যমুনার ভাঙ্গন…………

শামীম মিয়া::
আজ মন্টা ভালো নেই রাকিবের। বাবা ঢাকায় চলে গেছে। বাবা ঢাকা থেকে এসেছিলো  কয়দিন আগে,তবে বাবা আসার আগে রাকিবকে বলেছিলো মোবাইলে অনেক দিন থাকবেন। কিন্তু কার যেন ফোন পেয়ে বাবা আজকেই চলে গেলেন ঢাকা। বাবা বাড়িতে আসলে রাকিব বিশ্ব সুখি হয়। রাকিব আজ বারান্দায় বসে ভাবছে আজ যদি বাবা থাকতো তাহলে কতই না মজা হতো। এই কথা ভাবতেই রাকিব ফোঁকলা  দাঁতে মুছকী হেসে ভাবে বাবা অল্পের জন্য পিছলে পড়িনী কাঁদার মধ্যে। সেদিন বৃষ্টি হওয়ার পর বাবা আর রাকিব আমদির পাড়া গ্রাম দিয়ে জুমারবাড়ী বাজারে যাচ্ছে পায়ে হেটে। এই কারনে রাস্তায় অনেক কাঁদা জমে গেছে। তাই রাকিব বাবাকে বলেছিলো বাবা দেখে দেখে যাও পিছলে পড়বে। কিন্তু বাবা বলেছিলো আমার কিছু হবে না এই কথা বলতেই বাবা পিছলে পড়ে আর রাকিব হা হা হা হেসে উঠে। এই কথা গুলো ভাবছে রাকিব । হঠাৎ রাকিবের চোখ যায় কয়েক গজ দুরে যমুনা নদীর দিকে, মন্টা ওর খারাপ হয়ে যায় বাবার মুখে শুনে ছিলো এই যমুনা নদী আগে অনেক দুরে ছিলো। বাবারা যখন খুব ছোট্ট তখন বাবারা যমুনা নদীতে গোছল করেছে। তবে নদীটা অনেক দুরে ছিলো। এমন সময় মা ডাকলো রাকিবকে। রাকিব ঘরের দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টি হয়েছে রাতে, টুপটুপ করে এখনো বৃষ্টি পড়ছে খড়ের চাল থেকে। রাকিব এক দৌড়ে মার কাছে যায়। মার আঁচল ধরে বলে মা কি হয়েছে গো ?
নদী-ভাঙ্গনমা বললো বাবা রাকিব আমরা আগামীকাল তোমার নানার বাড়ী যাবো। রাকিব মাকে প্রশ্ন করলো কেন গো মা ? মা বললো, নদীর অবস্তা ভালো না। ভাঙ্গন শুরু হয়েছে, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভাব আমাদের যেতে হবে এখান থেকে।
রাকিব মার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। রাকিব মাকে বললো, মা আমার ছাগল ছানাটা কার কাছে রেখে যাবে ? মা বললো, ছাগল ছানাটা কেউ নিয়ে যাবো  সঙ্গে। রাকিব এবার খুশি হলো এবং বললো মা কালকেই যাবো নানার বাড়ী। মা বললো, নদীর পারে ছাগল ছানা বাধা আছে ছাগল ছানাকে নিয়ে আসো সন্ধ্যা হয়ে আসছে। রাকিব মাকে বললো, ঠিক আছে মা আনছি। এই বলে ছোট্ট রাকিব ছুটলো নদীর পারে ছাগল ছানা আনতে।
নদীর পারে এসে রাকিবের মন্টা খারাপ হয়ে গেলো, কেন জানি লোকজন হৈ চৈ করছে আজ। রাকিব ছাগল না নিয়ে দৌড়ে গেলো মার কাছে গিয়ে বললো, মা দেখো লোকজন কেমন জানি করছে। মা বাহিরে এসে দেখতে পেলো তার পরিচিত মুখ গুলো। নদীতে ভাসচ্ছে। আহাজারি কান্নায় বাতাস জেনো ভারি হয়ে গেছে। হঠাৎ দমকা এক বাতাস সঙ্গে ঢেঊ এসে রাকিবদের আঙ্গিনার অর্ধেক অংশ ভেঙ্গে গেলো যমুনা নদীতে। মা রাকিবকে বুকে জরিয়ে একটা চিৎকার দেয়। ইয়া আল্লাহু ,ইয়া রাহমানু , আমাদের বাঁচান।
চারদিক অন্ধকার মাগরিবের আযান ভেসে আসচ্ছে দুর থেকে। জোসনার রাত তবুও অন্ধকার মেঘে ঢাকা। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, কান্না আর আহাজারি বাড়ছে। রাকিব মার বুকে, ভয়ে কোন কথা বলছে না। মা শুধু কাঁদচ্ছে কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। হঠাৎ দমকা বাতাস সঙ্গে ঢেঊ এসে রাকিবদের ঘরটা নিয়ে যায় নদী। মা জীবনের ঝুকি নিয়ে তার এক মাত্র সন্তান রাকিবকে নিরাপদে পিঠে নিয়ে ঝাঁপ দেন নদীতে, ঘরটি ধরার জন্য। তাছাড়া মার কোন কিছুকরার নাই। মা যে জায়গায় দ্বাড়িয়ে ছিলেন সেই জায়গাটাও নদীতে ভেসে যায়।
অনেক কষ্টে মা পানিতে ভাসা ঘরটি ধরেন। তারপর ঘরের চালে বসেন। রাকিব শীতে কাঁপছে,জোসনা মেঘের ফাঁকে উকি দিচ্ছে। মা তার ভিজা শাড়ির  আঁচল চিপিয়ে রাকিবকে ঢাকিয়ে জড়িয়ে নিলেন বুকে। মা আর রাকিব ঘরের চালে বসে আছেন। আর নদীর ঢেউয়ে চলছেন সামনের দিকে। কিছু দুর যেতেই মার কানে ভেসে আসে প্রতিবেশী রত্নার মা বাবার কন্ঠ। মা তাদের বললো, ভাই ভাবী এখানে আমি আমাকে সাহায্য করুন। রত্নার বাবা মা রাকিবদের সাহায্য করে। তাদের টিনের চালে নেয়। রাকিবদের খড়ের চালটা ডুবিয়ে যায় নদীতে। টিনের চালে এসে মা র্দীঘ একটা নিশ্বাস ফেলে।
মাকে জড়িয়ে ধরে আছে রাকিব। রাকিব মার ভিজা শাড়ীর আঁচলটা সড়িয়ে বললো, মা ও মা আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি গো ? আমাদের ছাগল ছানাটি কৈ? মা তার দু চোখের পানি মুছে মৃত কন্ঠে বললো জানি না। বাবা ।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রহিমা আক্তার মৌ

‘জল ও জীবন’

রহিমা আক্তার মৌ :: আমাদের প্রাণপ্রিয় নগরী ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। অপ্রিয় ...