ব্রেকিং নিউজ

মায়ের কোল

শামীম মিয়া:

9209215_41634700গ্রাম আমদির পাড়া। চারদিক সবুজে ঘেরা, আমাদের পাড়া। মাঠে, মাঠে, রাখালের বাঁশি বাজানো সুর, চলে যায় গ্রাম পেড়িয়ে বহুদুর। গাছে, গাছে, হরেক রকম ফুল, ফল,পাখির ডাক। রাতে জোনাকী পোকার মিটমিট আলো,আহা খুব সুন্দর লাগে দেখতে ভালো। এই গ্রামকে কেন্দ্র করে, আছে একটা বটগাছ। বটগাছটার বয়স প্রায়, একশত বছর হবে। এই বটগাছটার চারদিক দিয়ে গড়ে উঠেছে জনপদ। বটগাছের দক্ষিনে যমুনা নদী, এবং পশ্চিমে বাঙ্গালী নদী। বটগাছের আশে পাশে বেশ কয়টা দোকান আছে। দড়্গিনে জুমারবাড়ী বাজার, উত্তরে সাঘাটা থানা, কয়েক কিলো দুরে গাইবান্ধা জেলা। বটগাছের নিচে বসে অনেক শ্রমজীবি লোকজন বিশ্রাম নেয়। বটগাছটা থাকার কারনে ভ্যান চালক ভাইয়েরা ও গ্রামের লোকেরা এর নাম দিয়েছে বটতলী। বটতলী নামেই এই জায়গাটা বর্তমানে পরিচিত। এই বটগাছের ইতিহাস বলা বাহুল্য।

এই গ্রামেই শ্রাবণ নামের একটা ছেলের বাড়ি। সেই ছোট্ট বেলায় তার বাবা মারা যায়। মা ছেলে মিলে অতি কষ্টে বেঁচে আছে। তবুও শ্রাবণ একশতর মধ্যে একজন এর মতো আনন্দ ফু্রতিতে কেউ যেন থাকতেই পারেনা। সবার সেরা দুষ্টু ছেলে শ্রাবণ। তবে তেমন ভালো ছাত্রও না। স্কুলে স্যার ক্লাসে আসলে যেন শুধু শ্রাবণেরই বিচার করেন। স্কুলে গেলে শুধু মারামারি করে এর সাথে ওর সাথে ইত্যাদি। স্যারও শাসন করেন কিন্তু কোন লাভ হয়না। যেমন তেমনী রইয়ে যায় শ্রাবণ। তবে স্যারদের সাথে শ্রাবণ কোনদিন বেদবী করে না। অন্য অন্য প্রায় স্যার জানে শ্রাবণ ভালো আবার কেউ জানে শ্রাবণ শুধু মারামারি করার জন্যই স্কুলে আসে। আবার কোন স্যার মনে করেন এই বয়সে ছেলে পেলে একটু দুষ্টু থাকেই। স্কুল থেকে বাড়ি এলোও শ্রাবনকে শুনতে হয় মায়ের বকা। কারন স্কুলে যাদের সাথে মারামারি করে তাদের বাবা-মা এসে শ্রাবণের মাকে বিচার দিয়ে যায়। প্রায় দিনই কোন না কোন বাবা এসে শ্রাবণের নামে বিচার দিয়ে যায়। মা আর কতই সহয্য করে। বকা দেওয়ার পরেও শ্রাবণ মায়ের বুকে ঘুমায় প্রতিদিন। কিন্তু সেদিন পেছন পাড়ার শাকিলের মা এসে, শ্রাবণের মাকে বিচার দেয় তার ছেলেকে শ্রাবণ মেরে নাক ফেঁটে দিয়েছে। আরো বলে শ্রাবণের আজ যদি কঠিন বিচার না হয় তাহলে এর বিচার আমরাই করবো। মা বললো ঠিক আছে ভাবী শ্রাবণ এলে আজ ওর কঠিন বিচার হবে। শ্রাবণ লুকিয়ে সব শুনেছে। তাই শ্রাবণ ওর বই গুলো জানালা দিয়ে রেখে পালিয়ে যায়। পেছন পাড়ার দিকে । মা ঘরে এসে দেখেন শ্রাবনের বই জানালার ধারে কিন্তু শ্রাবণ নেই। মা মনে করলেন হয়তো খেলতে গেছে। এদিকে সন্ধ্যা লেগে গেলো শ্রাবণ এখনো বাড়ি এলো না। মা শ্রাবণকে খুজতে শুরম্ন করলো । শ্রাবণ পেছন পাড়ার এক চাচার সাথে বাজারে গেছে এমনীতে। যাওয়ার সময় অবশ্য শ্রাবণ বলেছিলো সন্ধ্যার আগে আসতে হবে বাড়িতে। চাচা শ্রাবণের কথাই রাজি হয়েছিলো। অন্য একটা কাজের কারণে তাদের আসতে দেরি হয়। আসে তারা বাড়িতে রাত আটটায়। শ্রাবণ বাড়ির কাছে এসে ঐ চাচাকে বললো, চাচা মাকে বলে আমাকে একটু রেখে আসো না ? নইলে মা আমাকে মারবে। চাচা শ্রাবণের আকুতি মিনতি দেখে চাচা বললো, ঠিক আছে চল । তোর মাকে বলে তোকে রেখে আসি। শ্রাবণ আর চাচা এলো শ্রাবণদের বাড়িতে এসে দেখলো শ্রাবণের মা নেই শ্রাবণের খোজ করতেই বাহিরে গেছেন। শ্রাবণকে চাচা শ্রাবণের বাড়িতে রেখে তার বাড়িতে যাচ্ছেন,যেতেই শ্রাবণের মার সাথে দেখা হয় রাসত্মায়। চাচা বলার আগে মা বললো, ভাই শ্রাবণকে দেখেছেন ? চাচা বললো, শ্রাবনের মা, শ্রাবণ আমার সাথে বাজারে গিয়েছিলো ও এখন বাড়ি তবে ওকে কিছু যেন বলো না। ও ভয় পেয়েছে। মা বললো,ভাই বলেন তো ওকে নিয়ে আমি এখন কী করি ? শুধু মারামারি করে ছেলেদের সাথে, ভালো মত পড়তেও বসেনা। স্কুলের স্যাররা অভিযোগ ছাড়া ওর নামে ভালো কিছু কেউ বলেনা। চাচা বললো, শ্রাবণের মা মনে কিছু করো না আসলে ও ছোট্ট তাই হয়তো এমন করে বড় হলে ও ভালো হয়ে যাবে। আর একট কথা যদি পারো ওকে শহরে পাঠাও তোমার ভাইদের কাছে। হয় শ্রাবণকে স্কুলে পাঠাবে, নইলে কোন গ্যারেজে কাজ শিখবে। মা বললো, ভাই আমিও তাই ভাবছি। কিন্তু শ্রাবণ তো ছোট্ট কি ভাবে ও কাজ করবে ? চাচা বললো, পড়াশুনা তো করবেই কিছু তারপর বড় হলে কোন কাজ করবে। এতে তোমার কিছু হলেও কষ্ট কমে যাবে। মা বললো, ঠিক আছে ভাই আমি ভেবে দেখি কী করা যায়।চাচা চলে গেলেন মাও এলেন বাড়িতে। মাকে দেখেই শ্রাবণ বললো মা আর কোনদিন এই রকম হবেনা। মা বললো, ঠিক আছে ভাত খা সারাদিন কিছুই খাসনী। শ্রাবণ ভাত খেয়ে একটু পড়েই ঘুমাতে গেলো। মা শ্রাবণকে বুকে নিয়ে বললো, বাবা-রে তোকে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন  আশা আর তুই পড়াশুনা বাদ দিয়ে স্কুলে শুধু মারামারি করিস কেন ? তোকে যে বড় হতে হবে বাবা। আর মানুষ জনই বা কী বলে ? তোকে কত বকা দেয় তার সাথে আমাকেও। বাবা তোকে শহরে পাঠাবো তোর মামার বাসায় সেখানে থেকে পড়াশুনা করবি। শ্রাবণ মায়ের বুক থেকে মাথাটা তুলে বললো, মাগো সত্যি বলছো তুমি, আমি শহরে যাবো। মাগো আমার খুব ইচ্ছা হয় ঢাকা গিয়ে চিড়িয়াখানা দেখবো। মা বললো, শুধু চিড়িয়াখানা কেন ঢাকায় বড় বড় গাড়ি বাড়ি ইত্যাদি দেখতে পাবি। শ্রাবণ বললো, মাগো কবে যাবো ঢাকায় ? মা যেন শানত্ম হয়ে গেলো, কিছুড়্গন পর বললো, বাবারে তুই আমার কথা একবার ভাবলি না। আমি তোকে ছাড়া কিভাবে থাকবো। শ্রাবণ হেসেই বললো, কে বলেছে তুমি একা থাকবে। তুমি তো যাবেই কয়দিন পর শহরে। মাগো দেখো তুমি আমি আর গ্রামে আসবো না। কারো সাথে আর মারামারিও করবো না। মা শুধু শুনছে,হঠাৎ বললো, বাবা-রে এম করে বলতে নাই। শ্রাবণ বললো, বা-রে আমি তো সত্য কথাই বলছি। মা বললো, এখন ঘুমা কাল সকালে তোর মামার সাথে কথা বলে নেই তারপর একটা ব্যবস্থা হবেই। মার মুখে এই কথা শুনে ঘুমিয়ে যায় শ্রাবণ।

পরেরদিন ফোজরে, ঘুম থেকে উঠে শ্রাবণ নেই বিছানায়। শ্রাবণ প্রতিদিনের মত আজও গেছে রাসত্মায় হাঁটতে। শুধু রাস্থায় নয় বিভিন্ন ফল ফলানিত্মর গাছের নিছে ফল ও কুড়ায় শ্রাবণ। আজও আর মিস করলো না শ্রাবণ।  উঠার সাথে সাথেই বাড়িতে আসে শ্রাবণ এসে কিছুড়্গন পড়ে। তারপর,গোছল খাওয়া দাওয়া সেরে স্কুলে যাওয়ার সময় মাকে বললো, মা-গো মামার কাছে ফোন দিও আমি ঢাকা যাবো। মা বললো, ঠিক আছে, কারো সাথে মারামারি যেন করিসনা বাবা।শ্রাবণও বললো, মা-গো কেউ যদি মারামারি করে আমিও তাকে ছাড়বো না। এই বলে দৌড়ে যায় শ্রাবণ স্কুলে। স্কুলে গিয়ে দেখা হয় শ্রাবণের সাথে শাকিলের । শাকিলকে শ্রাবণ বললো, জানিস আমি না ঢাকায় যাবো, সেখানে গিয়ে চিড়িয়াখানা আরো অনেক কিছু দেখবো। ইত্যাদি।  শাকিল কথা বলছে না। কারণ কাল শাকিলকে শ্রাবণ মেরেছে। শ্রাবণ বললো, শাকিল আমি তো চলেই যাচ্ছি আর আসবোই না। চলনা আমরা খেলি শেষ খেলাটা। শাকিল রাগ ভাঙ্গিয়ে বললো, খতা দে আর আমাকে মারবী না ? শ্রাবণ বললো, ঠিক আছে কথা দিলাম আর তোকে মারবো না। অনেকড়্গন  খেললো ওরা, এখন ক্লাস বসার সময় হয়েছে তাই ওরা চলে গেলো ক্লাসে।

ক্লাসে স্যার এলেন, এসেই প্রতিদিন শ্রাবণের বিচার করেন। আজ আর কেউ অভিযোগ করলো না শ্রাবণের  নামে। স্যার নিজের থেকেই বললেন, আমি তো কিছুই বুঝছিনা,আজ কী সূর্য পশ্চিম দিকে উঠেছে নাকী। শ্রাবণের নামে কেউ অভিযোগ করছো না যে। সবাই চুপ কিছুড়্গন পর শাকিল বললো, স্যার শ্রাবণ ঢাকায় যাচ্ছে ওর মামার কাছে। শ্রাবণ ঢাকায় কোন স্কুলে পড়বে। স্যার বললো, কী-রে শ্রাবণ সত্য বলছে শাকিল। শ্রাবণ মাথা নাড়িয়ে বললো, হ্যাঁ স্যার শাকিল সত্য বলছে। স্যার বললেন, শ্রাবণ তোর মনটা উড়াল মন। সারাড়্গন তো ছুটাছুটি করিস। গাছে গাছে বেড়ে বেড়াস। সকাল হলেই যাস ফল গাছের নিচে  ফল কুরাতে। সেখানে তো এসব পাবিনা। পারবী এই সব ভুলে থাকতে। শ্রাবণ বললো, স্যার আমার যদি সেখানে ভালো না লাগে আমি আবার চলে আসবো। তাছাড়া আমি তো চিড়িয়াখানাটা আগে দেখবো। স্যার বললো, যদি ভালো ভাবে সেখানে পড়াশুনা করিস অনেক বড় হবি। খুব ভালো হবে। তুই যাবি যা তবে সেখানে পড়াশুনা করতে হবে। শ্রাবণ বললো, স্যার আমার জন্য দোয়া করিয়েন। আমি এতো দিন সত্যি অনেক ভুল করছি শুধু মারা-মারি ছাড়া কিছুই করতে পারিনী । সেখানে গিয়ে যেন ভালো মত পড়াশুনা করতে পারি। স্যার বললো, ঠিক আছে সাবধানে চলা ফিরা করবি ঢাকা শহরের কিন্তু রাসত্মা ঘাট ভালো না। শুধু যানযট। আজ পুরো ক্লাসই করলো শ্রাবণ। শ্রাবণ এলো বাড়িতে এসেই মাকে বললো, মা মামার কাছে ফোন দিয়েছিলে ? মা বললো, হ্যাঁ বাবা তোর মামা আজই আসছে। কাল তোকে নিয়ে যাবে। শ্রাবণ আনন্দে আলোকিত হলো। মাকে বললো,মা তুমি বলো তো তোমার জন্য কী নিয়ে আসবো ? মা বললো, কিছু আনা লাগবে না, তুই কী চাকুরী করতে যাচ্ছিস, তুই যাবি সেখানে পড়াশুনার জন্য। শ্রাবণ বললো, তা ঠিক কিন্তু আমি তবুও আনবো বড় হলে। মা বললো, তখনী বলবো। এখন যা ভালো কাপড় চোপড়  পড় তোর মামা আসছে। শ্রাবণ ঘরে গিয়ে নতুন জামা কাপড় পড়লো। শ্রাবণ ওর বাড়ির সবাইকে বললো,আমি ঢাকা শহরে যাচ্ছি। মামা আসছে। আমাকে নিতে। বাড়ির সবার মন খারাপ আসলে শ্রাবণ যতই দুষ্টু হকনা কেন শ্রাবণ ছিলো একটা ভালো ছেলে। শ্রাবণ ওর বন্ধুদের কেউ বলে এলো ও ঢাকায় যাচ্ছে লেখা পড়া করতে। সবার চোখে পানি এলোও শ্রাবনের মুখে মিষ্টি হাসি। শ্রাবণ বললো, তোরা আমার জন্য দোয়া করিস আমি যেন চিড়িয়াখানা দেখে আসতে পারি। আমি চিড়িয়াখানা দেখে এসে গল্প করবো কী কী দেখেছি । এই আশাতেই সবাই শ্রাবণকে বিদায় দিলো।

সন্ধ্যার সময় এলো মামা। শ্রাবণ রাতে মার সামানেই মামাকে বললো, মামা আপনার বাসা থেকে চিড়িয়াখানা কত দুর। মামা বললেন, মাত্র কয়েক পা যেতে হয়। শ্রাবণ বললো, মামা আমাকে চিড়িয়াখানা দেখাবেন। মামা বললো, শুধু চিড়িয়াখানা কেন ? অনেক কিছু দেখবী। শ্রাবণ অনেক আনন্দ নিয়েই ঘুমিয়েই পড়লো। রাতে মা মামাকে শ্রাবণের সমন্ধে সব বললেন । মামা বললো, বুবু ঐখানে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কোন চিনত্মা করোনা। তবে তোমাকেও কয়দিনের মধ্যে ঢাকায় নিয়ে যাবো। তোমাকে কিন্তু যেতেই হবে। তুমি আমার এখানে থাকবে। মা বললো, ঠিক আছে তবে শ্রাবণ কে নিয়ে যে আমার চিনত্মা হচ্ছে। মামা বললো, কোন চিনত্মা নেই। আমি আছি না। শ্রাবণ ঘুমাচ্ছে।

পরেরদিন সকালে, খাওয়া দাওয়া করে শ্রাবণ ওর মামার সাথে ঢাকায় যাওয়ার জন্য বেড় হলো। মা তাকিয়ে আছে দুর থেকে যতদুর পযনত্ম দেখা যায়। শ্রাবনের তেমন কিছু হলো না। কারণ তার মনটা তো উড়াল। ওর জীবনের প্রথম শহরে আশা।

রাতে মা অনেক কাঁদে কারণ তার ঘরটা এখন খালি। মা ভাবেন আমি তো কয়দিন পর যাবোই। এদিকে শ্রাবণ আর মামা এসে যান ঢাকায় সন্ধ্যার সময়। শ্রাবণ গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার সময় মামাকে হাজারো প্রশ্ন। এটা কোন জায়গা ওটা কী ইত্যাদি। মামাও উত্তর দেয় ।

শ্রাবণকে একা এক রম্নমে থাকতে হবে। মামা মামি অন্য রম্নমে। শ্রাবণ মামির সাথে অনেকড়্গন গল্প করলো। মামিকে বললো, মামি আমাকে চিড়িয়াখানা দেখাবেন। মামি বললো, হ্যাঁ দেখাবো তবে শনিবারে। বাবা আমি তো এখন সময় পাবোনা। অফিসে অনেক কাজ। আমি তোমাকে কথা দিলাম শনিবারে নিয়ে যাবো চিড়িয়াখানায়। শ্রাবণ হেসেই বললো, ঠিক আছে মামি। মামি বললো, আমিও ছোট্ট বেলায় চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিলাম। শ্রাবণ বললো, মামি কি কি দেখেছেন ? মামি বললো, বাঘ, বানর,সাপ হাজারো পাখি অনেক অনেক বড় বড় পশু পাখি। শ্রাবণ বললো, মামি বাঘ নাকি মানুষ খায় আপনাদের কোন সমস্যা হয়নী। মামি বললো, ওগুলো তো খাঁচায় বন্দি। খাবে কেন। তুমি শনিবারে ওখানে গেলেই বুঝবে আসলে কি। শ্রাবণ মনে মনে ভাবছে, আরো দুই দিন বাকি আছে শনিবার আসতে। এই দুইদিন বসে থেকে কী করবো। এই কথা ঐকথা ভাবতেই বললো,মামি চিড়িয়াখানা কোন দিকে। মামি বললো, কেন ছাদে উঠলেই তো দেখা যায়। তুমি একা যেন যেওনা। রাসত্মা পার হতে পারবেনা। শ্রাবণ বললো, ঠিক আছে আমি যাবোনা। মামি বললো, বাবা  শ্রাবণ এবার গিয়ে ঘুমাও। মামা এখনো আসেনী অফিস থেকে । শ্রাবণ ঘুমাতে গেলো এই মুহুতে মাকে মনে পড়লো। শ্রাবণ মনে মনে ভাবলো মাকে ছাড়া আমি তো থাকতে পারবো না। মা তো আসবেই আর যদি না আসে তাহলে আমি চলে যাবো। চিড়িয়াখানা দেখা হলেই আমি চলে যাবো। একা একা কিভাবে থাকবো আমি। শ্রাবণেই তার মনেকেই নানান প্রশ্ন করে। বলে কেমন করে থাকবো এই ঢাকা শহরে। যেখানে আমার মা নেই। আবার ভাবে মাতো আসবে। মা আসার আগে আমি চিড়িয়াখানা দেখে আসবো মার বুকে মাথা দিয়ে মার সাথে গল্প করবো,সারাটা রাত। এই সব ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

পরেরদিন সকালে, শ্রাবণকে মামা এসে শ্রাবণের রম্নমেই বলে গেলো মামা আমি চলে যাচ্ছি অফিসে। দুপুরে এসে তোমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে আসবো। এই কথা মামা বলতেই শ্রাবণ বললো, মা চিড়িয়াখানা কখন যাবেন ? মামা বললো, স্কুলে তোমাকে ভর্তি করে দিয়ে আসার সময় চিড়িয়াখানা দেধে নিয়ে আসবো। শ্রাবণ বেশ খুশি । মামি আর মামা বলে গেলো শ্রাবণ বাসার বাহিরে যেন যেওনা। শ্রাবণ মাথা নাড়িয়ে বললো, ঠিক আছে। মামা মামি দুজনেই গেলো অফিসে। এগারোটার সময় শ্রাবণ একা একা ঘরে বসে ভাবছে আমি আজ মামাকে বুঝাবো আমি গ্রামের ছেলে হলেও চিড়িয়াখানা একা গিয়ে দেখে এসেছি। শ্রাবণের মনের মধ্যে শুরম্ন হলো যুদ্ধ আসলে সে বাহিরে যাবে নে যাবে না। অবশেষে শ্রাবণ বাহিরে এলো। এসে এদিক ওদিক দেখছে সে এখন কী করবে। রাসত্মা পার হতে পারছে না। সে দেখতে পেলো একটা ছেলে রাসত্মা পার হলো। তাই শ্রাবণও পার হতে ধরলো ওমনী একটা গাড়ি এসে শ্রাবণ কে ধাক্কা দেয়। মাথা ফেটে যায় শ্রাবনের। লোকজন শ্রাবণকে ধরাধরি করে নিয়ে গেলো হাসপাতালে। মামা দুরে বাসা এলো এসে দেখলো শ্রাবণ নেই। মামা শ্রাবণ শ্রাবণ বলে ডাকছে, শ্রাবণ তো নেই। মামা বাসার বাহিরে এলো এসে দেখলো লোকজনার ভির। মামা একটা লোক কে বললো,ভাই এখানে কি হয়েছে ? লোকটা বললো, একটা ছেলে এগারোটার দিকে এখানে রাসত্মা পার হতেই গাড়ির সাথে ধাক্কা খায়। তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। মামার মাথা যেন ঘুরতে লাগলো। তারপর বললো,কোন হাসপাতালে ছেলেটাকে নিয়ে গেছে। লোকটা হাসপালের নাম বললো। মামা সেখানে গেলো গিয়ে দেখলো শ্রাবণ । শ্রাবণ কথা বলতে পারছে না। ডাক্তার বললো, ভাই ছেলেটা  আপনার কে হয়। মামা বললো, আমার ভাগিনা। ডাক্তার বললো, ছেলেটা শুধু মা মা বলে ডাকছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভাব ছেলেটার মাকে ডাকেন। নইলে সমস্যা হবে। মামা মামির কাছে ফোন দিলো মামি সঙ্গে সঙ্গে চলে এলেন হাসপাতালে । মামা শ্রাবণের মার কাছে ফোন দিলো। এই খবর শুনে মা অজ্ঞান অবস্থা। বাড়ির লোকজন মাকে সুস্থ করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। রাতে মা ঢাকায় আসে। এসে সোজা যায় হাসপাতালে । ডাক্তার মামা, মামি, মাকে, নিয়ে গেলো শ্রাবণের কাছে। শ্রাবণ মাকে দেখে ওর মুখের অক্সিজেনটা খুলে ফেলে। মা শ্রাবণের কাছে এসে ডুকরে কেদে উঠে। শ্রাবণ বললো, মাগো আমি বড় ভুল করেছি তোমার কোল ছেড়ে। মাগো আমি আর দেখতে পারলাম না চিড়িয়াখানা। মাগো আমাকে মাফ করে দাও। আমি চলে যাচ্ছি মা,আমি তোমাকে বলেছিলাম আর গ্রামে ফিরবো না। মাগো তাই বুঝি সত্যি হলো। মাগো গ্রামের সবাইকে বলিও আমাকে যেন মাফ করে দেয়। মাকে শ্রাবণ কোন কথা যেন বলতেই দেয়না তবুও মা বললো,বাবা এমন করছিস কেন ? শ্রাবণ উত্তর দিলো বললো মাগো বাবা ডাকছে মা। তুমি একটু এদিকে বসো তোমার কোলে মাথা রাখিবো। মায়ের কোলে মাথা দিতেই শ্রাবণ এই পৃথিবী থেকে চলে যায়। সবাই ডুকরে কেঁদে উঠে।

শ্রাবণকে তার গ্রামেই দাফন করা হলো। গ্রামের এমন কোন লোক নেই শ্রাবণের জন্য চোখের পানি ফেলিনী। মায়ের কান্না তো আজীবন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...