বিরিয়ানীর বক্সে নয়; বঙ্গবন্ধু যেন হৃদয়ের হয়…

বিরিয়ানীর বক্সে নয়; বঙ্গবন্ধু যেন হৃদয়ের হয়...মোমিন মেহেদী :: এবার জাতীয় শোক দিবসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে যারা ব্যবসা করে; তাদের অবস্থা ছিলো পোয়া বারো। যে কারনে নিন্মমানের কিছু রাজনীতিক বিরিয়ানীর বক্সে বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করেছে; বিলবোর্ডে ব্যবহার করেছে বঙ্গবন্ধুর ছবি।

একবারের জন্যেও ভাবেন নি এই তথাকথিত রাজনীতিকগণ যে, জাতির জনকের ব্যবহৃত বিরিয়ানীর বক্স বিরিয়ানী খাওয়ার পর নেতাকর্মীরা ময়লা বক্সে ছুড়ে ফেলবে। যা ভাবা উচিৎ ছিলো সবার আগে। আর এই ভাবনা যাদের মধ্যে নেই; তাদেরই এক বড় অংশ সহিংসতায় মেতেছে।

আজ যে কারনে দুই মন্ত্রীর সামনে ছাত্রলীগকর্মীদের হাতাহাতি মানেই সময় এসেছে সর্বকালের সর্বসেরা বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে কর্মীদের মাঝে পূর্ণজাগরণের। তা না হলে প্রতিনিয়ত খুন-ধর্ষণ-সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজীর রাজনীতিতে ধ্বংশ হয়ে যাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী ধারাগুলো।

আমাদের রাজনীতিকে কলঙ্কের রেখা এঁকে দিতে তৈরি আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্রলীগের পতন এতই ত্বরান্বিত হচ্ছে যে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের শোক দিবসের আলোচনা সভায় দুই মন্ত্রীর সামনেই হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রাজধানীর শহীদ বশির উদ্দীন মিলনায়তনে এ ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে ব্যাপক সমালোচিত সাইফুর রহমান সোহাগ বক্তৃতা শুরুর পর সূত্রাপুর থানা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে।

এ সময় মিলনায়তনে উচ্চবাচ্যের কারণে সাইফুর রহমান সোহাগ তার বক্তব্য বন্ধ রেখে স্লোগান শুররুকরেন। দীর্ঘসময় ধও েস্লাগান দেয়ার পরও ঘটনাস্থলের নেতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। এরপর মঞ্চ থেকে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এফ রহমান হল ছাত্র শিবিরের সভাপতি এস এম জাকির হোসাইন ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

কিন্তু তিনিও সেখানে গিয়ে সূত্রাপুর থানা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিবৃত করতে ব্যর্থ হন। শেষমেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্চে ফিরে গিয়ে পরিসি’তি শান- না হলে সূত্রাপুর থানা ছাত্রলীগের কমিটি আজই ভেঙে দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। তাতেও বন্ধ হয় নি দ্বন্দ-সংঘাত; বরং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম-এর কথা অমান্য করে চলে লোভিদের রাজনৈতিক অস্ফালন।

আর তার-ই সূত্র ধরে বলঅ যায় যে, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে সংঘাত-সংঘর্ষ ও একের পর এক খুনের ঘটনা এবং তা নিয়ন্ত্রণে বন্দুকযুদ্ধের নামে নেতাকর্মীদের হত্যার ঘটনায় সরকার ও দলে অস্বস্তি- অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

এই অস্থিরতায় অন্ধকার নেমে আসছে ছাত্র-যুব ও জনতার মধ্যে। বাড়ছে দ্রব্য মূল্য, বিদ্যুতের দাম, বাড়ছে ভোগান্তি। এই বাড়াবাড়ির রাজনীতিতে ক্রশ ফায়ারও বাড়ছে; বাড়ছে ছাত্র রাজনীতির নামে চাঁদাবাজী-সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে সংঘাত-সংঘর্ষ ও একের পর এক খুনের ঘটনায় সরকারে অসি’রতা দেখা দিয়েছে।

বেগতিক এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘অ্যাকশনে’ নামানো হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বরং তাতে সরকারের পাশাপাশি দলও বেসামাল হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিসি’তি নিয়ন্ত্রণে রাখার নামে সরকার ক্রসফায়ারের গল্প ফেঁদে একের পর এক নেতাকর্মী হত্যা করছে বলে দলের ভেতর থেকেই অভিযোগ উঠেছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও অনেকে এ ‘অ্যাকশন’ প্রক্রিয়ার জোরালো বিরোধিতা করেছেন। ফলে ঘরে-বাইরের চাপে সরকার এখন বিব্রত। অথচ কথিত ‘অ্যাকশনে’ না নেমে দলের ওপর নিয়ন্ত্রণহীন নেতাকর্মীদের লাগাম টেনে ধরা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল থেকে সর্বস্তরের কোন্দলের নেপথ্যে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সংসদ সদস্যরা জড়িত থাকায় ভিন্ন কোনো কৌশলে পরিসি’তি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয় বলে গোয়েন্দারাও সাফ জানান দিয়েছেন।

এ পরিস্থিতিতে সরকার ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ ফাঁদে পড়েছে। এদিকে সরকারের ‘অ্যাকশন’ পরিকল্পনায় মাঠপর্যায়ে তীব্র আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। ‘কখন কার ভাগ্যে কী জোটে’ এ আশঙ্কায় বেপরোয়া নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ নেতাকর্মীরাও গা-ঢাকা দিয়েছেন। এতে সাংগঠনিক কর্মকান্ড ঝিমিয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হয়ে উঠবে বলে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বিরোধী দল অনেকটা নিস্ক্রিয় থাকায় আর্থিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডে মাঠে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগই। তাই অনেক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারে। কেননা, আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে হত্যা নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা স্থাপনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ-বঙ্গবন্ধু-মওলানা ভাসানীর হাতে গড়া বাংলাদেশ।

সরকার ও দলের ভেতরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে গত ১ বছরে প্রায় অর্ধশত জন ক্রসফায়ারে মারা গেছেন, যাদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত ও এদের অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিগত মেয়াদের ৫ বছর ও চলতি মেয়াদের দেড় বছর সময়ের মধ্যে সংঘটিত ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তারা যতবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে তার দ্বিগুণেরও বেশি জড়িয়েছে নিজেদের মধ্যে।

ঘটনার পরম্পরায় দেখা গেছে বিরোধী পক্ষ যে সময় রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছে সেই সময়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে তুলনামূলক কম দ্বন্‌দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। অথচ বিরোধী দল মাঠে নিস্ক্রিয় হলেই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

এই হানাহানির রাজনীতির কারনে নতুন প্রজন্মের ৫ কোটি প্রতিনিধি তৈরি হচ্ছে নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য। যে অধিকার সংবিধান দিয়েছে; দিয়েছে বাংলাদেশ; সেই অধিকার আজ যখন তখন যে কেউ কেড়ে নিচ্ছে বলেই। নতুন প্রজন্মের প্রতিজন প্রতিনিধি দিন দিন নিবেদিত হয়ে এগিয়ে আসছে। অবশ্য সেই সূত্র ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘষের্র ঘটনা একটি জরিপ চালিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন- মানবাধিকার বাংলাদেশ।

মানবাধিকার সংগঠনটির চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসের (জানুয়ারি-জুন) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এ সময়ে প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনা ঘটেছে মোট ১১৬টি। এর মধ্যে অধিকাংশই ঘটেছে বিএনপি, জাপা ও আওয়ামী লীগের মধ্যে। এসব ঘটনায় ২৪ জন নিহত ও ১ হাজার ৪৮ জন আহত হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, গত দেড় মাসের ঘটনা আরো ভয়াবহ। আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন রাজনীতির মাঠে একেবারেই নিস্ক্রিয়। ফলে আওয়ামী লীগ এখন নিজেদের মধ্যে হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত রয়েছে। গত বছর ২০১৪ সালে ওই তিনটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সহিংস ঘটনা ১৯৭টি। এর মধ্যে ১৭১টিই ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।

এসব ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ও ২ হাজার ২০৬ জন আহত হন। একই সময়ে বিএনপির মধ্যে সংঘটিত সহিংস ঘটনা ২৫টি। এর মধ্যে ৫ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হন। আর সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পাটির্র মধ্যে ১টি সংঘষের্র ঘটনায় ৩০ জন আহত হন বলে আসকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একুশে আগস্ট ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম নিহত হয়েছেন।

এমনকি জাতীয় শোক দিবস; ১৫ আগস্ট কুষ্টিয়া সদরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের ভেতরে সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে গোলাগুলি ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে সেখানে সবুজ নামে আওয়ামী লীগের এক কর্মী নিহত হয়েছেন। এরও আগে ১০ জুলাই কুষ্টিয়া শহরতলির হরিশংকরপুরের নিজ বাড়ির সামনে থেকে নিজ দলের প্রতিপক্ষরা প্রকাশ্যে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা পিয়াসের ওপর গুলি চালায়।

এ ঘটনার পর ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২৩ জুলাই মারা যান তিনি। ১৩ আগস্ট রাতে রাজধানী বাড্ডায় আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কলহে ৩ জনের খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা শামসু মোল্লা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা মাহাবুবুর রহমান ও স্থানীয় একটি হাসপাতালের কর্মকর্তা রয়েছেন। গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনার মূল হোতা বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ফারুক মিলন ও থানা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক জুনায়েদ হোসেন জুয়েল। এভাবে জুয়েলদের মত অবিরত অসংখ্য নেতাকর্মী ঝরে যাচ্ছে; ঝরে যাচ্ছে ছাত্র-যুব রাজনীতিকগণ।

যদি এভাবেই বয়ে চলে মেঘনা; তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালনের জন্য আর কেউ থাকবে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন নিবেদিত তরুণ হিসেবে; নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে তৈরি নগণ্য কর্মী হিসেবে তাই বলবো, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নয়; যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শচ্যুত হয় প্রতিনিয়ত। যারা প্রকৃত বঙ্গবন্ধুর সৈনিক তারা অন্তত তাকে কখনোই বিরিয়ানীর বক্সে নিয়ে আসার পক্ষে থাকবে না; কখনো না। যারা বঙ্গবন্ধুকে বিক্রি করে বিলবোর্ড করবে না; বিরিয়ানী বক্সে তার ছবি ব্যবহার করবে না; অতি ভক্তি দেখাবে না; তাদেরকেই কাজে লাগিয়ে দিয়ে বয়ে আনতে হবে বাংলাদেশের সুদিন। তাতে করে তথাকথিত নয়; প্রকৃত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবে দেশকে।

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি

Email: mominmahadi@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...