বোষ্টনে প্রবাসীদের সাথে মতবিনিময় সভায় ভ্যালেরি টেইলর

বোষ্টনে প্রবাসীদের সাথে মতবিনিময় সভায় ভ্যালেরি টেইলরবাংলা প্রেস, নিউ ইয়র্ক থেকে :: প্রবাসীদের সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য আরো বেশি কাজ করবেন বলে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি’-এর পরিকল্পক ও প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি অ্যান টেইলর।
গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোষ্টনের সন্নিকটে বেডফোর্ডের একটি মিলনায়তনে আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব সিআরপি আয়োজিত প্রবাসীদের সাথে এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে বিপদ্গ্রস্থ ও বিকলাঙ্গ মানুষদের কল্যাণে প্রবাসীদের এগিয়ে আসারও আহবান জানান তিনি।
বোষ্টনের বিশিষ্ট আবাসন ব্যবসায়ী সৈয়দ নুরুজ্জামানের সভাপতিত্বে ও সাফোল্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাওদুদুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত আলোচনা সভায় বোষ্টন ও পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি শহর থেকে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ উপস্থিত হন।
সভায় ভ্যালেরি অ্যান টেইলরকে বাংলাদেশের মাদার তেরেসা বলে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, ভ্যালেরির কাজ দেখে মুগ্ধ হবেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।ঢাকার সাভারে অবস্থিত ‘সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড(সিআরপি) পরিদর্শন কিংবা ওয়েবসাইটে গিয়ে সিআরপি কর্মকান্ড দেখে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য প্রবাসীদের এগিয়ে আসার আহবান জানান বক্তারা।
ভ্যালেরি টেইলর বলেন, আপনাদের ভালবাসায় আমি বাংলাদশে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।আমার বাকি সময়টাও মানবসেবায় নিয়োজিত করবো।আপনারা আমাদের পাশে থেকে সহযোগিতা করবেন।
সৈয়দ নুরুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে আমি ঢাকা সাভারে গিয়ে সিআরপির কর্মকান্ড দেখতে গিয়েছিলাম। মানুষের সেবামূলক এসব কাজ দেখে আমি ভ্যালেরি টেইলরের এ কাজকে ভালবাসতে শুরু করি।সেই থেকেই তার সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। কারন পঙ্গু অসহায় ও বিকলাঙ্গ এসব মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারলে নিজের জীবনকে ধন্য মনে করবো। এসময় তিনি তার একক প্রচেষ্টায় দশ হাজার ডলার অনুদানের একটি চেক ভ্যালেরি টেইলরের হাতে তুলে দেন।
বোষ্টনে প্রবাসীদের সাথে মতবিনিময় সভায় ভ্যালেরি টেইলরএছাড়াও সভায় আগত অতিথিবৃন্দরাও স্ব স্ব অনুদান প্রদান করেন। সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)এর ডি-ল্যাব এর নির্বাহী পরিচালক বব নানেস, আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব সিআরপি ফিজিক্যাল থেরাপির প্রেসিডেন্ট ডা. হোসনে আরা বেগম, সাফোল্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাওদুদুর রহমান, সৈয়দ নুরুজ্জামান ও একে ওয়াহিদী প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ভ্যালেরি টেইলরের জন্ম, শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যুক্তরাজ্যের কেন্ট শহরে। ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪ সালে উইলিয়াম টেইলর এবং মেরি টেইলর দম্পত্তির সংসারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তরুণ বয়সে ১৯৬৯ সালে ভলান্ট্যারি সার্ভিস ওভারসীজ (ভিএসও) নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাজে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান: বাংলাদেশ) আসেন। উদ্দেশ্য ছিল ফিজিওথেরাপি প্রদান। তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের নিকটে অবস্থিত চন্দ্রঘোনা খ্রিস্টান হাসপাতালে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবা এবং সম্পূর্ণ আপন প্রচেষ্টায় একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তিনি বিশ্বে এক বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পুণরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তখনও যুদ্ধ শেষ হতে দুই মাস বাকি ছিল। এ সময় তাঁর কাজ আরও বেড়ে গিয়েছিল। কারণ যুদ্ধের কারণে পঙ্গুত্বের হার বেড়ে গিয়েছিল কয়েকগুণ। তিনি সফলভাবেই একাজ করতে সমর্থ হন। নয় মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পর তিনি আরও ২ বছর এদেশে থেকে তার কাজ চালিয়ে যান। ১৯৭৩ সালে আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। উদ্দেশ্য ছিল মানবসেবার লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশে একটি স্বার্থক ফিজিওথেরাপি সংগঠন তৈরির জন্য উপযুক্ত অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যের ব্যবস্থা করা। ১৯৭৫ সালে তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
দুঃস্থ, দূর্গত মানুষের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার পদকে ভূষিত করে। ১৯৯৬ সালে তিনি আর্থার আয়ার স্বর্ণপদক লাভ করেন। স্বাস্থ্যসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন।২০০৪ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়।
এছাড়াও, বেসরকারী হাউজিং প্রতিষ্ঠান শেলটেক (প্রাঃ) লিমিটেড কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ১৯৯৮ সাল থেকে প্রবর্তিত শেলটেক পদক, ২০১১-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন। মানবসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় সিআরপি’র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁকে এ পদক প্রদান করা হয়।একই কারণে রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্টের দি ওয়ান প্রজেক্ট কর্তৃক তাঁকে এক লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কারের ঘোষণা দেয়।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ট্রাম্পের সঙ্গে যৌন মিলন ছিল সবচেয়ে পানসে: স্টর্মি ড্যানিয়েলস

ডেস্ক রিপোর্ট :: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাটানো সময়ের বিস্ফোরক বর্ণনা ...