ফেরেশতা আসবেন না, নাভিশ্বাস ঠেকাতে হবে আপনাকেই

সংঘর্ষ ও সহিংসতার বার্তা নিয়ে আবারো ১৮ দলীয় জোটের রাজনৈতিক অরাজকতা শুরম্ন হয়েছে। সেই অরাজকতার আরেক নাম হরতাল। এই হরতালে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠেছিল জনজীবনে। হরতালে ঢাকার বাইরে থেকে শাক-সবজি, মাছসহ নানা পণ্যের আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাজারে সৃষ্টি হয় কাঁচাপণ্যের সঙ্কট। বিক্রেতারাও পণ্যের জোগান না পেয়ে, ক্ষেত্রবিশেষ সুযোগ বুঝে, চড়া দাম হাঁকায়। ক্রেতারাও নিরুপায় হয়ে তা কিনতে বাধ্য হয়। তাই আবারো হরতালকে সামনে রেখে ক্রেতাদের মাঝে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। মনে সৃষ্টি হয়েছে অতিরিক্ত অর্থব্যয়ে কাঁচাপণ্য কেনার যন্ত্রণা।

সবচেয়ে আমাদের দূর্ভাগ্য হলো এই যে, জাতিকে স্বপ্ন দেখানো সেই সুয়ো রানী আর দুয়ো রানী এখনো রাজত্ব নিয়ে যুদ্ধে মেতে আছেন। তারা রাতদিন মেতে আছেন নিজেদের ক্ষমতার দ্বন্দ নিয়েই। অন্যদিকে রাজত্বে খাদ্য সংকট তৈরি হলো কি না, দেশে সমস্যা গুলো সমাধান করা যায় কি না এসব ভাবার সময়-ই তাদের নেই। বরং তারা রাজনীতি করতে ব্যাসত্ম; তৈরি যুদ্ধ করতে, মানুষ মারতে…

এই সুযোগে অস্থির হয়ে উঠেছে রাজধানীর কাঁচাপণ্যের বাজার। পণ্য ভেদে কেজিপ্রতি বেড়েছে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করতে না পারলে আরো দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর বৃহৎ পাইকারি কারওয়ান বাজার, খুচরা বাজার মোহাম্মাদপুর বাজার ও মতিঝিল এজিবি কলোনি বাজারে বেশি দামে কাঁচাপণ্য অর্থাৎ তরিতরকারি বিক্রি হচ্ছে বলে সংবাদ পত্রের খবরে দেখা গেছে। ক্রেতারা দাবি করেছেন, অনেকটা কৃত্রিমভাবেই দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে খুচরা বিক্রেতারা দাবি করেছেন, আড়তে দাম বেড়েছে। এতে তাদের করার কিছুই নেই। আর আড়তদাররা জানিয়েছেন ১৮ দলীয় জোটের টানা ৬০ ঘণ্টার হরতালকে কেন্দ্র করে ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়নি। পাইকারি ব্যবসায়ীরা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, থেকে কাঁচাপণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আগে হরতালে নিত্যপণ্য বোঝাই ট্রাক ছেড়ে দেয়া হতো। হয়তো কিছু ট্রাক ভাংচুর হতো। কিন্তু এখন পণ্যবোঝাই ট্রাক পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সে কারণে হরতাল চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য পাঠাতে নানা চিন্তায় আছেন মোকাম ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা। সে জন্য হরতালের দিনগুলোতে নিত্যপণ্যের সরবরাহ কম থাকায় পাশাপাশি দাম বেড়ে যায়। আমদানিকারকরাও বলছেন, অস্থিরতার কারণে এখন বেচাকেনা কমে গেছে। পর্যাপ্ত ভোগ্যপণ্য মজুত রয়েছে। কিন্তু হরতালের ঝুঁকি নিয়ে গুদাম থেকে পণ্য সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এতে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার ট্রাকমালিকরাও এ অবস্থায় বরাবরের মতোই পণ্য পরিবহনে হাঁকছেন বেশি ভাড়া। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনের ভাড়া দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা বেড়ে গেছে। আগে যে পথের জন্য পরিবহন ভাড়া রাখা হতো ১৫ হাজার টাকা তা হরতালকে ঘিরে রাখা হচ্ছে ১৭-১৮ হাজার টাকা। এসব কারণে পুরো সপ্তাহেই বাজার চড়া থাকার আশঙ্কা করছেন নিত্যপণ্য ব্যবসায়ীরা।

কারওয়ান বাজারের কাঁচা মরিচ ব্যবসায়ী মিলন মিয়া জানান, গতকাল প্রতি কেজি কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে ১০ টাকা। কারণ আমদানি কম হওয়ায় দাম বেড়েছে। হরতাল শুরু হলে দাম বাড়ার ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা যায়, প্রতি রাতে সারাদেশ থেকে প্রায় ৫ শতাধিক ট্রাক দিয়ে ঢাকায় সবজি আসে। কিন্তু গত শনিবার রাতে ৩০০ ট্রাকের মতো এসেছে। অনেক ব্যবসায়ী বিভিন্ন স্থানে সবজি কিনে রেখেছে। কিন্তু ট্রাকের অভাবে আনতে পারছেন না। ২-৩ দিনের মধ্যে আনতে না পারলে সব সবজি পচে যাবে। তাই ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।  কাঁচাবাজারে দেখা গেছে, প্রতি কেজি বেগুন ৪০ থেকে ৫০ টাকা, শসা ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৯০ থেকে ১০০ টাকা, লাল শিম ৫০, সবুজ শিম ৭০ টাকা, ঝিঙা ৫০ টাকা, মুলা ৩০ টাকা, আলু ১৮ টাকা, গাজর ৬০ টাকা, চায়না গাজর ১২০ টাকা, করলা ৫০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ টাকা, পটোল ৪০ টাকা, পেঁপে ২০ টাকা, কচুর লতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কচুরমুখি ৩৫ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, টমেটো ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, কাঁকরোল ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস ফুলকপি ৩০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৬০ থেকে ১২০ টাকা ও লাউ ৫০ টাকা, জালি কুমড়া ২৫ থেকে ৩৫ টাকা, পানি কচু ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি হচ্ছে এবং প্রতি হালি কাঁচকলা ২৫ টাকা ও লেবু ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বাজারে লালশাক, কলমিশাক, লাউশাক, পালং শাক, মুলা শাক, পুঁইশাক, ডাটা শাকসহ নানা ধরনের শাকের আটি ৮ থেকে ২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পুদিনা পাতা ১০০ গ্রাম ২০ টাকা, ধনেপাতা প্রতি ১০০ গ্রাম ২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।  প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১০৫ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ১০৫ টাকা, চায়না বড় রসুন ৬৫ টাকা, দেশি রসুন ৭০ টাকা, একদানা রসুন ১০০ টাকা, চায়না আদা ১৪০ টাকা, ইন্দোনেশিয়ান আদা ১২০ টাকা, মরিচ ১৮০ টাকা, হলুদ ১২০ টাকা, ধনিয়া ৬৫ টাকা, আটা এক কেজির (প্যাকেট) ৩৯ টাকা, ময়দা (প্যাকেট) ৪৯ টাকা, দারুচিনি ২৮০ টাকা, এলাচি ১ হাজার ৩০০ টাকা, জিরা ৪৫০ টাকা, বেশন ৯০ টাকা, দেশি মশুর ডাল ১১০ টাকা, ভারতীয় মশুর ডাল ৭৬ টাকা, খেসারি ডাল ৪৫ টাকা, মুগ ডাল ১২০ টাকা, ছোলা ৪৮ টাকা, অ্যাংকর ডাল ৪৫ টাকা, মাসকলাই ৯০ টাকা, বুট ৬০ টাকা, চিনি ৪৫ টাকা ও প্রতি লিটার সয়াবিন খোলা ১১৬ টাকা ও বোতলজাত সয়াবিন ১৩০ টাকা, পাম সুপার ৮৫ টাকা লিটার হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।

চালের বাজারে প্রতি কেজি নাজিরশাইল ৫৬ টাকা, মিনিকেট ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, লতা আটাশ ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, মোটা চাল ৪০ টাকায়, জিরা নাজির ৫৪ টাকা, আটাশ ৪০ টাকা, পাইজাম ৩৮ টাকা, চিনি গুঁড়া ১১০ টাকা, পারিজা ৩৮ টাকা, বিআর-২৮ ৪০ থেকে ৪২ টাকা, বিআর-২৯ ৪০ টাকা, হাসকি ৪০ টাকা, স্বর্ণা ৩৬ টাকা থেকে ৩৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মুরগির লাল ও সাদা ডিম ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা, দেশি হাঁসের ডিম ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পাকিস্তানি মুরগির ডিম ৪০ টাকা, দেশি মুরগির ডিম ৪০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। মাছের বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের বেশি প্রতি হালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকা। এক কেজি ওজনের বেশি ইলিশের পিস ৬০০ টাকা ও প্রতি কেজি জাটকা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, চন্দনা ইলিশ ১৪০ টাকা, কাতল মাছ ৩০০ টাকা, রুই মাছ ২৫০ টাকা, তেলাপিয়া ১২০ টাকা, পাঙ্গাস ১২০ টাকা, চিংড়ি (বড়) ৭৫০ টাকা, চাষের কৈ ১৮০ টাকা, দেশি কৈ ২৭০ টাকা, টাকি ১২০ টাকা, সিলভার কার্প ১২০ টাকা, মলাঢেলা ২০০ টাকা, বাইলা মাছ ৫৫০ টাকা, কাচকি মাছ ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ২৮০ টাকা ও খাসি ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের প্রতিটি দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, লেয়ার মুরগি ১৪০ টাকা, হাঁস ৩০০ টাকা, ভেড়া ও ছাগীর মাংস ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

আকাশছোঁয়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধী মহাজোট সরকারের রাজনৈতিক বাজারের সাথে সাথে কাঁচা বাজারও গরম হয়ে আছে। এই গরমে মানুষ মরলেও কিছু যায় আসে না আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির। কেননা, রাজনৈতিক বিশেস্নষকদের মতে- আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত শুধু ক্ষমতার রাজনীতি করে বিধায় এদের মধ্যে কেবলমাত্র স্বাধীনতার বিষয়টি ব্যাতিত অন্য কোন বিষয়ে দ্বিমত নেই। হয়তো তার ধারাবাহিকতাতেই আমরা আওয়ামী লীগকে এখন যেমন জাতীয় পার্টির সাথে থাকতে দেখছি, একসময় জামায়াতের সাথে দেখেছি, হয়তো আগামীতে বিএনপির সাথেও দেখবো। তারা রাজনীতি করেন নিজেদের জন্য। না দেশের জন্য, না মানুষের জন্য। অতএব, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমজনতার অবস্থা যখন ক্রমশ করম্নণ হয়ে উঠছে তখন তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কোন বিকল্প আছে বলে আমারতো মনে হয় না। আপনাদের কি মনে হয় আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি-জামায়াতের পক্ষেই থাকবেন, তাহলে থাকুন আর স্রস্টাকে ডাকুন; যেন আকাশ থেকে ফেরেশতা পাঠিয়ে আমাদের সমস্যা সমাধান করে…

মোমিন মেহেদী : কলামিস্ট/

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...