ফিরে আসছি শততম ভ্রমণের উৎফুল্ল অনুভূতি নিয়ে!

ষোলো কোটি মানুষের কাছে ফিরে আসছি আমার শততম ভ্রমণের এক উৎফুল্ল অনুভূতি নিয়ে! নাজমুন নাহার :: হ্যালো বাংলাদেশ, আর মাত্র কিছু সময়! ফিরছি তোমার ছায়াতলে! কাল শুক্রবার বিকেলে (5:20 pm, Ek 586) পৌঁছাবো হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে!

শততম সীমানা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা! আজ আমি শিহরিত, আবেগ আপ্লুত! বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে আমার স্বপ্ন যাত্রার পূর্ণতায় আমি বিধাতার কাছে কৃতজ্ঞ! ষোলো কোটি মানুষের কাছে ফিরে আসছি আমার শততম ভ্রমণের এক উৎফুল্ল অনুভূতি নিয়ে! যে পতাকা ছুঁয়েছে পৃথিবীর একশোটির ও বেশি দেশের সীমানা! যে পতাকা ছুঁয়েছে পৃথিবীর বহু পর্বতশৃঙ্গ, নগর, বন্দর, সমুদ্র হতে সমুদ্র! যে পতাকা ছুঁয়েছে পৃথিবীর হাজারো মানুষের হৃদয়, সে পতাকা যাবে বিশ্বময়! লাল সবুজের এই পতাকা ভাবনা আমার কাছে একটি শিহরণ! একটি উচ্বাস! একটি আবেগ! একটি দেশ প্রেমের চিহ্ন! এই পতাকাকে অর্জনের জন্য প্রাণ হারিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ! হারানো প্রাণ আর রক্তে অর্জিত এই পতাকার সম্মান যেন সমুন্নত থাকে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে তাই আমি এই পতাকা নিয়ে হাটছি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে!

আমি স্বাধীনতা অর্জনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম দেখিনি! আমি একটি স্বাধীন দেশের পতাকা তলে বেড়ে উঠেছি! তাই পৃথিবীর কোনো এক কোনে লাল সবুজের পতাকা তলে বেড়ে উঠা একটি মেয়ে অনেক বড় একটি স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে পথ চলতে চলতে একদিন সে খুঁজে পায় সেই স্বপ্নের প্রতিফলন! যে স্বপ্ন তার দেশের পতাকাকে সে একদিন সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে যাবে! আমার সেই স্বপ্ন আজ পূরণ হলো পৃথিবীর একশোটির ও বেশি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে! আমি ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে বহন করে চলছি পৃথিবীর এক প্রান্ত আরেক প্রান্তে! পৌঁছে দিয়েছি পৃথিবীর বহু মানুষের কাছে বাংলাদেশের মানুষের জীবন যাত্রার কথা! বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তি যুদ্ধের কথা, জীবন ও সংস্কৃতির কথা, সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের কথা!

আমি বাংলাদশের জাতীয় পতাকাকে সমুন্নত রেখে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গত সতেরো বছর পৃথিবীতে যে যাত্রা করেছি তার একটি আনন্দ ও গৌরবময় মুহূর্ত ছিল ১ লা জুন ২০১৮ বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩ টা! সেদিন স্বপ্ন যাত্রার একশোতম দেশ জিম্বাবুয়েতে পৌঁছেছিল বাংলাদেশের পতাকা! আমি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ এবং বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে প্রাণ হারানো সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ইতিহাসের এই মাইলফলককে বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের একটি স্বপ্নের প্রতিফলনের বাস্তব চিহ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই!

আমার শততম দেশ ভ্রমণের পর যে অনুভূতি তা আমি বাংলাদেশের তরুন প্রজন্মের সাথে ভাগ করে নিতে চাই! একদিন আমি আকাশ ছোয়া বড় বড় স্বপ্ন দেখেছি! জীবনে একটা আশীর্বাদ স্বরূপ ভেবে নিয়েছি! আমাদের জীবনটাই একটা জার্নি! এই যে পৃথিবীর আলো বাতাসে বেড়ে উঠা, চোখ মেলেই আলোকিত সূর্য দেখা, সুন্দর পাহাড় দেখা, রাতের চন্দ্রের আলো দেখা, সমূদ্রের সুন্দর্য দেখা, বিধাতার এই সব রহস্যকে অনুভব করা সবই যেন অপূর্ব! বেঁচে আছি তা যেন এক রহস্য! তাই আমি এক এক করে স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য অন্ধকারে আলো জ্বলতে শিখেছি, আলোর পথ ধরে হাঁটতে শিখেছি, জীবনের দুর্বার দুর্গম মুহূর্তকে অতিক্রম করতে শিখেছি! যাত্রা পথে অন্ধকার নেমে আসতে পারে, তাই বলে কি আমরা থেমে থাকবো! আমাদের মনের দুর্বার শক্তি দিয়ে ওই অন্ধকার পথে বাতি জ্বালতে হবে!

আমি পৃথিবীর একশোটির ও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছি, তা আমার বিশ্বাস, শক্তি, মনোবল, নির্ভয় স্বপ্ন, আত্মনির্ভরশীলতা, পরিশ্রমের কারণে আমি পেরেছি! আমি বিশ্বাস করি আমি না জাগলে কেউ আমাকে জাগিয়ে দিতে পারবে না! নিজের জাগ্রত চিন্তা, স্বপ্নের বিশালতা আমাদেরকে নিয়ে যাবে বহু দূর! নিজেকে মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে, আমরা যে একদিন বিশ্বের অনেক কিছু জয় করেত পারবো তা আমাদেরকে ভাবতে হবে! অপরিসীম বিশাল ভাবনার গভীরতা আমাদেরকে নিয়ে যাবে বহু দূর!
আমি শুধু পৃথিবী দেখিনি, পৃথিবীর অনেক মানুষের অন্তরের স্বর্গ ও অবলোকন করেছি! পৃথিবী ভ্রমণের মাধ্যমে অনেক অজানা মানুষকে আবিষ্কর করা যায়! মানুষের মনের স্বর্গকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়! যা আমি দেখেছি!

আমার ভ্রমণের সময় অনেক দুর্গম এলাকায় আমাকে যেতে হয়েছে! মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে বহুবার! আজ পর্যন্ত বেঁচে আছি, নিশ্বাস ফেলছি তা যেন এক আশীর্বাদ! মনে পড়ে সেই মৃত্যুমুখী মুহুর্ত গুলোর কথা! অনেক পাহাড়ি অঞ্চলে না খেয়ে থাকার কথা! ক্ষুধা পেটে গাছ থেকে ভেঙে কাঁচা মেজ আর কাঁচা বাদাম খাবার কথা! মনে পড়ে ইথিওপিয়াতে কাঁচা মাংস খাওয়ার কথা! আফ্রিকার এমন কিছু দুর্গম এরিয়াতে গিয়েছি, যেখানে কোনো পানি নেই, হা হা কার! যদি ফেটে শুকিয়ে গেছে, সেই শুকনো নদীর কোনো জায়গা দিয়ে একটু পানি পড়ছে, সেই পানি দিয়ে ছেঁকে ছেঁকে তুলে আনছে মানুষ, একটু পানির তৃষ্ণা মেটানোর জন্য! দক্ষিণ ইথিওপিয়ার প্রচন্ড দাবদাহে ফোস্কা পড়েছিল আমার হাতে, তবুও আমার হাতে উঁচু করে ধরা ছিল বাংলাদেশের পতাকা! কনসো থেকে কেফার যাওয়ার পথে রাতে পাহাড়ী সব জংগলের বন্য প্রাণীর ভয়ানক আক্রমণ থেকে রক্ষা করে গাড়ি ড্রাইভ করার কথা ভাবলে এখনো বুকে শিহরণ জেগে উঠে!

ভযঙ্কর সেই উগান্ডার বৃষ্টীভরা রাতের কথা ভুলবো না! জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে পড়তে হয়েছিল আমাকে! রাতের বাসে করে তখন উগান্ডার কাম্পালা থেকে রুয়ান্ডা যাচ্ছি! তখন মধ্যরাত, এতো বৃষ্টি হচ্চ্ছিলো যে বাসের গ্লাস ভেদ করে পানি ভেতরে চলে ছিল! বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় ড্রাইভার দুবার কন্ট্রোল হারানোর পর তৃতীয়বার গাড়ি ধাক্কা খেয়ে পড়লো গাছের সাথে, গাড়ির সামনের দিকের কিছু অংশ বাঁকা হয়ে গেলেও, সব মানুষ অক্ষত ভাবে বেঁচেছিল! বুক কেঁপে উঠেছিল কিছুক্ষনের জন্য! সেই মধ্যে রাতে আমাদেরকে বৃষ্টির মধ্যে ১ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল ঘড়ি ঠিক করা পর্যন্ত! প্লাস্টিক মুড়িয়ে বুকের মধ্যে করে ল্যাপটপ আর মোবাইল গুলোকে রক্ষা করেছিলাম উগান্ডার সেই জংলী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে! উগান্ডা- রুয়ান্ডার বর্ডারের সেই শেষ রাত যেন ছিল যেন আরেক ভয়ঙ্কর এডভেঞ্চার! বর্ডার এলাকায় পানি উঠেছে, পানি ভরা রাস্তার উপর মানুষ পার হওয়ার জন্য বড় বড় পাথর ফেলে দিয়েছে! পাথরের উপর দিয়ে হাঁটার সময় অনুভব করলাম পাথর গুলো খুবই পিচ্চিল অবস্থায় আছে, তবুও সাবধানী পায়ে হাঁটছি পেছনে ব্যাকপ্যাক নিয়ে! দুপাশে কি ভয়ানক জঙ্গল, বন্য প্রাণীর ডাক বুকের ভেতর একটু আঁতকে যাচ্ছিলো অশনি সংকেতের হুঙ্কার, তবু আমি সাহসী পায়ে হাটছি! ভয়কে সব ভয়ানক থেকে জয় করতে করতে পথ চলছি! আরো বহু কথা বহু স্মৃতি! বহু প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কথা মনে পরে!

বন্য প্রাণীর আক্রমণের শিকার, পাহাড়ি পোকা মাকড়ের কামড় খাওয়া, প্রচন্ড শীতে পাহাড়ি আমেরিকার ইয়েলো স্টোন জঙ্গলে দুটো সুয়েটার দুটো জ্যাকেট পরে ঘুমিয়েছিলাম, প্রচন্ড খিদে খাবার না পেয়ে কিউবার সিনফুয়েগোস শহরে যাবার সময় গাড়ি নষ্ট হয়ে দুর্গম এলাকায় শুধু আখের রস খেয়ে বেঁচে ছিলাম! সমুদ্র লেভেল থেকে ১৪০০০ ফুট পেরুর রেইনবো মাউন্টেন অভিযাত্রার সময় অল্টিটুডের জন্য তিনবার শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েও বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে উঠেছিলাম সেই সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গে! বলিভিয়ার সেই ‘ইসলা ডেল সোল্’ দ্বীপে উঁচু পাহাড়ের পাথুরে পথে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা!

তারপর আইসল্যান্ডের ভলকানিক মাউন্টেনের ল্যান্ডমান্নালাগরের পর্বত ভ্যালিতে হারিয়ে যেয়ে পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু করে চিৎকার করে সাহাহ্র্য্য চাওয়া! বাংলাদেশের এই পতাকা হাতে নিয়ে আমি শুধু পৃথিবী ঘুরিনি, আমি এই পতাকা আমার হাতে থাকার কারণে আমি মৃত্যু মুখ থেকে অনেক বার বেঁচে গেছি! তাই আমি লাল সবুজের পতাকা হাতে বিশ্বময় হাঁটছি হৃদয়ে নিয়ে বাংলাদেশ!

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

"রামগতি তোমায় ভালোবাসি"

‘রামগতি তোমায় ভালোবাসি’

সুলতান মাহমুদ আরিফ :: ভালোবাসা আর ভালোলাগার প্রিয় জায়গা রামগতির ভালোবাসাময় প্রিয় ...