বাংলার মুখ-বাংলার সুরে নতুন প্রজন্মের রঙিন স্বপ্নযাত্রা

বিজয়ের আহবানে নতুনের জয়গানে জেগে ওঠো বাংলাদেশ/ তোমায় নিয়ে যাই এগিয়ে নিরন্তরের স্বপ্ন মনে চাই অশেষ/ তুমি আমার বাংলাদেশ/ তুমি আমার প্রিয় দেশ…

ঠিক এমনটাই ভাবনা হয়ে আছে আমাদের মনে। আর তাই এগিয়ে যাই একের পর এক সাফল্যেও সন্ধানে। সেই সন্ধানের রাস্তায় এগিয়ে যেতে যেতে আমরা পেয়েছি গিনেস বুকে ঠাঁই। বিশ্বজয়ের মানব পতাকায় ২৭ হাজার মুখ খুলে দিয়েছে সেই সম্ভাবনার দুয়ার। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের রাজধানী শেরেবাংলানগরের প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭ হাজার ১১৭ জন কিশোর-তরুণ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব-পতাকা তৈরি করেন। নতুন প্রজন্ম সেই সুন্দরের কারিগর। এই কারিগরেরা এখন শুধু গিনেস বুকে নাম এসেছে বলেই আনন্দ করবে না। তারা দেশকে, দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিবেদিত হবে বলে স্বপ্ন দেখি-স্বপ্ন লেখি। এই স্বপ্ন নতুন করে বাঁচার। যাতে আর কোন স্কুল ফেরৎ তন্বীর চোখে বোমার স্প্রিন্টার না বিঁধে। যেন আর কোন স্বপ্নচারি বালকের হাত উড়ে না যায় ঘাতকের বোমায়, যেন আর কোন পথকলির প্রাণ নিতে পারে পুলিশের বুলেট। সেই লড়্গ্যে জেগে উঠবে বাংলাদেশ-বাংলাদেশের প্রতিটি ফুল-প্রতিটি কলি-প্রতিটি চাঁদ, প্রতিটি হাট্টিমা টিম টিম…

কেননা, নতুন প্রজন্ম যে জাতিকে কতটা ভালোবাসে তাঁর প্রমাণ দিতে তারা তৈরি। আর তার প্রমাণ দিতে বিজয় দিবসের মধ্যাহ্নে লাল আর সবুজ বোর্ড মাথার ওপর তুলে ধরল ২৭ হাজার ১১৭ জন কিশোর তরুণ, শেরেবাংলা নগরের প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে সূর্যের দিকে মুখ তুলে হাসল বাংলাদেশের পতাকা। ৪২ বছর আগে যে দিনটিতে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় পেয়েছিল, সেই দিনটিতে আরো এক বিজয়ের জন্য এই আয়োজন। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অনুমোদিত পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড়’ মানব-পতাকা তৈরির এ আয়োজন নতুন স্বপ্ন বুনে দিলো বাঙালির মনে। আর তাদেরকে কোন রকম নিরম্নৎসাহিত না করে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে তৈরি ‘লাল-সবুজের বিশ্বজয়’ শিরোনামে এ আয়োজনের সার্বিক সহযোগিতার সেতুবন্ধন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গিনেসের সব নিয়ম মেনে সুষ্ঠুভাবে মানব পতাকা তৈরি হলো কিনা, তার প্রমাণ হিসেবে তথ্য ও ছবি পাঠাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত অডিট প্রতিষ্ঠান। নতুন রেকর্ড হলে গিনেস কর্তৃপক্ষই সে ঘোষণা দেবে। সশস্ত্রবাহিনীর আট হাজার সদস্যের সহযোগিতায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে এই মানবপতাকা তৈরি শুরু হয় সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী। কয়েক দফা মহড়ার পর বেলা ১টা ৩৬ মিনিটে শুরু হয় চূড়ান্ত চেষ্টা। লাল-সবুজের টুকরোগুলো ছয় মিনিট ১৬ সেকেন্ড মাথার ওপর তুলে রাখে স্বেচ্ছাসেবীরা। এ সময় মঞ্চ থেকে বেজে ওঠে গান- ‘বিজয়-নিশান উড়ছে ওই’। আর এর মধ্যে দিয়েই তৈরি হয় ‘লাল-সবুজের বিশ্বজয়ের’ মঞ্চ। গিনেস বুকে এর আগের রেকর্ডটি পাকিস্তানের। গত বছর অক্টোবরে লাহোর হকি স্টেডিয়ামে ওই মানব-পতাকার অংশ হয়েছিলেন ২৪ হাজার পাকিস্তানি। এর আগে ২০০৭ সালে হংকংয়ের ২১ হাজার ৭২৬ জন নাগরিক মানব-পতাকা গড়েন। সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীর মত করে বলতে চাই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানব-পতাকা তৈরির মাধ্যমে বিশ্বের কাছে আমাদের জাতীয় ঐক্য তুলে ধরার এ চেষ্টা আলোর মুখ দেখবেই। একই সাথে লাখো কণ্ঠে আমার সোনার বাংলা গাওয়ার জন্যও নিবেদিত তরম্নণরা দেশকে কোন বর্গী বা হয়েনার হাতে তুলে দিতে নারাজ বলেই প্রমাণ দিলো। বিয়ালিস্নশ বছর আগে যে মুহূর্তে যে স্থানটিতে বাঙালির মুক্তির সনদ লেখা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সেই ক্ষণে সেই স্বাধীনতা উদ্যানেই লাখো কণ্ঠ গাইল ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটিই একাত্তরের রণাঙ্গনে বাঙালি জাতিকে প্রেরণা জুগিয়েছিল, যা পরে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থাপিত ‘বিজয় ২০১৩’র মঞ্চে এই গানে কণ্ঠ মেলান উপস্থিত জনতা। ইতিহাস বলে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৩১ ধিমনিটে পাকিস্তানি বাহিনী এই উদ্যানেই আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেছিল, তখন এর নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান।

ঠিক যেভাবে বাংলাদেশের লাখো জনতা তৈরি ছিলো বাংলার মুখ দেখানোর জন্য বিশ্বকে, যেভাবে বাংলাদেশের সুর শোনানোর জন্য নিবেদিত ছিলো বিশ্বকে; ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম ঐক্যবদ্ধ হবে বাংলাদেশকে বাঁচাতে-রড়্গা করতে। কেননা, তাদের কাছে যে ইতিহাস আছে; সে ইতিহাসে লেখা আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাদের মত ৭ বছর, ৮ বছর, ৯ বছর, ১০ বছর, ১১ বছর, ১২ বছর ১৩ থেকে ২৩ অথবা তারও বেশি বয়সের নতুন প্রজন্ম অংশ নিয়েছিলো। নির্ভয়ে জয়ের জন্য নিবেদিত থেকে বিভিন্নভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে তারা যেমন নিবেদিত ছিলেন একইভাবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রাখতে তৈরি হবে-লড়ে যাবে বীরের লড়াই। গড়ে যাবে বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস; সেই প্রত্যয়ে পথ চেয়ে আছে আছে ষোল কোটি চোখ…

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শিক্ষা উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

শিক্ষা উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

নজরুল ইসলাম তোফা:: শিক্ষা বা জ্ঞানই মানুষের জীবন ধারণ ও উন্নতির জন্যে ...