‘মাশরাফি, ক্যাপ্টেন অব এশিয়া কাপ’

ডেস্ক নিউজ :: পুরস্কার বিতরণী মঞ্চ থেকে নেমে এসে সিরিজ সেরা শেখর ধাওয়ান পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন ভগ্ন মনরথে দাঁড়িয়ে থাকা মুস্তাফিজুর রহমানের। লম্বা সময় কথা বলেছেন ম্যাচ সেরা লিটন দাসের সঙ্গেও। এই পুরোটা সময় দুবাই স্টেডিয়ামের সবুজ জমিনে বিষণ্ন মনে বসে ছিলেন মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।
বাংলাদেশের হয়ে ছয়টি ফাইনাল হারে গগণবিদারী হাহাকারের মূর্ত প্রতীক যে তারা দুই ভায়রা ভাই! কারণ দেশের আর কোনো ক্রিকেটারের এমন পাহাড়সম দুঃখ বয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা নেই।
ট্রফিতে চোখ থাকলেও এশিয়া কাপজুড়েই সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি ছিল বাংলাদেশ দল। দুই গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার তামিম-সাকিবকে হারানো ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা। চোটের মিছিলে জর্জর দলটাকে টেনে গেছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। যার নেতৃত্বগুণ আবারও প্রশসিংত হয়েছে এশিয়া কাপের মঞ্চে। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রমিজ রাজা তো সরাসরিই বলেছেন, মাশরাফি ইজ দ্যা ক্যাপ্টেন অব এশিয়া কাপ।
টুর্নামেন্ট জুড়ে অধিনায়কের মুন্সিয়ানা ছিল দুর্দান্ত। একের পর এক পরিণত সিদ্ধান্ত, সারপ্রাইজ প্যাকেজ নিয়ে হাজির হয়েছেন মাশরাফি। ফাইনালে যেমন মিরাজকে ওপেনিংয়ে পাঠানোর জুয়া খেলেছেন। সফলতাও মিলেছে হাতেনাতে। মিরাজ-লিটন গড়েছিলেন ১২০ রানের জুটি। যেখানে আগের পাঁচ ম্যাচে ওপেনিংয়ে সর্বোচ্চ ছিল ১৬ রানের যুগলবন্দি।
মাঠে-মাঠের বাইরে অনেক প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙে ফাইনালে উঠেছিল টাইগাররা। শেষ বিন্দুতে এসে শুধু শুক্রবারের ফাইনাল ম্যাচটা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের হারের বড় কারণ মিডল অর্ডারের অপ্রত্যাশিত ধস। ৩১ রানে পাঁচ উইকেট পতনের চাপেই বড় স্কোরের টার্গেট থেকে কক্ষচ্যুত হয় বাংলাদেশ। অথচ টুর্নামেন্ট জুড়ে এই মিঠুন-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরাই ছিলেন ব্যাটিংয়ে লড়াইয়ের মূল জ্বালানি।
আবার সেখানে আম্পায়ারদের বৈরিতাও অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে ‘অভাগা’ দল বাংলাদেশ। ২২ গজে বারবার খেলাটার শুদ্ধতার প্রতীক আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তের কোপানলে পুড়তে হয়েছে টাইগারদের। সেঞ্চুরিয়ান লিটন কুমার দাসের ‘বিতর্কিত’ আউটটা যার জলন্ত উদাহরণ।
ওই সময়ে তিন ধারাভাষ্যকারই বলেছিলেন সিদ্ধান্তটা খুব কাছাকাছি ছিল। ভারতীয় ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের অনুষ্ঠানে নিউজিল্যান্ডের ধারাভাষ্যকার সাইমন ডুল রাখ-ঢাক না রেখেই বলেছেন, বেনিফিট অব ডাউট লিটনেরই প্রাপ্য ছিল। সেটা না দেয়ায় ভারতের জয়ে কিছুটা কলঙ্কের ছাপ থেকেই গেল।
তিন দিক থেকে দেখেও থার্ড আম্পায়ার রড টাকার নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। একটি ক্যামেরায় পা ভেতরে মনে হচ্ছিল। আর দুটিতে অন দ্য লাইন দেখালেও তা পরিষ্কার ছিল না। তবে ক্রিকেটের নিয়মে অন দ্য লাইন আউট। স্পষ্ট হতে মিনিট তিনেকের চেষ্টায় ফোর-এক্স জুমিং লেন্সের সাহায্য নিয়েছিলেন রড টাকার। তারপরই দিয়েছেন বিস্ময়কর আউটের সিদ্ধান্ত।
অথচ ২০১৫ বিশ্বকাপে বাউন্ডারি লাইনে শেখর ধাওয়ানের ধরা ক্যাচ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল অত্যাধুনিক জুমিং লেন্স ব্যবহার না করায়। যে ক্যাচের বলি হয়ে ফিরেছিলেন সেট ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ। তিন বছর পর সেই জুমিং লেন্সের ব্যবহারেই ইনিংসের প্রাণভোমরা লিটনের উইকেট হারায় বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে ভারতের পক্ষপাতে সমালোচিত ছিল এসিসি (এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল)। শেষ বেলাতেও নিজেদের নগ্ন চেষ্টাকে সমন্বিত রাখলো এসিসি।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দিহান ছিল বাংলাদেশ শিবিরও। ম্যাচ শেষে লিটনের আউট নিয়ে মাশরাফি বলেছিলেন, ‘এটা তো আসলে বলা কঠিন। আমাদের কাছে এক সময় মনে হচ্ছিল আউট না বা এরকম। কিন্তু থার্ড আম্পায়ারই ভাল বলতে পারবে, কারণ সিদ্ধান্তটা তো তারই ছিল। এটা নিয়ে হয়ত পরে আলোচনা হবে।’
ফাইনালের বড় চাপের মঞ্চ বলেই কিনা ২২২ রানের পুঁজিতেও ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। বিশেষ করে পেস বোলাররা ভারতীয় ব্যাটিং লাইনকে কঠিন সময় উপহার দিয়েছে। স্পিনাররা একটু ফণা তুলতে পারলেই দৃশ্যপট বদলে যেতে পারতো।
ম্যাচ শেষে সেই আর্তি ফুটে উঠেছে মাশরাফির কণ্ঠেও। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের শুধু দরকার ছিল ১০টা ওভার বের করা ওইখানে। যেটা আমরা করতে পারছিলাম না ওইসময়। আমার মনে হয় অপু আরেকটু ভালো বল করতে পারত। যে কোনো স্পিনার যদি সাপোর্ট দিত আজকে (শুক্রবার) ম্যাচটা হয়ত কঠিন হতো না।’
তৃতীয়বার এশিয়া কাপের রানার্সআপ হলেও বাংলাদেশ দল নিয়ে গর্বিত কোচ স্টিভ রোডস। বারবার ফাইনাল হারাকে মানসিক বাধা বলছেন না তিনি। গতকাল দুবাই ছাড়ার আগে বড় ম্যাচে চাপে ভেঙে পড়া সম্পর্কে রোডস বলেছেন, ‘না, কখনোই এমন না। আমার মতে, তোমাদেরও ভাবা ঠিক না।
আমি নিশ্চিত, গোটা জাতি এটা উন্নতি হিসেবে দেখবে। আমরা ম্যাচটা খুব কাছাকাছি নিয়ে গেছি। এটা বড় দলের সঙ্গে সহজ নয়। র্যাংকিংয়ে ওরা আমাদের চেয়ে এগিয়ে। আমাদের উন্নতি করে যেতে হবে।
খেলোয়াড়রাও অভিজ্ঞতা পাবে। দুই-তিনজন নয়, আমাদের সব খেলোয়াড়ই। তখনই আমরা ফাইনাল জেতা শুরু করবো। আমাদের এরকম ফাইনালে যেতে থাকতে হবে। এটা শুধু সবার আরেকটু চেষ্টা, অভিজ্ঞতার বিষয় এখন।’
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বাসে তল্লাশির সময় পুলিশকে গুলি

স্টাফ রিপোর্টার :: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে সোহেল রানা নামে পুলিশের এক ...