাতে???
গাড়ি ছুটে চলছে কলকাতা অভিমুখে। চলমান চতুষ্কোন ইতিহাস আর কবিতায় মুখর…….

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সোহেল মেহেদী ও উপমার ‘ভালোবাসি বলবো তোকে’

সোহেল মেহেদী ও উপমার ‘ভালোবাসি বলবো তোকে’

স্টাফ রিপোর্টার :: ‘ভালোবাসি বলবো তোকে/ দিন যায় বলি বলি করে’ এমন ...