ব্রেকিং নিউজ

বাংলাদেশের সামাজিক উদ্যোগ বিশ্বসেরা!

মেহেদী হাসান রবিনসোহানুর রহমান :: বিশ্ব জুড়ে যুবদের গৃহীত বিভিন্ন জনপ্রিয় ও কার্যকরী সামাজিক উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ব্রিটিশ কাউন্সিল। অ্যাকটিভ সিটিজেন্স প্রোগ্রামের আওতায় বিশ্বের ৬৮ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের যুব-নেতৃত্বের উদ্যোগ ‘সেইভ পিরিয়ড’ প্রথম হয়েছে। সারা জাগানো প্রকল্পটির অন্যতম উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন-র্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রবিন গত ২৪ সেপ্টেম্বর লন্ডনে এ সম্মানজনক পুরষ্কার গ্রহণ করেন।

মেহেদী হাসান রবিন

‘সেইভ পিরিয়ড’ কি এবং কেন?
নারীদেহের একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ার নাম পিরিয়ড। প্রজনন সম্পর্কিত এ প্রক্রিয়াটি প্রতি মাসে ঘটে বলে বাংলায় সচরাচর এটিকে মাসিক বলে ডাকা হয়। বিষয়টি গর্বের হলেও পিরিয়ডের মত একটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক বিষয় নিয়ে সমাজে রয়েছে বিস-র লুকোচুরি। পিরিয়ড, মেনস্টুয়েশন বা মাসিক-এই শব্দগুলো জনসম্মুখে উচ্চারণ করতে বেশির ভাগ মেয়েরই এখনো লজ্জা আর সংকোচ বোধ করেন। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) তথ্যানুযায়ী, জীবনের প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতা অনেক মেয়ের কাছেই ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা। কারন এ বিষয়ে তাদের কাছে কোন ধরনের তথ্য থাকে না। এবং মায়েরা পর্যন্ত নিজ কন্যা সন্তানের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেন না। পরিবারের অন্য সদস্য, বিদ্যালয় বা অন্য কেউ তো দূরের কথা, মায়েরা পর্যন্ত মাসিক নিয়ে কথা বলেন না মেয়ের সঙ্গে। কিন্তু এ সময়ে যে মেয়েদের পরিচর্যা, যত্ন, পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন সেটি পরিবার জানেও না। সমাজে এখনও বিষয়টি একটি অচ্ছ্যুৎ বিষয়। এই সামাজিক ট্যাবুটি পুষে না রেখে বিষয়টি নিয়ে গ্রামাঞ্চলের নিন্ম-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য ও কিশোরীদের সাথে খোলামেলা আলোচনা আর সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে কিশোরীদের সুরক্ষিত করতে একদল প্রশিক্ষিত তরুণদের সামাজিক উদ্যোগের নাম ‘সেইভ পিরিয়ড’। নীরবতা ভেঙ্গে আওয়াজ তুলতে গৃহীত উদ্যোগটি যেমন দেশের ভিতর হয়েছে জনপ্রিয় তেমনি জাতি-রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে জিতে নিয়েছে আন-র্জাতিক সেরা উদ্যোগের স্বীকৃতি।

মেহেদী হাসান রবিন

যেভাবে যাত্রা শুরু
শুরুর গল্পটা একটু বলা যাক। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় ঢাকায় অ্যাকটিভ সিটিজেন্স ইয়ুথ লিডারশীপ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডেমোক্রেসি ওয়াচ। সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে স্বেচ্ছসেবায় আগ্রহী তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদেরকে স্থানীয়ভাবে এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বিশ্বব্যাপি সংযুক্ত করার একটা সুযোগ করে দেয়াই এ প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

৪ দিনব্যাপি প্রশিক্ষণের শেষ দিনে ৩২ জন অংশগ্রহণকারী সবাই একটি করে সমস্যা সমাধানে আইডিয়া তুলে ধরে এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে অন্যতম সমাজিক উদ্যোগ হিসেবে নির্বাচিত হয় ‘সেভ পিরিয়ড’। এই উদ্যোগটির মাধ্যমে ঢাকার দুটি স্কুলের ১৬৮২ জন কিশোরী এবং তাদেও কাছেপিঠের মানুষজনকে সচেতন করা হয়েছে। ওয়ার্কশপের পাশাপাশি ছিল আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মেয়েদের জন্য বিনামুল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ কর্মসূচিও। মেয়েদের মাসিক বিষয়ে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে ট্যাবুটা ভাঙ্গার উদ্যোক্তা ফাতেমা, জুই, ইমরুল, হাফিজা, তুহিন, নাজনীন আর রবিনরা তখনও কি জানত তাদের এই সেভ পিরিয়ড’ সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে একদিন বিশ্বজয় করে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে!

ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশেশের হেড অব সোসাইটি তৌফিক হাসান জানালেন, অ্যাকটিভ সিটিজেন্স প্রশিক্ষণ একজন তরুণের মাঝে আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মপোলবদ্ধির সঞ্চার করে। যার প্রেষণাই তাকে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় ভাবে সম্পৃক্ত এবং বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত করে থাকে। বিশ্বের ৬৮ টি দেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় এই প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ২৭ হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণী অ্যাকটিভ সিটিজেন ইয়ুথ লিডারশিপ ট্রেনিংয়ে অংশ নিয়েছেন।

মেহেদী হাসান রবিনবিশ্বসেরা উদ্যোগের স্বীকৃতি
প্রশিক্ষিত তরুণদেও গৃহীত সেরা উদ্যোহুলোকে স্বীকৃতি দিতে সমপ্রতি ব্রিটিশ কাউন্সিল অ্যাকটিভ সিটিজেনস সোশ্যাল অ্যাকশন প্রজেক্ট কম্পিটিশন ২০১৮ নামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। যেখানে গোটা বিশ্ব থেকে জমা পড়া অসংখ্য আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে মাত্র ৫টি সামাজিক উদ্যোগ প্রকল্পকে বাছাই করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাইনাল ভোটাভোটির জন্য পাঠানো হয়।

অ্যাকটিভ সিটিজেনের গ্লোবাল ফেসবুক পেইজ থেকে প্রকাশিত ৫ টি প্রকল্পের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, আলবেনিয়া এবং পাকিস্তানকে পিছনে ফেলে বাংলাদেশের সামাজিক উদ্যোগ সেভ পিরিয়ড সর্বাধিক ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। এই পুরষ্কার অর্জনের অংশ হিসেবে প্রকল্পটির অন্যতম উদোক্তা মেহেদী হাসান রবিন যুক্তরাজ্যেও লন্ডনে অবস্থিত ব্রিটিশ কাউন্সিল হডকোয়ার্টারে অ্যাকটিভ সিটিজেনসের গ্লোবাল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ এবং বিশ্বমঞ্চে এ সামাজিক উদ্যোগটি উপস্থাপনের সুযোগ লাভ করেন।

এরকম গ্লোবাল ইভেন্টগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তরুণ স্বোচ্ছাব্রতীদের গৃহীত উদ্যোগের শিখন বিনিময় এবং নেটওর্য়াকিং তৈরি করা। কেমন ছিল সেই দিনটি? জানতে চাইলে রবিন বলেন, ‘গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে গিয়ে নিজের উদ্যোগ এবং দেশকে উপস্থাপন করতে পারা নিঃসন্দেহে আমার জন্য অনেক বড় একটি সুযোগ ও গর্বেও বিষয়। প্রথমেতো বিশ্বাসই হচ্ছিল না পুরো ব্যপারটা। এতো দ্রুতই সবকিছু হয়ে গেলো বুঝেই উঠতে পারিনি। স্বপ্নের মতো ঘটে যাচ্ছিল সব। তিনদিনের প্রোগ্রামে লন্ডনে গিয়েছিলাম যেখানে আমি ছাড়াও আরো ১৫টি দেশ থেকে ৫০ জন তরুণ অংশ নিয়েছিল। প্রথম দুদিন আমাদের অরিয়েন্টেশন ও প্রস্তুতির মধ্যে দিয়ে কেটে গেলো। তৃতীয় দিনে এলো সেই কাঙ্খিত মাহেন্দ্রক্ষন। যখন আমি আমাদের সামাজিক উদ্যোগ প্রকল্পটি (স্যাপ) উপস্থাপন করতে যাব তখন পিনপতন নীরবতায় আমার খানিকটা ভয় ভয় লাগছিল। মিথ্যে বলব না, পুরো হলরুম ভর্তি বিভিন্ন দেশের মানুষ দেখে বুক কিছুটা দুরুদুরু করছিল এই ভেবে যে, আমি পারব তো দেশের মান রাখতে? নিজেকেই নিজে সাহস দিয়ে মনে মনে বললাম, রবিন তুই পারবি, তুই-ই আজকে বাংলাদেশ! নিজেকে নিজের দেয়া সাহসে কাজ হল কিনা জানিনা তবে যখন আমার দেয়া প্রেজেন্টেসনের পর সর্বাধিক সময় ধরে চলা মুর্হুমুর্হু করতালির শব্দ শুনে স্বসি- পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, যাক দেশের মানটা ভাল ভাবেই রাখতে পেরেছি। ঐ সময়ের অনুভুতিটা বলে বোঝান সম্ভব নয়’।

রবিন আরো বলেন, ‘আমাদের প্রেজেন্টেসনের পর পাশেই স্টলের ব্যবস্থা ছিল যাতে আমরা বিশদভাবে একে অপরের উদ্যোগ সর্ম্পকে জানতে পারি। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা আমার স্টলে হুমড়ি খেয়ে পরছিলেন আর আমাদেও সফলতার খুঁটিনাটি বিষয়ে আগ্রহভরে জানতে চাচ্ছিলেন। আমাদের সেভ পরিয়িড উদ্যোগটা যে কতটা কার্যকরী ঠিক তখন বুঝতে পারলাম যখন ইথিওপিয়ার একজন তরুণ প্রতিনিধি তার দেশে এ প্রকল্পটি চালু করতে আমার কাছে অনুমতি ও সাহায্য চাইলেন। কারণ ইথোপিয়ায় এই সমস্যাটি আমাদেও দেশের চেয়ে নাকি আরও প্রকট। আমাদের একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ যা কিনা এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যদেশের মানুষের উপকারে আসবে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে ভেবে আমার বুকটা গর্বে ভরে উঠেছিল। এই প্রজেক্টটি এখন আরও বড় পরিসরে করতে চাই যাতে আমরা অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারি’।

মেহেদী হাসান রবিন বলছিলেন, আমাদের দেশ এখন একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব প্রজন্ম সব কিছু পায় না। এক প্রজন্ম কষ্ট করে, অন্য প্রজন্ম তার ফল পায় এবং তা আরও ত্বরান্বিত করে। যেমন আমাদেও পূর্ববর্তী প্রজন্ম তাদের জীবন দিয়ে এনেছেন আমাদের স্বাধীনতা। এখন আমাদেও দায়িত্ব হচ্ছে এ দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার। পরবর্তী প্রজন্ম যা নিয়ে সুখে থাকবে এবং আরও এগিয়ে যাবে। আমাদের দেশের তরুণদের হাত ধরেই এই পরিবর্তন আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এলামনাই এসোসিয়েশন: নির্বাচনে ইফাত সভাপতি, শাকিল সাধারণ সম্পাদক

স্টাফ রিপোর্টার :: ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্ৰথম এলামনাই এসোসিয়েশন (স্কুল অফ বিজনেস) ...