মানুষের দিন কাটছে পুলিশ ও দালাল আতঙ্কে

ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার মানুষ দিন কাটাচ্ছেন পুলিশ ও দালাল আতঙ্কে।

পুলিশ সদস্য হত্যার পর দায়েরকৃত মামলায় অজ্ঞাত আসামীর তালিকায় ৬ হাজার ব্যক্তি থাকায় বাণিজ্যের আশায় সৃষ্টি হয়েছে সরকার দলের এই দালাল চক্র।

তারা গ্রামের নিরীহ মানুষদের ওই ৬ হাজারের মধ্যে ঢুকিয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। পুলিশও সচ্ছল ব্যক্তিদের আটক করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিচ্ছে, আর টাকা না দিলে ৬ হাজারের মধ্যের একজন মর্মে আদালতে চালান দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের বক্তব্য পুলিশের চেয়ে বর্তমানে বেশী সক্রিয় দালাল চক্র। যা গ্রামগঞ্জের মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

আর এই দালাল চক্রের ভয়ে পালিয়ে গেছেন হরিণাকুণ্ডু উপজেলার অসংখ্য মসজিদের ইমাম। এই উপজেলায় ২৮৫টি মসজিদ রয়েছে, যার মধ্যে ৭০ শতাংশের ইমাম বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। আসামী ধরার অজুহাতে বিভিন্ন মসজিদে হানা দেওয়ায় ইমামরা ভয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের নামে মামলা না থাকলেও তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। উপায় না পেয়ে ওই সকল মসজিদে নামাজ আদায় করাচ্ছেন অন্যরা। আরো রয়েছে ১৮ টি মাদ্রাসা। যাদের অধিকাংশ শিক্ষক বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

এছাড়াও উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ১৩০ টি গ্রামের মানুষের মধ্যে পুলিশী আতঙ্ক এতটাই বিরাজ করছে যে গ্রামগুলোর কোন পুরুষ মানুষ বাড়ি থাকতে পারছে না। গ্রামগুলো পুরুষ শুণ্য হয়ে পড়েছে।

যুবলীগ ছাত্রলীগের ক্যাডাররা বিএনপি-জামায়াত সমর্থকদের বাড়িতে হানা দিয়ে পুরুষ মানুষ পেলেই ধরে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছে। ফলে কোন পুরুষ মানুষই গ্রামে থাকতে পারছে না।

প্রসঙ্গত, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা পরিষদ বাউন্ডারির গলির ভেতর গত ৩ মার্চ জামায়াতের হরতাল চলাকালে একদল বিক্ষোভকারী পুলিশ কনস্টেবল গাজী ওমর ফারুককে কুপিয়ে হত্যা করে।

এ ঘটনায় হরিনাকুন্ডু থানার এস.আই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে ২শ’ জনের নাম উল্লেখসহ ৬ হাজার জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ এ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে অন্তত ৫৫ জনকে আটক করেছে।

যার মধ্যে ১৭ জন এজাহার ভুক্ত আসামী রয়েছে। বাকিরা গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ। তাদের অপরাধ তারা জামায়াত সমর্থক।

সরেজমিনে হরিণাকুন্ডু উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে পাওয়া গেছে অমানবিক সব কাহিনী। কাউকে খবর দিয়ে বাড়িতে ডেকে টাকা চাওয়া হয়েছে, টাকা না দিলে পুলিশ দিয়ে করা হয়েছে হয়রানী।

কাউকে পুলিশের হাতে তুলে দেবার পর টাকার দাবি করা হয়েছে। টাকা না দিলে পুলিশী হেফাজতে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। বাড়িতে হামলা করেও চালানো হচ্ছে নির্যাতন। পুলিশের পাশাপাশি সরকার দলের লোকজন দালাল সেজে মানুষের উপর নির্যাতন চালাচ্ছেন।

হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কাপাসহাটিয়া বটতলায় গিয়ে কথা হয় একজন ব্যবসায়ীর সাথে। যিনি নিজের পরিচয় গোপন করে জানান, তাদের বাজারে রথখোলা মসজিদ রয়েছে। যেখানে নামাজ পড়ান আব্দুস সালাম। কিন্তু স্থানীয় যুবলী-ছাত্রলীগের কতিপয় ক্যাডাররা তার কাছে পুলিশী ঝামেলা এড়াতে কিছু টাকা দাবি করেছেন। এই টাকা না দিতে পারলে তাকে মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে। যে কারণে তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

একই ভাবে পায়রাডাঙ্গা গ্রামের মসজিদে পুলিশ হানা দিয়েছে। যে কারলে ওই মসজিদের মুসল্লিদের মাঝেও আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসী। গাড়াবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে জানা যায়, সেখানকার মসজিদের ইমাম আশরাফুল ইসলাম স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাদের চাপে পালিয়ে গেছেন। ভালকী বাজারে গিয়ে কথা হয় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে। তাদের দাবি বাজারের দোকানগুলো ঠিকমতো খোলা যাচ্ছে না। পুলিশ দিনের বেলায় এসে হামলা করছে।

সাথে রয়েছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। যারা গ্রামের নিরীহ মানুষের তালিকা করে মামলায় জড়িয়ে দেবার ভয় দেখাচ্ছে। এ রকম ৪০ জন যুবক আছে যারা গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এই বাজারের ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ কর্মী লিটন মিয়া জানান, তাদের এলাকায় জামায়াতের সমর্থক বেশী। কিন্তু পুলিশের ভয়ে কেউ বাজারে আসতে পারছে না। চারাতলা বাজারের ফল ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমানকে স্থানীয় যুবলীগ ছাত্রলীগের সমর্থকরা পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেন। আতিয়ার রহমান বিএনপি সমর্থক। পরে তার কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

গ্রামগুলো ঘুরতে গিয়ে আরো জানা যায়, সরকার দলীয় লোকজন যারা পুলিশের দালালের ভূমিকা পালন করছেন তারা ইতোমধ্যে ভবানীপুর গ্রামের অর্ধশত, রামনগর গ্রামের ৪০ জন, কুলবাড়িয়া গ্রামের ৭০ জন, গোবিন্দপুর গ্রামের ৫৫ জন, ফলসি গ্রামের ৩০ জন, কাপাসহাটিয়া গ্রামের ৬০ জন, শিতলী গ্রামের ৪০ জন, বলরামপুর গ্রামের ৪০ জন, সিংগা গ্রামের ৫০ জরেন একটি তালিকা তৈরী করেছেন। এছাড়াও আরো তালিকা করছেন তারা।

যাদের পুলিশ হত্যার সাথে জড়িত বলে ধরিয়ে দেবার কথা বলা হচ্ছে। দালালরা ওই সকল ব্যক্তিদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে টাকা দাবি করছে। বলছে টাকা দিলে পুলিশের সাথে আলাপ করে ঠিক করে দেবেন, আর না দিলে পুলিশ হত্যায় হাজতে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। এভাবে ভয় দেখানো হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষের।

জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, হরতালে সহিংসতার অভিযোগে জেলার কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, হরিণাকুণ্ডু, শৈলকুপা ও সদর উপজেলায় ১৭টি মামলা হয়েছে।

এর মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলায় ৫টি মামলায় ৬৭০০, কোটচাঁদপুরে একটি মামলায় ৬২৫৫, মহেশপুরে ৫টি মামলায় ২১০০, হরিণাকুণ্ডুতে পুলিশ কনস্টেবল হত্যা সহ ২টি মামলায় ৬২৪০, শৈলকুপা থানায় পুলিশের গাড়ি পোড়ানো মামলায় ১২০০, সদর উপজেলায় ৩টি মামলায় ৪০০ জনকে আসামী করা হয়েছে।

এদিকে এসব মামলা দায়েরের পর থেকে পুলিশ পুরো জেলায় গণ গ্রেফতার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মহেশপুর উপজেলার খালিশপুর গ্রামের ইউসুফ আলী জানান, গত বৃহস্পতিবার ভোর রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য তার বাড়িতে প্রবেশ করে বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করে এবং তার দুই ছেলেকে আটক করে নিয়ে যায়।

হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে এক জামায়াত নেতাকে বাড়ি না পেয়ে তার স্ত্রীকে পিটিয়েছে পুলিশ। নিয়মিত পুলিশি অভিযানের মুখে সাধারণ মানুষ ও মামলার আসামিরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, এসব মামলায় পুলিশ সাধারণ মানুষকেও গ্রেফতার করে হয়রানি করছে। গ্রেফতারের পর অর্থবাণিজ্যের মাধ্যমে ছেড়েও দেয়া হচ্ছে।

এসব বিষয়ে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন জানান, গ্রেফতারদের মধ্যে নিরাপরাধ ব্যক্তি থাকলে যাচাই বাছাই করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ হয়রানি যাতে না হয় সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।

আহমেদ নাসিম আনসারী/

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ইনজেকশন দেয়া গরু চিনবেন যেভাবে

ষ্টাফ রিপোর্টার ::ঈদুল আজহার আর মাত্র ক’দিন বাকি। ঈদুল আজহা মূলত মহান ...