মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা কি পোষ্য কোটার মধ্যে পড়েন?

মুক্তিযোদ্ধা

লেখক, আরিফ চৌধুরী শুভ

আরিফ চৌধুরী শুভ :: কোটা সংস্কার আন্দোলন শুধু উচ্চ শিক্ষিত চাকুরিপ্রার্থীদের ই আন্দোলন নয়, দীর্ঘদিনে মেধা বনাম কোটার বৈষম্যের ফলে সৃষ্টি হওয়া বৈষম্য বিরোধী বাংলাদেশের আন্দোলন। এই আন্দোলন একটি স্বাধীন দেশে চাকুরি বঞ্চিত লাখ লাখ পরিবারের আন্দোলন। এই আন্দোলন মুক্তিযোদ্ধার চেতনায় বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধুর বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ারও একটি আন্দোলন।

আমি বিশ্বাস করি, সরকার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করে এই আন্দোলনকে সাময়িক স্থগিত করতে পারবে, কিন্তু কোন ভাবেই গণজাগরণের এই আন্দোলনকে নির্ভত করতে পারবে না। কারণ শিক্ষার্থীরা যখন কোন নৈতিক ও যৌক্তিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের একটি বৃহৎ সমর্থন নিয়ে রাজপথে নামে (অতিতেও ঠিক এমনই হয়েছে), তখন সেই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথই শিক্ষার্থীদের ক্লাসে পরিণত হয়। তারা নির্ভিক ও আত্মমর্যাদাশীল এবং পরাজয়ে ডরে না বীর বলে কাঙ্খিত দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বার বারই রাজপথে ফিরে আসে এবং আসবেই।

২০১৫ সালের উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাট আন্দোলন ঠিক তারই উদাহরণ। এই বাংলাদেশ লাখ লাখ শিক্ষার্থীর স্রোত রাজপথে সেদিনও দেখেছে ২০১৮তেও দেখছে আরেকবার। তাই কোন ভাবেই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব। আমি আবারো বলছি এটা অসম্ভব।

আন্দোলনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সরকারের অবস্থানকে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করলেও শিক্ষার্থীরা শুরুতেই যা অনুমান করেছে সেটিই সত্যের বারতা দিচ্ছে। ছাত্রলীগ এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও আন্দোলন সমর্থিত অভিভাবক, শিক্ষকদের উপর নৃশংস হামলার মাধ্যমে শাসকশ্রেণির রূঢ আচরণের অত্যন্ত স্পষ্ট বহি:প্রকাশ ঘটেছে। এটা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান পরিপন্থি এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনও বটে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থার গভীর পর্যবেক্ষন ও উদ্বেগ প্রকাশ তারই প্রমাণ।

২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার ৯০ দিনের মাথায় ১২ জুলাই, হাইকোটের্র একটি রায়কে সামনে এনে ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা থেকে সরে আসলেন। এতে শিক্ষার্থী ও দেশবাসী শুধু অবাক হয়নি, এই আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানও কিঞ্চিত পরিষ্কার হয়েছে সবার কাছে।

হলের ১৫ টাকার ভাত খেয়ে আর ৩৮ টাকার সীট ভাড়া দিয়ে রাস্তায় শিক্ষার্থীদের লাফালাফির যে উদাহরণ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তাতে করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত দুর্বল ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যে রাষ্ট্র কখনোই দায় এড়াতে পারে না। বরং উন্নয়নশীল রাষ্ট্র দাবিদারের ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থার এমন করুণ দশা স্পষ্ট পরিপন্থি নয় কি? তাছাড়া একজন রাষ্ট্র নায়কের মুখে এমন বক্তব্য শোনার জন্যে সবাই একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল। খুবই দু:খ পেয়েছি প্রধানমন্ত্রীর ভাতের খোঁটায়।

১৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বললেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা নিশ্চিত করতেই পোষ্য কোটার প্রবর্তন করেছে সরকার। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা কি কখনোই পোষ্য কোটার মধ্যে পড়েন? তাছাড়া এই প্রতিযোগিতার সময়ে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রয়োজনীয়তা কোথায় কতটুকু? সারাদেশে কতজন মুক্তিযোদ্ধা এখনো বেঁচে আছেন এবং মোট জনসংখ্যার অনুপাতে সেটি যদি ২ শতাংশ হয় তাহলে ৩০ শতাংশ কোটা বড়ই অমানবিক মেধাবীদের জন্যে। তারা না মানাটাই স্বাভাবিক।

তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান চাকুরি পেলে মুক্তিযোদ্ধা উপকৃত হবে কিন্তু নাতি চাকুরি পেলে মুক্তিযোদ্ধার কতটুকু উপকার হবে? যেখানে সন্তান খোঁজ নেয় না বাবার, সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতী-পুতিদের নিয়ে রাষ্ট্র নিদ্রাহীন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী তুরিকুলকে ছাত্রলীগ কর্মীদের হাঁতুড়ি পেটা দেখে দেশবাসী ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে জঙ্গিবাহিনীর সাথে তুলনা করছেন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপর একের পর এক হামলায় শিক্ষকরাও ছাত্রলীগকে সরকারের গুণ্ডাবাহিনী উপাধি দিয়েছেন।

এই উপাধি ছাত্রলীগ তথা সরকারের জন্যে শুভকর নয়। তাছাড়া ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকেও মানুষ এমন চরিত্রে কখনোই দেখতে চায় না। তাদের হাতিয়ার হাঁতুড়ি আর অস্ত্র নয়, তাদের হাতিয়ার হবে একমাত্র মেধা। আমরা এটাও আজ ভুলে গেছি। যে ছেলে তার সহপাঠিকে রাস্তায় হাঁতুড়ি পেটা করে সে যে দলেরেই হোক না কেন সে সবার কাছে ঘৃণিত হবে।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘঠিত ছাত্রশিবিরের হামলাকে নৃশংস আখ্যা দিয়ে হামলার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং উপাচার্যের ব্যর্থতা বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে তখন সরকারের প্রতি রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। কিন্তু ২০১৮ সালে সেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মীর প্রকাশে হাঁতুড়ি পেটা সারাদেশে সমালোচনার ঝড় তুললেও এখন পর্যন্ত কোন রুল জারি করা হয়নি ঘটনার তদন্তে।

রাষ্ট্রে সমঅধিকারের কথা শুধু মুখে মুখে নয়, আইন আদালতেও সবার জন্যে সমঅধিকার থাকা দরকার।উচ্চ আদলতের কতিপয় আইনজীবী কোটা আন্দোলনকারীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বললেও ডিবির হাতে গ্রেফতারকৃত রাশেদের হতদরিদ্র মা ছেলের মুক্তির জন্যে কারোরই সহযোগিতা না পেয়ে শাহবাগে বসে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছেন দুহাত জোড় করে।

পত্রপত্রিকায় রাশেদের মায়ের জোড়হাতের অনুরোধ ও নোনা অশ্রু শুধু একজন রাশেদের জন্যেই নয়, এই আকুতি এই অনুরোধ ও এই কান্না বৈষম্যের শিকার লাখ লাখ মায়ের, পরিবারের, শিক্ষার্থীর। এই অভিশাপ আর আক্ষেপ কোন ভাবেই মোছনীয় নয়। মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের আকুতি করছেন আজ। আশা করি প্রধামন্ত্রী তাদের ফিরিয়ে দিবেন না।

কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার পরে শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীকে যে মাদার অব এডুকেশন উপাধি দিয়েছেন আশা করি প্রধানমন্ত্রী খুব  কোটা বাতিল নয়, সংস্কারের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষার্থীদের সেই উপাধিকে অলঙ্কিত করবেন।

 

 

লেখক: উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন। শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তার্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ (মাস্টার্স)

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রাজীবের সুরে অনিতা-সুমন

রাজীবের সুরে অনিতা-সুমনের ‘বন্ধু হতে চাই’

স্টাফ রিপোর্টার :: রাজীব হোসাইনের সুর ও সঙ্গীতে নতুন একটি দ্বৈত গানে ...