ভুলতে বসেছে বীরাঙ্গনা গুরুদাসীকে

তার স্ত্রী গুরুদাসী মন্ডলের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পড়ে পাক সেনাদের। নিজ স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে এগিয়ে এলে গুরুবদাসীর সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয় তার স্বামী, ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের মৃতদেহ বীভৎস করে দেয়া হয়।এরপর গুরুদাসীর কোলে থাকা দুধের শিশুকে মাতৃক্রোড় থেকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের সামনেই তাকে পুঁতে ফেলা হয় বাড়ির পাঁশে কাদা পানির ভেতরে। তারপর গুরুদাসীর ওপর হায়েনারা পাশবিক নির্যাতন শুরু করে।

খুলনামহানন্দ অধিকারী মিন্টু, পাইকগাছা প্রতিনিধি :: ১৯৭১ সাল। সারা দেশে যুদ্ধের ঘনঘটা। মুক্তিকামী নিরীহ বাঙালিদের ওপর চলছে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন। তাদের পাশবিক হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিশু, বৃদ্ধ, মহিলারাও।

বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রতিরোধ করতে শুরু করেছে কখনো সম্মুখ যুদ্ধ আবার কখনো গেরিলা যুদ্ধ।

এমনই এক পরিস্থিতিতে এক দিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর এদেশীয় রাজাকাররা হামলা চালায় খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটিয়া ইউনিয়নের ফুলবাড়ি গ্রামে।

ফুলবাড়ী গ্রামের গুরুপদ মন্ডল পেশায় দর্জি হলেও সবার কাছে ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র।

স্বাধীনতাকামী অত্যন্ত সহজ-সরল বিনয়ী একজন মানুষ। ২ ছেলে ২ মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ছিল তার সংসার। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সাধ্যমতো সব রকম সাহায্য-সহযোগিতা করতেন তিনি।

রাজাকারদের ইন্ধনে পাক বাহিনী তার বাড়িতে হামলা চালায়। একে একে পরিবারের সব সদস্যকে বাড়ির উঠানে জড়ো করা হয়।

তার স্ত্রী গুরুদাসী মন্ডলের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পড়ে পাক সেনাদের। নিজ স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে এগিয়ে এলে গুরুবদাসীর সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয় তার স্বামী, ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের মৃতদেহ বীভৎস করে দেয়া হয়।

এরপর গুরুদাসীর কোলে থাকা দুধের শিশুকে মাতৃক্রোড় থেকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের সামনেই তাকে পুঁতে ফেলা হয় বাড়ির পাঁশে কাদা পানির ভেতরে। তারপর গুরুদাসীর ওপর হায়েনারা পাশবিক নির্যাতন শুরু করে। পাক হানাদাররা চলে গেলে মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী গুরুদাসীকে উদ্ধার করে।

নিজ চোখের সামনে স্বামী, ছেলেমেয়ের মৃত্যু এবং পাক সেনাদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়ে গুরুদাসী ততক্ষণে পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা গুরুদাসীকে উদ্ধার করে তাদের হেফাজাতে রাখেন।

দেশ স্বাধীনের পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ্য হতে পারেননি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় উদবাস্তের মতো ঘুরে এক সময় ফিরে আসেন স্বামী-সন্তানের স্মৃতি বিজড়িত খুলনার পাইকগাছায়। দেশ স্বাধীনের পর গুরুদাসীর খবর আর কেউ রাখেনি।

মানসিক ভারসাম্যহীন গুরুদাসী ভিক্ষা করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যান। হাতে ছোট্ট লাঠি, মানুষকে হাসতে হাসতে ভয় দেখানো আর হাত পেতে ২ টাকা চেয়ে নেয়া-এভাবেই গুরুদাসীর দিন কাটতে থাকে।

গুরুদাসী হয়ে ওঠেন এলাকার সবার কাছের মানুষ, পরিচিত মুখ। কোথাও একদম বসতেন না তিনি। সারা দিন হাঁটাই ছিল তার কাজ। কখনো কখনো আনমনা হয়ে যেতেন। স্মৃতির পাতায় হারানো দিনগুলো খোঁজার চেষ্টা করতেন হয়তো বা।

তখন কেউ সামনে এলে জিজ্ঞাসা করতেন ‘কবে বিচার পাবেন’। সবার কাছে তিনি মাসি নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরে পাইকগাছা উপজেলার ততকালীন চেয়ারম্যান স ম বাবর আলী ও নির্বাহী কর্মকর্তা মিহির কান্তি মজুমদার কপিলমুনিতে সরকারি জায়গায় গুর্বদাসীর বসবাসের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করে দেন।

সেখানেই অনাদরে, অযত্নে, অভাবে দীর্ঘদিন পড়ে থাকেন তিনি। ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বর ভোররাতে নিজের শয়নকক্ষে তার মৃত দেহ পড়ে থাকতে দেখে পার্শ্ববর্তী লোকজন। গুরুদাসীর মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে আসেন মুক্তিযোদ্ধা, প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষ।

শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন গুরুদাসীর প্রতি। সরকারি তালিকায় নাম না থাকায় আর দশজন মানুষের মতো সাধারণভাবে সম্মান জানিয়ে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান করা হয়।

২০০৯ সালে ৮ ডিসেম্বর ৭১-এর বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে কোনো অনুষ্ঠান ছাড়াই নীরবে পেরিয়ে যায়। এ বছরও ঠিক একই অবস্থা।

একে একে পেরিয়ে যাচ্ছে ৬টি বছর। এ কয় বছরে মধ্যেই গুরুদাসীমাসিকে সবাই যেন ভুলতে বসেছে।

সরেজমিন রবিবার (৭ ডিসেম্বর) দেখা গেছে, গুরুদাসীর বসবাসের বাড়িটির চার পাশে মানুষ মল-মূত্রত্যাগ করছে। পাশে চলছে জুয়ার আসর। বাড়ীটিতে রাতে চলে অসামাজিক কার্যকলাপ। রাত-দিনে নেশাখোরদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে গঠণ করা হয়েছিল বীরাঙ্গনা গুরুদাসী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ। আর তার বসবাসের বাড়িটি স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার তৈরির ঘোষণা দেয়া হয় ওই সময়। আজ পর্যন্ত তার কোনো বাস্তবায়ন লক্ষ করা যায়নি।

অযত্নে আর অবহেলায় পড়ে আছে গুরুদাসী মাসির স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি। মুক্তিযোদ্ধা ও পুনরায় নির্বাচিত বর্তমান পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান স ম বাবর আলী জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুদাসীর অবদান চিন্তাকরা যায় না। আমিও দুখিত, আমারা তার স্মৃতির সাথে বেইমানী করছি। আজকের এই দিনটি (৮ ডিসেম্বর) ভালভাবে উদযাপিত হওয়া উচিত।

তিনি আরো জানান, বাধাবিপত্তি শর্তেও আগামী মার্চ মাসে জায়গাটা উদ্ধার করে পাঠাগার করা হবে। কপিলমুনি গুণিজন স্মৃতি সংসদের সভাপতি জানান, শুধু জীবিত বীরাঙ্গনা নয়, মৃতদেরকে রাষ্টীয় মর্যাদা দেওয়া হোক। মৃত গুরুদাসীকে রাষ্টিয় স্বীকৃতি দিয়ে গুরুদাসীর স্মৃতি রক্ষা করার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানান তিনি। এলাকাবাসী জানায়, একটি কুচক্রী মহল গুরুদাসীর বাড়িটি দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুদাসীর আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মাসির স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শিশু অধিকার বিষয়ক সংসদীয় ককাস’র সাথে এএসডির মতবিনিময়

শিশু অধিকার বিষয়ক সংসদীয় ককাস’র সাথে এএসডির মতবিনিময়

স্টাফ রিপোর্টার :: শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিশু অধিকার বিষয়ক সংসদীয় ককাস ...