ব্রেকিং নিউজ

বনানীর আলোচিত ধর্ষণ মামলা ও নাগরিক চেতনা

ধর্ষণ মামলা ও নাগরিক চেতনাবাররীন ইভা :: পেশার কারণে অপরাধ জগতের অনেক অন্ধকারদিকের সাথে আমি পরিচিত, আবার আইন-আদালতে কি হচছে সেটাও আমি বেশ ভালো রকম ওয়াকিবহাল, এরপর দেশের হলুদ সাংবাদিকতার বিষয় তো বলাই বাহুল্য । তাই,  চট করে কোন খবরে হৈ হৈ করে উঠতে পারি না।

এদেশে ধর্ষণের ঘটনায় যে কটি মামলা হয় তার অর্ধেকের বেশী থাকে মিথ্যা মামলা। কিভাবে বুঝতে পারি – ডাক্তার যেমন রোগীর কথা শুনে বুঝতে পারে রোগ কোথায় আমরাও তেমনি ফাইল পড়লে অনেক কিছু বুঝি । কিন্তু সত্য মিথ্যা মিলিয়ে  যে কটি মামলা হয়  ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা তার চাইতে অনেক অনেক বেশী। সত্যিকারের ভূক্তভোগীরা সহসা আদালতে আসতে চান না। এর কারণ পারিবারিক-সামাজিকভাবে নিগৃহীত হবার ভয়, থানায়,  আদালতে অহেতুক হয়রানি ইত্যাদি।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং মাদকদ্রব্য নিয়নতরন আইনের অপব্যবহারের যথার্থ পরিসংখান পাওয়া গেলে নির্ঘাত সেটি হতো হতবাক করবার মত হিসাব।

দেশে প্রচলিত বৃটিশ আমলের ঘুনে ধরা আইন এবং বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে এর থেকে পরিত্রান পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। এর সাথে প্রয়োজন সমাজ চেতনার পরিবর্তনও, কারণ আসল গলদ কিন্তু সেখানেই ।

আইনের ফাঁক গলে যেমন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতকারী বেরিয়ে আসে, আবার উলটো ১০০ টাকা চুরির  মিথ্যা মামলায় হাজতে পঁচে মরে অনেক নিরীহ মানুষ। এটি সব সম্ভবের দেশ।

তবে, প্রকৃত  আসামী বেকসুর খালাস পেলে অভিযোগকারী যতটা কষ্ট পায়, অপরাধ না করেও সাজা পাওয়া আসামীর কষ্ট কিন্তু তার চাইতে অনেক বেশী। এপ্রসঙ্গে একটি ভীতিকর কথা বলি- মিথ্যা মামলা প্রমান করা অনেক সহজ হয়, কারণ প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য প্রমান তৈরী করে নিয়েই মামলা সাজানো হয়।

অনেকেই না জেনে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে হাস্যকর সব অভিযোগ আনেন।  মামলার এজাহার, তদন্ত রিপোর্ট , সাক্ষীদের বক্তব্যের বাইরে যাবার কতোটা সুযোগ তাদের আছে ? অধিকাংশ  ফৌজদারী মামলা তদন্তের  পর্যায়ে পুলিশের হাতে নষ্ট হয়, কিছু নষ্ট হয় সাক্ষীদের ভুলে। আবার অযোগ্য  ভুয়া আইনজীবিরাও কিছু ক্ষেত্রে দায়ী থাকেন। কিন্তু আসল দায় তো এদেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার।  ঘুষ দিয়ে পুলিশ হয়েছেন যিনি বা ফাঁস করা প্রশ্নে ডাক্তার হয়েছেন, অথবা  নকল করে আইনজীবী তার কাছে কি ধরণের সেবা আশা করা যায়!

সিস্টেমকে  দোষ দিয়ে লাভ নেই। সিস্টেম আমরা তৈরী করেছি, আমরাই চালাই। ৮বছরের ধর্ষিত শিশুকে নিয়ে বাবার আত্মাহুতির দায় যেমন আমাদের, তেমনি বিনা বিচারে যাবজ্জীবন হাজত  খাটা নির্দোষ মানুষটির সারা জীবন নষ্ট করবার জন্যও আমরাই দায়ী। উকল-পুলিশ -ডাক্তার সবাই খারাপ, শুধু আমি আর আপনি ভালো, তাই তো! বাহ্! কি সহজ হিসাব!

কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে হৈচৈ না করে প্রকৃত সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে আগে সমস্যাটা খুঁজে বের করা উচিত । আমার মতে সেই সমস্যা আমাদের মানসিকতার সমস্যা।  আমরা না জেনে মন্তব্য করি, খন্ডিত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পরে লাগি, সমস্যার মূল জায়গা খুঁজে বের না করে বাহ্যিক বিষয় নিয়ে মাথা  খুঁটে মরি, নিজের জন্য একরকম ভাবি অন্যের জন্য আরেক রকম, ঘুষ দিয়ে নিজের কাজটা বাগিয়ে নিয়ে অন্যকে ঘুষখোর বলে গালি দেই, চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখে  সেটা ঠেকানোর চেষ্টা না করে চুপচাপ ভিডিও করে ফেসবুকে ঝড় তুলি আজ তনুকে নিয়ে গলা ফাটাই কাল আরেকজনকে নিয়ে। আমাদের গোল্ড ফিশের মতো স্মৃতিতে তনুরা  শুধু আসে আর যায়, আদতে লাভ হয়না কিছুই।

তাই, পরিবর্তনের প্রথম কাজটি আমরা নিজেকে দিয়ে শুরু করি, আগে নিজের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাই, এরপর পরিবারের মানসিকতার পরিবর্তন এভাবেই সামগ্রিক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

লেখক: আইনজীবী,বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও খন্ডকালীন শিক্ষক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নাজমুন নাহার

লাল সবুজের পতাকা নিয়ে ১০৮ দেশ ঘুরলেন নাজমুন নাহার

স্টাফ রিপোর্টার :: ভ্রমণ কণ্যা হিসেবে পরিচিত নাজমুন নাহার। লাল-সবুজের পতাকা হতে ইতোমধ্যে ...