বিখ্যাতদের দাম্পত্য জীবন- ৮: অ্যালবার্ট আইনস্টাইন

অ্যালবার্ট আইনস্টাইনসাইদুর রহমান  :: কথায় আছে, “যার নয়নে যারে লাগে ভালো, হোক না দেহ বরণ তার কালো” ৷ শুধু কালো হলে কোন সমস্যা ছিলো না ৷ কোমরের হাড়ে ও সমস্যা ছিলো বিধায় মেয়েটা হাঁটত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ৷ রূগ্ন শরীর, যক্ষ্মাভাবও ছিলো ৷ বেঁটে মেয়েটার প্রেমে পড়েছে তার চেয়ে বয়সে ছোট এক ছেলে ৷ এটা নিয়ে অসম্ভব মেধাবী, স্মার্ট ছেলেটার বন্ধুরা প্রায় সময় তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত ৷

ছেলের মা তো বলেই দিয়েছে, “তুই তোর ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিচ্ছিস ৷ কোনও ভদ্র পরিবার ওকে মেনে নেবে না ৷ তোর বয়স একুশ, আর ওর চব্বিশ । তোর যখন তিরিশ হবে ও তখন বুড়ি।” ছেলের বাবারও পছন্দ ছিলো না মেয়েটাকে ৷ শুধু যে নয়নে ভালো লেগেছিলো তা নয়, মেয়েটির অসাধারণ প্রতিভা মুগ্ধ করেছিলো ছেলেটিকে ৷ মেয়েটি গণিত ও পদার্থবিদ্যার মত কঠিন সাবজেক্ট একসঙ্গে পড়া ইউরোপের প্রথম নারী এবং ছেলেটির সহপাঠী ৷

পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবার কথা উপেক্ষা করে ছেলেটি ঠিকই ঘর বেঁধেছিলো মেয়েটির সাথে ৷ দু’টি সন্তানও জন্ম নিয়েছিলো তাদের ঘরে ৷ কিন্তু সে ভালেবাসার ঘরটাও টিকলো না ৷ ‘জঘন্য স্বামী’ হিসেবেই পরিচিত হতে হলো ছেলেটাকে ৷ ওয়াল্টার আইজ্যাকসন নামক একজন লেখকের লেখা “আইনস্টাইন : হিজ লাইফ অ্যান্ড ইউনিভার্স” বইটিতে পেশাগত সাফল্য ছাপিয়ে সবচেয়ে জঘন্য স্বামী হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে ৷ কি ঘটেছিলো তাদের দাম্পত্য জীবনে?

গণিত এবং পদার্থে ম্যালিভা ম্যারিসের যে অসাধারণ প্রতিভা দেখে আইনস্টাইন মুগ্ধ হয়েছিলেন, সে প্রতিভাই এক সময় কাল হয়ে দাঁড়ায় ম্যারিস-আইনস্টাইনের দাম্পত্য জীবনে ৷ ম্যারিস চাইতেন তিনি, স্বামীর সাথে গণিত এবং পদার্থ নিয়ে গবেষণা করবেন ৷

অন্যদিকে আর সব স্বামীর মতো আইনস্টাইনও চাইতেন, ম্যারিস তার ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন রাখবেন, তিন বেলা ঠিক সময়ে তার ঘরে তাকে খাবার পৌঁছে দেবেন, কাপড় ধুয়ে আয়রন (ইস্ত্রি) করে পরিপাটিভাবে সাজিয়ে রাখবেন, শোবার ঘর ও পড়ার ঘর ঝকঝকে রাখবেন ।

সৃজনশীল মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা সৃষ্টি জগতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রিয় মানুষদের সাথে তাদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় ৷ স্বামী কত বড় কাজের মধ্যে ডুবে আছেন, এটা না বোঝার মতো বুদ্ধির অভাব ম্যারিসের অন্তত ছিল না ৷ কিন্তু দাম্পত্য জীবনতো শুধু বুদ্ধি দিয়ে চলে না, চাওয়া- পাওয়া এবং আবেগেরও মূল্যায়ন করা লাগে ৷

একদিকে নিজের যোগ্যতানুযায়ী কাজ করতে না পারা, অন্যদিকে স্বামীর অনাদর- অবহেলা ক্রমেই মনমরা করে তুললো ম্যারিসকে ৷ ক্রমশ দু’জনের মাঝে বরফ জমে উঠছিলো ৷ হয়ত স্বামীর অবহেলার উচিৎ জবাব দেওয়ার জন্য, নতুবা একটু সুখের আশায় ম্যারিস পরকীয়াতে জড়িয়ে পড়েন ভ্লাদিমির ভারিচাক নামক এক অধ্যাপকের সঙ্গে ৷

আইনস্টাইনকে তখন দেশে দেশে ঘুরে বক্তৃতা করতে হচ্ছে আপেক্ষিকতা, মাধ্যাকর্ষণ, সৃষ্টিরহস্য নিয়ে ৷ এক কালে যে স্ত্রী, স্বামীর কাজে সাহায্যের জন্য জটিল জটিল গাণিতিক ফলাফল তৈরি করে দিতেন তিনিই তাঁর যুগান্তকারী বক্তৃতা সফর থেকে দূরে দূরে থাকছেন ৷ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার আকর্ষণে ভাটা পড়েছে । সম্পর্কের এই কঠিন সময়ে আইনস্টাইন নতুন করে প্রেমে পড়েন তিন বছরের বড় বিধবা চাচাত বোন এলিসার সঙ্গে ৷

দু’জনের সম্পর্ক যখন ভঙ্গুর অবস্থা তখন তাদের সম্পর্ক জোড়াতালি দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলেন ম্যারিস-আইনস্ট্যাইনের শুভাকাংখী বন্ধু রসায়নবিদ ফ্রিৎজ হাব ৷ কিন্তু আইনস্ট্যাইন এমন সব কঠিন শর্তারোপ করলেন যা, স্বাধীনচেতা ম্যারিসের পক্ষে মানা সম্ভব ছিলো না ৷ ফলে যা হবার তাই হলো, চার বছরের প্রেম ১১ বছরের দাম্পত্য জীবন শেষ হয়ে গেলো ১৫ মিনিটে ৷

আমরা মনে করি, ভালোবাসা মানে সুখ সুখ খেলা ৷ আসলে ভালোবাসা মানেতো সুখ সুখ খেলা নয়; ভালোবাসা হলো এক ধরনের খুনোখুনি ৷ যেখানে প্রতিদিনই আমাদের ইচ্ছগুলোকে খুন করতে হয় প্রিয় মানুষের হাতে ৷

আমরা যতই মুখে বলি, “আমি তোমাকে জীবনের চেয়েও বেশী ভালোবাসি”; বাস্তবতা হচ্ছে নিজের জীবনের চেয়ে আমরা কখনোই কাউকে বেশী ভালোবাসতে পারি না ৷ নিজের চেয়ে অন্যকে বেশী ভালোবাসতে পারি না বলেই, যখন প্রিয়জনের হাতে নিজের স্বপ্নগুলোকে খুন হতে দেখি তখনই আমরা বিদ্রোহী হয়ে উঠি ৷ বিদ্রোহ মানেই সংঘাত, সংঘর্ষ, যুদ্ধ ৷ আর যুদ্ধে জিতলেও হার, হারলে মরন ৷

ম্যারিসের বাকি জীবন কাটে নিঃসঙ্গভাবে, আর আইনস্ট্যাইন বিয়ে করেন এলিসাকে ৷ আইনস্ট্যাইন অবশ্য ঠকাননি ম্যারিস কে ৷ নোবেল পুরষ্কাররের প্রাপ্ত অর্থ হতে ৩২,২৫০ মার্কিন ডলার (তৎকালে অধ্যাপকদের বাৎসরিক আয়ের দশগুণ) দেন ম্যারিসকে ৷ ম্যারিস তা দিয়ে তিনটে বা়ড়ি কিনেছিলেন ৷

শুধু অর্থ, বাড়ি, সন্তান এসব কি স্বামীবিহীন একজন নারীকে সুখী করতে পারে? আইনস্ট্যাইনই বা কতটুকু সুখী হতে পেরেছিলেন এলিসাকে নিয়ে? কলম করে এক গাছে অন্য ফল ফলানো যায়, কিন্তু তার শিকড় কতটুকই বা মজবুত থাকে? একজনকে দেওয়া হৃদয়, অন্য হদয়ে বসতি গড়ে কতটুকু সুখী থাকে? যারা ১৫ বছরের হৃদয়ের সম্পর্ককে ১৫ মিনিটে কাগজে শেষ করে দেয়, প্রশ্নগুলোর উত্তর তারাই ভালো জানে ৷

লেখকঃ কলামিষ্ট

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

Tahmina Shilpi 01

আশ্রয় নয় নির্ভরতা চাই

আশ্রয় নয় নির্ভরতা চাই। না মানে ঠিক নির্ভরতা নয়, ভরসা চাই। না, ...