রামগতি পৌরসভার নব-নির্বাচিত মেয়রের কাছে খোলা চিঠি

খোলা চিঠিসারোয়ার মিরন :: লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি পৌরসভার নব নির্বাচিত মেয়র জনাব মেজবাহ উদ্দিন মেজু’র প্রতি পৌরসভার একজন স্থায়ী নাগরিক হিসেবে খোলা চিঠিটি লেখার ভীষন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। আপনার দায়িত্ব গ্রহনের এ আনন্দঘন সময়ে আজ আর আশা নয়, বিশ্বাস করি আপনী ভালো আছেন। অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠেয় পৌরসভা নির্বাচনে আপনার বিপুল বিজয় আমাদের ভীষন ভাবে আন্দোলিত করেছে। আপনার সপথ গ্রহনের পর থেকে আমাদের সে বিশ্বাসের বীজ ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হতে চলেছে।

জন্ম থেকেই জ্বলছি। রামগতি পৌরসভার বেলায় এ অতৃপ্ত আর আক্ষেপের বাক্যটি শতভাগ প্রযোজ্য। পৌরসভা গঠনের প্রায় অর্ধযুগ পরে একজন পরিক্ষীত আওয়ামীলীগার তথা সরকারদলীয় নেতা আমাদের পৌরসভায় নির্বাচিত হয়েছে এবার। পরীক্ষিত ও জন দরদী নেতা হিসেবে আপনার ব্যাপক পরিচিতি থাকায় পৌরবাসীর চাহিদার আকাশ ক্রমশই দীর্ঘ হবে এমনটি সহজেই অনুমেয়। রামগতি পৌরসভা আপনার সুনিপুন দক্ষতায় আরো এগিয়ে যাবে এটাই আামাদের একমাত্র চাওয়া।

আপনী নিশ্চয় অবগত আছেন যে, রামগতি পৌরসভাটি একটি ’গ’ শ্রেনির পৌরসভা। ’গ’ শ্রেনির পৌরসভার জন্য যে শর্ত গুলো পুরন করা দরকার যে শর্ত গুলোর বেশিরভাগই পুরণ করতে ব্যর্থ দেশের দক্ষিনাঞ্চলের উপকূলীয় এ পৌরসভাটি। গঠনের পর থেকেই আলেকজান্ডার ইউনিয়নের প্রায় পরিত্যক্ত ভবনে বসে কার্যক্রম শুরু করার এক যুগ সময় পার হলেও বর্তমানে এটি সেই পুরোনো চেহারাতেই আছে। আপনি নতুন মেয়র হিসেবে হয়তো যে চেয়ার কিংবা রুমটায় বসবেন সেটির হয়তো পলেস্তারা খসে পড়বে আপনার  সামনেই।

রামগতি পৌরসভার প্রধানতম সমস্যাটি আপনী অনুভব করবেন সেটি হলো মেঘনার ভাঙ্গন। ইতিমধ্যে পৌরসভার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের বেশ কিছুটা অংশ তলিয়ে গেছে মেঘনার ভাঙ্গনে। এটি একটি বিশাল বাজেটের জাতীয় সমস্যা। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মো: আবদুল্লাহ (আল মামুন) সাহেব প্রায় দুইশত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভাঙ্গন রোধের কাজ করে যাচ্ছেন নিজ তদারকিতে। কাজটির পরিপূর্ন তত্ত্বাবধান করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষজ্ঞ টিম। সুতরাং মেঘনার সমস্যাটি সমাধানে পৌরবাসীর ফোকাস আপনার উপর থাকবেনা । এ ব্যাপারে আপনী নিশ্চিত থাকতে পারেন।

পৌরসভা গঠনের একযুগ সময় পেরিয়ে গেলেও এ পৌরসভার প্রায় ৬০ শতাংশ নাগরিক বিদ্যুৎ সুবিধার আওতার বাহিরে। বর্তমানের ডিজিটাল এ সময়ে এটি একটি হতাশাজনক খবর। আপনী দায়িত্ব নেবার পর দ্বিতীয় পর্বে এ বিষয়টি হয়তো আপনার নজরে আসবে। আপনী জেনে হয়তো ভীষন অবাক হবেন যে, দীর্ঘ এ সময় ধরে একাধিকজন মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও কেউই পৌরসভার পক্ষ থেকে বিদ্যুতের জন্য আবেদনও করেননি। দেয়া হয়নি একটি খুটি কিংবা মিটার সংযোগও। একটি পৌরসভাকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে পরিচিত করতে হলে যে সুবিধাটি সবার দোরগড়ায় পৌছে দেয়া প্রয়োজন তা হলো বিদ্যুৎ। নাগরিক জীবনে বিদ্যুৎ সুবিধাই দিতে পারে দ্রুত নগরায়ন তা আপনার নিশ্চয় অজানা নয়। আশাকরি আপনার প্রথম কাজ হবে রামগতি পৌরসভা শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা।

নির্বাচনের সময় আপনী রামগতি পৌরসভার প্রায় প্রতিটি পাড়া মহল্লা ও রাস্তায় একাধিকবার যাতায়াত করেছেন। লক্ষ্য করছেন হয়তো রামগতি পৌরসভার প্রায় প্রতিটি রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। চলাচলের অযোগ্য। সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থায় আছে নুরিয়া হাজীর হাটের রাস্তার মাথা টু চর সেকান্দর পর্যন্ত রাস্তাটির অবস্থা সবচেয়ে বাজে অবস্থায় আছে। উল্লেখ করার মতো আরো কয়েকটি সড়কের কথা বলা যেতে পারে। যেমন: নুরিয়া হাজিরহাট টু উপজেলা সড়ক, সেকান্দর টু আলেকজান্ডার বাজার সড়ক, আরসি সড়ক, সেকান্দর রাস্তার মাথা টু বাংলাবাজার সড়কসহ ছোট খাটো বেশ কয়েকটি সড়কে যানবাহন তো দুরে থাক মানুষ চলাচলও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সকল এলাকা ও সড়ক দিয়েই রামগতি পৌরসভার সিংহ ভাগ মানুষ যাতায়াত করেন। সুতারাং এ রাস্তা গুলো চলাচলের উপযোগি করা সময়ের যথার্থ দাবি। নুরিয়া হাজীর হাটের দক্ষিন পার্শ্বে দুটি স’মিলের বিপুল পরিমান গাছের গুটি দীর্ঘ দিন ধরে ফেলে রাখা হয়েছে রাস্তার উপর।

ওয়াকিবহাল মাত্রই অবগত আছেন যে, আমাদের রামগতি পৌরসভায় মাত্র তিন টি বাজার (হাট) রয়েছে। আলেকজান্ডার, জমিদারহাট এবং নুরিয়া হাজিরহাট। আলেকজান্ডার বাজারে একটি মাত্র গণ-শৌচাগার থাকলেও অন্য দুটি বাজারে নেই। নেই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য গভীর নলকুপও। পুরো পৌরসভার কোথাও নেই রাস্তার বাতি। নেই পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থাও। গত সেশনের মেয়র শাহেদ আলী পটু দলীয় বিবেচনায় বেশ কয়েকটি বাড়ির রাস্তায় ইট বসালেও বেশিরভাগ বাড়ির দরজায় এখনো ইট বসেনি। পৌরসভার পুরোটা জুড়েই নেই কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থা। বর্ষার সময়ে ৪,৭,৮,৯নং ওয়ার্ডের বেশিরভাগ বসতবাড়ি ও এলাকায় জলাবদ্ধতা মারাত্মত আকার ধারন করে। ৯ ও ৭নং ওয়ার্ডের সীমানায় বিলীন হয়ে যাওয়া ড্রেনটি নতুন করে স্থাপন জরুরী। বিভিন্ন কারনে বন্ধ ও বদ্ধ হয়ে যাওয়া কালভার্ট এবং পুল গুলো পুনরুদ্ধার করে চালু করা অতি প্রয়োজন।

ইতিপূর্বে রামগতি পৌরসভার নানান সমস্যা ও চিত্র নিয়ে একাধিক বার আমি লিখেছিলাম। পাঠক মাত্রই অবগত থাকবেন যে, রামগতি পৌরসভার প্রধানতম সমস্যা হলো আর্থিক ফান্ড না থাকা। প্রয়োজনীয় ফান্ডের কারনে পৌর কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা মাসের পর মাস আটকে থাকে। অন্য ফান্ডের টাকায় বেতন ভাতা দেয়া হয়। ফলশ্রুতিতে অন্যান্য উন্নয়ন বঞ্চিত হয় পৌরবাসী। পৌরসভার ফান্ড সংগ্রহের অন্যতম খাত বা উৎস হলো পৌরসভায় বসবাসকারীদের ট্যাক্স। এ ট্যাক্সটায় পরিশোধ করেন না বেশিরভাগ নাগরিক। তাই আপনাকে নিতে হতে ট্যাক্স সংগ্রহের নানামূখী উদ্যোগ। তবে কোনভাবেই ট্যাক্সের হার বৃদ্ধি বা খাত বৃদ্ধি না করার অনুরোধ করবো আপনাকে। এমনিতেই নাগরিক সুবিধা না পেয়ে ট্যাক্স প্রদানে অনাগ্রহ রয়েছে পৌরবাসীর। তারপরে যদি আবার বৃদ্ধি করা হয় তবে আমাদের প্রতি অবিচারই হবে বলা যায়।

মেয়র মহোদয়ের প্রতি বিনীত আহবান থাকবে, পৌরসভার ফান্ড সংগ্রহের জন্য স্থায়ী কোন আয়ের দিকে নজর দেবেন। প্রয়োজনে মার্কেট স্থাপন করা যেতে পারে। স্থায়ী কোন ফান্ড না থাকলে পৌরবাসীর নাগরিক সেবা প্রদানে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটবে।

রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আপনী বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের মতাদর্শী হলেও মেয়র হিসেবে আপনী সকল দলের মতের সর্বপোরি আপনী হবেন সকলের এমনটাই আপনার কাছে প্রত্যাশা করবো। সর্বস্তরের সকল শ্রেনি ও পেশার মতামতের উপর ভিত্তি করে উন্নয়ন কাজের সম বন্টন করবেন এ আশাও করি। আপনার পথচলা সুখী ও সমৃদ্ধ হোক। আপনার সাফল্য কামনায়।

২৪.০২.১৬

সারোয়ার মিরন
রামগতি পৌরসভা, লক্ষ্মীপুর।
মুঠোফোন: ০১৮১৯০২১৯১৪
ইমেইল: jharapata87@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...