বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের গার্হস্থ্য ও বিজ্ঞান মেলা

রহিমা আক্তার মৌ :: আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। ওদের হাতেই আছে আমাদের ভবিষ্যৎ দেশের চাবিকাঠি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে কিছুটা অস্থির সময় পার করেছে কিছুদিন আগেও। সেই সব অস্থিরতা আর ক্ষনিকের সংকট কাটিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা তরুণ প্রাণের। চমকপ্রদ সব উদ্ভাবন নিয়ে হাজির স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।

১১আগষ্ট ২০১৬, রোজ বৃহস্পতিবার ক্ষুদে বিজ্ঞানী দের মিলন মেলা। অবাক হচ্ছেন, অবাক হওয়ার কিছুই নেই। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাজধানীর কেন্দ্র বিন্দু তেজগাঁও এলাকায় অবস্থিত বটমলী হোম বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এর বার্ষিক বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও গার্হস্থ্য মেলা। বিভিন্ন হস্তশিল্প, বিজ্ঞান ও কম্পিউটার প্রজেক্ট প্রদর্শন করছে। তার সাথে রয়েছে গার্হস্থ্য মেলা। বিজ্ঞান মেলায় তারা দেশের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান, সম্ভাবনা নিয়ে ধারণা দিয়ে যাচ্ছে।

বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের গার্হস্থ্য ও বিজ্ঞান মেলা আজের এই  বিজ্ঞান ও গার্হস্থ্য মেলার দিনে সরেজমিনে ঘুরে দেখতে আসে শহর ও আশেপাশের  ৮/৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে  শিক্ষার্থীদের। নানা ধরনের আবিষ্কারের বিভিন্ন তথ্য জানতে ভিড় করছে  শিশু ও কিশোরদের পাশাপাশি অভিভাবকরা।  উৎসাহিত করছেন ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের। রাজধানীর এই স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় রয়েছে এমন কিছু আয়োজন।

বিজ্ঞানের নানা খুঁটিনাটি জানতে দর্শনার্থীরাও ভিড় করেছে মেলায়। তরুণ চোখগুলোতে স্বপ্নের আনাগোনা। বিদ্যমান বিভিন্ন সংকট কাটিয়ে সম্ভাবনার পথে দেশকে এগিয়ে নিতে নানা পরিকল্পনা তৈরি করেছে এই তরুণ প্রাণ। আর এসব নিয়েই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন নিয়ে ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা হাজির হয়েছে বিজ্ঞান মেলায়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গুলশান থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ অমিদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফাদার থিওটোনিয়াস প্রশান্ত রিবেরু ও গুলশান থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (একাডেমিক সুপারভাইজার) মোছাঃ নাজমুন নাহার।

বিজ্ঞান মেলার সার্বিক সহযোগিতা ছিলেন,  বটমলী হোম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক  রাণী উবেলডিনা পালমা, স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকগণ, বিশেষ ভাবে মেরী লিন্ডা গমেজ সহ সব শিক্ষক শিক্ষীকাগন।

বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের গার্হস্থ্য ও বিজ্ঞান মেলা পুরো বিজ্ঞান ও গার্হস্থ্য মেলায় সর্বমোট ১৪০ টি প্রজেক্ট  থাকে। তার মাঝে ১০০ টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রজেক্ট , গার্হস্থ্য মেলার প্রজেক্ট  থাকে ৪০ টা।

গার্হস্থ্য মেলার এই ৪০ টার মাধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগে ২৩ টি আর হস্তশিল্পে ১৭ টি স্টল। গার্হস্থ্য মেলার ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা ” ক গ্রুপ” আর ৯ম,  ১০ম শিক্ষার্থীররা ” খ গ্রুপ “।

বাঙ্গালীর ভর্তা ভাত তার পাশাপাশি মোরগ পোলাও নিয়ে স্টল সাজিয়েছে ৭ম শ্রেণীর মাইশা, স্ক্যালি মিলরেড, অরিনি তেরেজা। ওদের প্রজেক্ট নং ২৩। তাদের আয়োজনে ছিলো হরেক রকমের ভর্তা, যেমন,,, কাঁচকলা, কালিজিরা, টকপাতা, ডিম, তিশি, সিম, পটল, বরবটি, ঢেঁড়স, পেপে, চিংড়ী, ও চ্যেপা ভর্তা। তার সাথে মোরগ পোলাও সালাদ।

১০ম শ্রেণীর জারিফা, লামিয়া, আবেদিন, তাকিয়া, রামিশা ওরা ৫ নং প্রজেক্ট সাজিয়েছে হরেক রকম সরবত দিয়ে। সরবতের মাঝে ছিলো আপেল, আম, কলা, পেয়ারা, চিড়া, আনার, তেতুল, মিল্কসেক, লাল আঙ্গুর, গুড়, লাচ্চি, বাঙ্গি, রুহ আফজা, ডাব ও লেবুর সরবত।

গার্হস্থ্য মেলার বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন মার্থা সুপ্রভা গুদা, দীপ্তি ক্লারা রড্রিকস,
সুনীতি হালিদার।

ক্লাসরুমকে ডিজিটালাইজড করার প্রজেক্ট সাজিয়ে এনেছে কেউ। কেউবা, রেলওয়ের লেভেল ক্রসিং নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে। কারো পরিকল্পনা, বায়োগ্যাস কিংবা উইন্ড মিল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের।

আয়োজকরা বললেন, নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী করতেই এই উদ্যোগ।

তাজরিন গার্মেন্টসের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের কথা চিন্তা করে আর রানা প্লাজার ধ্বসে পড়া এবং বিভিন্ন পোশাক কারখানাসমূহকে নিরাপদ করতে ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করে বিভিন্ন প্রজেক্ট। তাপ লাগলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইরেন বেজে খুলে যাবে দরজা।

বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের গার্হস্থ্য ও বিজ্ঞান মেলা চারুকারু মেলা ২০১৬ নামে প্রজেক্ট দিয়েছে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ফারিহা আহসান ( অভ্র ফারিহা), ইসরাত ফারাবী অর্পি, আলিয়া তাজিন, আস্থা সরকার, লামিয়া ইসলাম। ওদের প্রজেক্ট নং ১৩।

৮ম শ্রেনীর  অর্পা, সামারা, ছোঁয়া, ফাইজা, মৌরী, ওরা পাঁচ বন্ধু ৫ নং প্রজেক্ট নিয়ে বসেছে। ওদের প্রোজেক্ট এর নাম, ” লবণাক্ত পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন “।

৬ নং প্রজেক্ট সাজিয়ে বসে আছে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর অর্নপূর্ণা, প্রথমা, আদ্রিজা, সেতুবা, শ্রাবণী।  ওদের প্রজেক্ট এর নাম, “প্যারোমেন্ট ট্যাপ”।

আগ্নেয়গিরির প্রজেক্ট নিয়ে বসে আছে প্রৈতি, অর্থি, ঐশী, স্নেহা। ওরা সবাই ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। তাদের প্রজেক্ট নং ১।

ডিজিটাল বাসস্থান এর প্রজেক্ট নিয়ে স্টল সাজিয়েছে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর মৌমিতা ও জেবা। তাদের প্রজেক্ট নাম্বার ৩ (তিন)।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলার ১০০ টি প্রজেক্টের শিক্ষার্থীদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। ক গ্রুপ, খ গ্রুপ, গ গ্রুপ।
ক গ্রুপ এ থাকে ৪র্থ, ৫ম শ্রেণী, খ গ্রুপ এ থাকে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী, আর গ গ্রুপ এর হয়ে অংশ নেয় ৯ম ও ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা।

ক গ্রুপ এর বিচারকের দায়িত্বে থাকেন শিউলি দিদি, লিজা দিদি।

খ গ্রুপ এর বিচারকের দায়িত্বে থাকেন মাসুদা পারভীন, ( তেজগাঁও সরকারী বালিকা বিদ্যালয়)।
আবদুস সামাদ, ( তেজগাঁও মডেল স্কুল)।

গ গ্রুপ এর বিচারকের দায়িত্বে থাকেন রওশন আরা বেগম,( তেজগাঁও সরকারী বালিকা বিদ্যালয়) ও পারভীন সুলতানা ( তেজগাঁও সরকারী বালিকা বিদ্যালয়)।

eco cooler এর প্রোজেক্ট নিয়ে বসেছে ৫ম শ্রেণীর আয়শা ছিদ্দিক, আফিয়াহ তাসনিম হক, ফাবিহা ফারিহা আকন্দ ডল, মাইমুনা আরা রাত্রি, নাফিসা নাওয়ার।

প্রজেক্ট এর মধ্যে ছিলো, ঝুলন্ত সেতু, ডিজিটাল বাংলাদেশ,কম খরচে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, Recycle,ডিজিটাল গ্রাম, হাতের তৈরি শিল্প কর্ম, হস্তশিল্প,ভূমিকম্প সহনীয় স্থাপনার উপযুক্ত নকশা এবং একটি উপযুক্ত মডেল শহর, সিকিউরিটি এলার্ম, সৌরজগত, নবায়ন যোগ্য উৎস, পানির মাঝে মোমবাতি জ্বালানো, জাদুর ডিম, রিসাইকেলিং প্রক্রিয়া, আলো সরল পথে চলে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান, সোলার ওভেন ঘরে বসেই লিপিস্টিক তৈরি, বীজ ছাড়া যে গাছ জন্মায় ইত্যাদি।

ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের ব্যতিক্রমধর্মী উদ্ভাবনে দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধনের সময় প্রধান শিক্ষীকা তার বক্তব্যে  বলেন, আমাদের ক্ষুুদে বিজ্ঞানীরা তাদের মেধা, মনন ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় এ বিশ্বকে আলোকিত করবে বলে আশাপ্রকাশ করেন। এসময় তিনি আরো বলেন, আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতীয়মান হয় সমাজের একটি বিরাট অংশ অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও পশ্চাদপদ চিন্তা-চেতনায় আছন্ন। বিজ্ঞান শিক্ষা শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী হতে শেখায় অন্ধকার থেকে আলোর পথে এবং জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলে। তাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান মনস্ক হয়ে গড়ে ওঠার লক্ষ্যে বিজ্ঞান মেলা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি প্রতিবছর এ স্কুলে বিজ্ঞান মেলা আয়োজনের পাশাপাশি মেলার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারীকে  পুরস্কারে ভূষিত করেন।

লেখক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক কলামিস্ট। ইমেইল: somsrahima@yahoo.com

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ডে-কেয়ার আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে: চুমকি

ডে-কেয়ার আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে: চুমকি

স্টাফ রিপোর্টার :: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি ...