মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গন আতংকে রামগতি ও কমলনগরের দুই লক্ষাধিক মানুষ

সাজ্জাদুর রহমান, লক্ষ্মীপুর থেকে

লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী  ৯টি ইউনিয়নের প্রায় ১৬টি গ্রামে চলতি শীত মৌসুমেও ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এখানকার মানুয়ের মধ্যে সারা বছর ধরে ভাঙ্গন আতংক থাকে। শুধু বর্ষা নয়, গ্রামগুলোতে শুস্ক মৌসুমেও মেঘনার তীব্র ভাঙ্গন দেখা যায়। গত কয়েক দিন থেকে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ভাঙ্গন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে।

রামগতি ও কমলনগর উপজেলার ১৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপজেলা সদর এলাকা, উপজেলা পরিষদ কার্যালয় ও উপজেলা স্বাস’্য কমপ্লেক্স এবং রামগতির হাট, বিবির হাট ও রামদয়াল বাজারসহ উপজেলার চারটি ইউনিয়ন মেঘনা নদীর ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। চর আবদুল্লাহ ইউনিয়নের চর গজারিয়ায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আশ্রায়ন প্রকল্প মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে। সেখানে ৯শ‘ পরিবারের মধ্যে ছয় শতাধিক পরিবার ইতোমধ্যে গৃহহারা হয়েছে। এ ছাড়া আসলপাড়া, দক্ষিণ আলেকজান্ডার ও সেবাগ্রাম এলাকায় আরও পাঁচ শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। এর আগে আবাদি জমিসহ এলাকার অনেক স’াপনা মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি,ফসলি জমি, কাঁচা-পাকারাস্তা,বেড়িবাঁধ, হাটবাজারসহ বিস্তীর্ন এলাকা।

বিগত দিনগুলোতে মেঘনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে উপজেলা পরিষদ কার্যালয় ঘেরাও, সড়ক অবরোধ, লং মার্চ, হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসুচি, প্রধান মন্ত্রী বরাবর স্মারক লিপি প্রদান করা হয়েছে। এর পরেও ভাঙ্গন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস’া গ্রহন করা হয়নি। যে কারণে ভাঙ্গন আতংকে রামগতি ও কমলনগরের দুই লক্ষাধিক মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

ভাঙ্গন প্রতিরোধে সরকারি বা বেসরকারি ভাবে কোন উদ্যোগ গ্রহন করা না হলে অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে কমলনগর উপজেলার মতির হাট, চৌধুরীর হাট ও লুধুয়া বাজার এবং  রামগতি পৌর ভবন, রামগতি থানা কমপ্লেক্স, উপজেলা স্বাস’্য কমপ্লেক্স, জনস্বাস’্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবন, বিআরডিবি ভবন, গ্রামীন ব্যাংক ভবন, উপকূল সিনেমা হল, সরকারি দু‘টি খাদ্য গুদাম, আ স ম আবদুর রব সরকারি কলেজ, আলেকজান্ডার পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, আলিয়া মাদ্রাসা এবং উপজেলা সদর আলেকজান্ডার বাজারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স’াপনা। মেঘনা উপকূলীয় ভাঙ্গনকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কমলনগর উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়নের চরসামছুদ্দিন, মতিরহাট বাজার এলাকাসহ, সাহেবের হাট ইউনিয়নের সাহেবের হাট, চরফলকন ইউনিয়নের লুধুয়া, ঠুয়ারচর, পাতারচর, উরিরচর, রামগতির চরআলেকজান্ডার ইউনিয়নের আসলপাড়া, সেবাগ্রাম, দক্ষিন আলেকজান্ডার, চরআলগী ইউনিয়নের গাবতলী, দক্ষিন আলগী, চররমিজ ইউনিয়নের চররমিজ গ্রাম, বড়খেরি ইউনিয়নের রঘুনাথপুর, চর গাজি ইউনিয়নের বয়ার চর এবং ৯শ পরিবারের আশ্রয় যোগ্য চর গজারিয়া আশ্রায়ন প্রকল্পসহ উপজেলার চরআবদুল্যাহ ইউনিয়নের দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ তেলির চর ও চর গজারিয়া – এ গ্রামগুলোর অধিকাংশ এলাকা মেঘনার গ্রাসে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে এবং সেখানে বেশ কয়েকটি বাজার, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদসহ বিভিন্ন স’াপনা স’ানান্তর করতে হয়েছে।

ভাঙ্গনকবলিত এলাকাবাসিরা জানান, আমরা নদীর তীরে বসবাস করার কারণে সারা বছর ধরে আমাদের যন্ত্রণা পোয়াতে হয়। প্রমত্তা মেঘনা  বাড়ি-ঘর ও আবাদি জমি গ্রাস করার ফলে এখন অনেক বাড়ি-ঘরের চিহ্ন পর্যান্ত নেই। সবই মেঘনার বক্ষে বিলীন হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে তারা পরিবার-পরিজন ও গবাদি পশু নিয়ে কিছু দুর এসে বাড়ি-ঘর তৈরী করে বসবাস শুরু করছেন। কিন’ সর্বনাশা মেঘনার ভাঙ্গন সেখানেও ধেয়ে আসছে। এ জায়গাটুকু ভেঙ্গে গেলে বসবাসের আর কোন জায়গা তাদের থাকবে না বলে স’ানীয়রা জানান। ১৯৭০ সাল থেকে মেঘনার ভাঙ্গন শুরু হওয়ার পর ক্রমাগত বিস্তৃত হয়ে এ সব এলাকার বাড়ি-ঘর, ফসলি জমি, গাছ-পালা, রাস্তাঘাট হাটবাজারসহ ৮৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এরই মধ্যে রামগতি উপজেলার চর আবদুল্য্লাহ ইউনিয়নটি সম্পুর্ন বিলীন হয়ে যায়।

এ ছাড়া আসল পাড়া এলাকায় স’াপিত বিআইডব্লিওটিএ‘র একটি ডকইয়ার্ড, ৮টি বরফকলসহ অসংখ্য বাড়িঘর সম্পুর্ন বিলীন হয়ে গেছে। দীর্ঘ তিন যুগের বেশী সময় ধরে মেঘনার এই ভয়াবহ ভাঙ্গনে দু‘উপজেলার লক্ষাধিক লোক হয়েছে বিপন্ন। নিশ্চিহ্ন হয়েছে বহু ফসলি জমি, গাছপালা, রাস্তা-ঘাট, পুল, ব্রিজ, কালবার্ড, হাসপাতাল, ঘূর্নিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা-মসজিদ, মন্দির, ঘর-বাড়ি, বেড়িবাঁধসহ শতশত কোটি টাকার সরকারি -বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সহায় সম্পত্তি। এ ছাড়া সরকারি বেসরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসহ ১৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেঘনার ভাঙ্গনের ৫শ’ গজের মধ্যে রয়েছে। মেঘনার ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা করতে স’ানীয় এলাকাবাসির উদ্যোগে বাঁশ ও খুটির জংলা বাধ দিয়ে নদীর ভাঙ্গন ঠেকাতে চেষ্টা করলেও মেঘনার কড়াল গ্রাস থেকে গ্রামকে রক্ষা করা সম্ভব হয়ে উঠে না। মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গন থেকে উপজেলাকে রক্ষার জন্য স’ানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন থেকে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসুচি পালন করে আসছে। তারা মেঘনার ভাঙ্গন প্রতিরোধ করতে তাদের কয়েকটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি উত্থাপন করেন। অতিমাত্রায় ভাঙ্গন হলে নদীমুখে ব্লক ফেলা, মাঝ নদীতে জেগে উঠা নতুন চর ও ডুবোচর খনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ করার দাবি করেন। সরকার এক্ষুনি কোন ব্যবস’া না নিলে এক সময় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে রামগতি ও কমলনগর উপজেলা।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ইনজেকশন দেয়া গরু চিনবেন যেভাবে

ষ্টাফ রিপোর্টার ::ঈদুল আজহার আর মাত্র ক’দিন বাকি। ঈদুল আজহা মূলত মহান ...