রক্তাক্ত বিডিআর পিলখানা: নেই ভাষা সান্ত্বনার

লেখক: আ হ ম ফয়সল

আমি দেখিনি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। শুনিনি পাকিস্থানী রক্ত পিপাসু ঘাতকদের বুলেটের শ্বব্দ। দেখিনি সম্ভ্রম হরণ। দেখিনি সেদিনের লুটতরাজের সেই পৈচাশিক দৃশ্য। দেখিনি মুক্তিযুদ্ধের সেই রনাঙ্গণ। তবে আমি দেখেছি ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারির নির্মম-নৃশংস হত্যাযোগ্য ও যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিচ্ছবি। রাতের চেয়েও অন্ধকার এই দুটি দিনের কথা মনে পড়লেই যেন অচেনা ভাবে ‘না দেখা ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের অনুভব ভিতস্মরে রক্তে শিহড়ে উঠে। বিডিআর বিদ্রোহ নামে পরিচিতি পাওয়া এই নারকীয় তান্ডবের সূত্রস্থল রাজধানী ঢাকার বিডিআর সদর দপ্তর বিডিআর পিলখানায়। এখানকার পার্শবর্তী এলাকা ঝিগাতলার বাসিন্দা হিসেবে আছি অনেক দিন থেকেই। প্রতিবেশি হিসেবে বিডিআরদের পদচারণা ছিল এই এলাকায় বেশ। বিডিআর সম্পর্কে কখনো কোন খারাপ মন্তব্য শুনিনি কারও কাছ থেকে। সু-শৃংখল এই বিডিআর জোয়াদের কেন্দ্রিয় গেইটের সামনে দিয়েই আসা-যাওয়া করতে হত প্রতিদিন। প্রায়াশ:ই বিডিআরের রাইফেল স্কয়ার মার্কেটে যাওয়া হত আগোরা সুপার সপ এর ফ্যামিলী মেম্বার হওয়ায়। বিডিআর জোয়ানদের কর্মস্পৃহা দেখতাম বাসায় বসে। রাত কি ভোর হলো, তাদের কাজের অনবদ্যতা দেখে নিজেদের প্রতি যেমনি হিংসা হতো, তেমনি প্রেরণা হিসেবেও কাজ করেছে।

তাহলে তারাই বা কেন আবার ঝলসে উঠলো? প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি কেন? কোন গণমাধ্যমও এর উত্তর ২৫ তারিখ জানাতে পারেনি? ভাসা-ভাসা শব্দে প্রচারনা পেতে থাকে বিডিআরের উপর সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব তারা মেনে নিবে না। ডাল-ভাত কর্মসূচীর অনিয়মের দায়ভার তারা মানতে নারাজসহ তাদের বিভিন্ন দাবী-দাওয়া পূরণের দাবীতে পিলখানায় শুরু হয়েছে গোলাগুলি আর অগ্নি সংযোগ। প্রাচীর ঘেরা এই সদর দপ্তরের মধ্যে কেউই ঢুকতে পারছিল না সেদিন। সকাল সাড়ে নয়টার পর সবাই বাহির থেকে অবলোকন করছিল কী হচ্ছে ভিতরে এত গোলাগুলি আর আগুনের ধোয়া কেন? বেসরকারী ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে সরাসরি ঘটনাটি দেখেছে গোটা দেশবাসী। মুহু-মুহু গুলির শব্দ। পিলখানার বাহিরেও ছুটে আসছে বিডিআর জোয়ানদের ছোড়া হাজারো বুলেট। বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিককেও এর জন্য প্রাণ দিতে হলো। বাহির থেকে বিডিআর পিলখানার ভিতরে মনে হচ্ছিল- চলছে অসন্তোষের গুলির শব্দ। বিডিআরের দাবী পূরণের আশায় তারা অগ্নি সংযোগ করছে বিভিন্ন গাড়িতে। কেননা বাহির থেকে ধোঁয়া-আর বুলেটের শব্দ ছাড়া শুনা-বা কিছু জানা যাচ্ছিল না। তাদের এ দাবীর সাথে সাধারণ মানুষের মতও যেন একমত। প্রত্যক্ষদর্শী গোটা দেশবাসীও যেন তাদেরকে সহানুভূতির চোখেই দেখছিলেন, এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও।

বিডিআর বিদ্রোহ শুরু হবার পর গোটা দেশ মুহুর্তের মধ্যেই যেন স্তম্ভ্বিত হয়ে গেল। সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্রোহ বন্ধের বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ ছিল সত্যিকার অর্থেই প্রসংশনিয়। দুই দিনের এই নারকীয় তান্ডবের প্রথম রাতটি বিতস্মরে গুলির শব্দ শুনতে-শুনতে কাটালেও, পরের রাতটি আর ঝিগাতলা বাসায় কাটাতে পারিনি। প্রথম দিন থেকেই আত্নীয়-স্বজন, সহকর্মীরা খোঁজ নিতে থাকেন, কী খবর, কী অবস্থা, নিরাপদে আছি কীনা ইত্যাদি। অবশ্য প্রথম দিন সন্ধ্যার পরে যানবাহনের স্বল্পতা ও পিলখানা এলাকায় বিভিন্ন রাস্তা ঘাট বন্ধ থাকায় আমার এক সহকর্মী তার হোন্ডা দিয়ে অলি-গলি দিয়ে বাসায় পৌছে দিয়ে যান। দ্বিতীয় দিন মিরপুর এলাকার অফিসে বসে কাজ করছিলাম। এর এক ফাঁকে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর অনবদ্য ভাষণনটিও শুনলাম। তারপর বিদ্যুৎ চলে যায়। বাসায় মোবইলেও পাচ্ছি না ! কেননা পিলখানা ও তার আশেপাশের এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এক সহকর্মী এসে খবর জানালেন, পিলখানা এলাকার তিন কিলোমিটার এর মধ্যে সকল বাসিন্দাদেরকে দ্রুত অন্যত্র সরে যেতে বলেছেন। হতভম্ব হয়ে গেলাম, কী করবো? কেন না সরকার বিডিআরকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না। তাই সেবাহিনী দিয়ে তাদেরকে মোকাবেলা করার প্রস’তি নেয়। তাড়া হুড়া করে অফিস থেকে বের হয়ে একটি সিএনজি নিয়ে রওয়ানা দিলাম। তখন বিকেল তিনটা। পথিমধ্যে দেখলাম সেনাবাহীনির গাড়ী বহর অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে যাচ্ছে বিডিআর অভিমূখে। এক পর্যায়ে সিএনজি থেমে গেল। পুলিশ জানালো, রাস্তায় এ পর্যন-ই। বাকী রাস্তা বন্ধ, হেটে যেতে হবে। সেটা ধানমন্ডি ২৭ এর শেষ মাথা থেকে শুরু। সিএনজি থেকে নেমেই সাত মসজিদ সড়ক দিয়ে দ্রুত বেগে হেটে চললাম রাস-ার বিপরীত পাশ দিয়ে। কেননা রাস্তার বাম দিক লেনে একের পর এক সেনা গাড়ী এসে দাঁড়াচ্ছে। কিছু দুর হাঁটতেই দেখি যুদ্ধ ক্ষেত্রের ব্যবহার্য ট্যাংক, একের পর এক কামান, নাম নাজানা বিভিন্ন অস্ত্র-শস্ত্র বিডিআর গেইট মুখ তাক করে দাঁড়িয়ে আছে সেনাবাহিনী। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেলেই তারা বাকী এক কিলোমিটার রাস্তা চলতে শুরু করবে। যুদ্ধ ক্ষেত্রের এই ট্যাংক, সাজোয়া যান দেখার জন্য এখানে তখন এলাকার হাজার হাজার মানুষের ভিড়।

কিছুক্ষন পর ভাগ্যবশত একটি খালি রিক্সা পেয়ে গেলাম। রিক্সা, মানুষ কাউকে এখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা সোজা রাস্তায় হেটেও যেতে দিচ্ছে না। অলি-গলিতে ঢুকে ঝিগাতলায় যাচ্ছি। আর রাস্তার দুই ধারের দৃশ্য দেখে চোখের জল আটকে রাখতে পারিনি। মানুষ পাগলের মত ছুটে চলে যাচ্ছে, এসব এলাকা ছেড়ে। বৃদ্ধ, শিশু, নারী-পুরুষ সবাই যে যার মত ছোট খাট ব্যাগ নিয়ে যানবাহনের অভাবে হেঁটে যাচ্ছে। ছুটে চলা মানুষের ভিড়ে রাস্তায় রিক্সা চলার যেন যায়গাই নেই। অনেকেই আবার হন্য হয়ে খুজছে যানবাহন। বিমর্ষ মানুষগুলোর চেহারার বর্ননা হয়তোবা আমি লিখে প্রকাশ করতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি-ছুটে চলা মানুষের তখন যে দৃশ্য দেখেছি, এরকম দৃশ্য দেখেছি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ভিডিও চিত্রে। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ মাইলের পর মাইল হেঁটেছে। এ গ্রাম থেকে সেই গ্রামে, ঠিক সে রকম প্রতিচ্ছবির পুনরাবৃত্তি হলো সেদিন বাংলাদেশে। যেন একটু পরেই শুরু হবে বাংলাদেশে আরেক মুক্তিযুদ্ধ। এ যেন যুদ্ধের পূর্ব মুহুর্তের ময়দান। রিক্সা চালকের সাথে বহু সহমর্মিতার ভাষা প্রকাশ করে স্ত্রী, সস্তান ও গৃহ পরিচারিকাকে নিয়ে ঝিগাতলা এলাকা ছেড়ে শ্যামলী এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেই (যদিও এ বাসায় প্রয়াশঃই বেড়াতে আসতাম, কিন্তু সে দিন এসেছি আশ্রয়ের জন্য। দূর এলাকা হওয়ায় মুগদাপাড়ার আত্মীয়ের বাসায় যাওয়া হয়নি। যদিও মুগদাপাড়ার আত্মীয়ই প্রতি মুহুর্তে খোঁজ নিয়েছেন)।

সরকার বিডিআর নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাদলকে পিলখানায় ঢুকতে বললে একটি দ্বিমুখী যুদ্ধ পরিসি’তি সৃষ্টি হবে। তাই এলাকার মানুষকে নিরাপদে সরে যেতে বলেছেন। যদিও সরকারকে শেষ নিরুপায়ের এই কাজটি করতে হয়নি। তার আগেই বিডিআরকে সরকার নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। সমাপ্তি হয় বারুদের গন্ধ, গুলির শব্দ, আগুনের ধোঁয়া। কিন্তু এখানেই কী শেষ ? না বরং শেষ থেকেই যেন পরিণতিটা শুরু। বিডিআরের একটি চক্রান্ত গোষ্ঠী দরবার হলে অনাড়ম্বর এক অনুষ্ঠান চলাকালে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা হত্যা করে বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল শাকিল আহমদকেসহ ৫৯ জন সেনা সদস্য কে। এদের লাশ উদ্ধার করা হয় পিলখানার ড্রেন থেকে, মাটি চাপা দেয়া গণ কবর থেকে। লুটতরাজ ও নির্যাতন চালায় সেনা পরিবারে। বিডিআরের এই নির্মমমতা দেখে দেশবাসীর সহানূভূতির চোখ ফিরে যায় বিডিআর থেকে। ভাই হয়ে ভাইকে যারা হত্যা করতে পারে তারা মানুষ নয়, তারা নরপিচাশ। শাস্তি তাদের দিতেই হবে এবং পেতেও হবে এবং সরকারকে মূল ঘটনার কারন উদঘাটনও করতে হবে। প্রয়োজনে আরও কঠোর হতে হবে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার চরম ব্যর্থতার পরিচয় ঘটেছে এখানে।

অকাতরে নিজের জীবন দিয়ে যারা একাত্তরে এই দেশকে স্বাধীন করার জন্য শত্রুদের মোকাবেলা করেছে, রক্ষা করেছে লাখ মানুষের জীবন, স্বাধীন করেছে দেশ। আজ সেই বীর সেনাদেরকেই দেশের ভাইদের হাতে জীবন দিতে হলো। মনে হচ্ছে বীর সেনাদের নিয়ে বিশ্ব অহংকারের সূর্যাস্ত ঘটলো। কলংকিত হলো আত্নঅহংকার। এখানেও মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারলাম না নিহত সেনা পরিবারগুলোর প্রতি নেই ভাষা সান্তনার। এখনও মনে পড়ে, বলা ঠিক হবে না, বেঁচে থাকার আগমূহুর্ত পর্যন্ত না দেখা মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতির মত মনে থাকবে শোক গাঁথা পিলখানায় বীর সেনা হত্যাকান্ডের ঘটনা।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, ইউনাইটেড নিউজ

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...