ফরমালিনের রাজনীতি, আমসত্ত্ব এবং কিছু তথ্য-উপাত্য !!

ফরমালিনের বিষ রাজনীতিতে, না-কি রাজনীতির বিষই ফরমালিনে প্রবেশ করে ফরমালিন আরো বিষাক্ত হয়েছে এটা নিয়ে মানুষের মনে কেমন যেন এক প্রকার আসঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশের মহান সম্মানিত দরদী, শান্ত-ভদ্র, উপকারী এবং মহান হৃদয়ের নেতা-নেত্রীরা এখন রাজনীতির নামে এক নোংরা খেলায় আমাদের মত সাধারণ জনতাকে রাজনীতির ফরমালিনে বিষাক্ত করে প্রতিদিনই মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। আর এর প্রেক্ষিতেই দেশের প্রত্যকটি মানুষ আজ প্রতিটি মুহুর্ত অতিবাহিত করছে ভয়, উৎকন্ঠা এবং হতাশায়। এছাড়া প্রতিদিন কত সংখ্যক মানুষ রাজনীতির বিষাক্ত ফরমালিনের বলি হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে এবং গুম-অপহরণ হচ্ছে সে সকল বিষয়ে কারোরই খুব একটা অজানার কিছুই নেই।

গত কয়েক দিন আগের একটি গল্প, আমের দোকানে গিয়েছিলাম কয়েক কেজি আম কিনতে, দোকানদারকে গিয়ে বললাম ভাইয়া আমাকে ফরমালিনযুক্ত তিন কেজি আম দিন। কিন্তু দোকানদার আমাকে আম না দিয়ে আমার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে, তখন আমি বললাম কি হলো ভাই আমাকে ফরমালিনযুক্ত আম দিচ্ছেন না কেন।  তবে এবার দোকানদার আমাকে বলল ভাইয়া সবাই ফরমালিনমুক্ত আম চায় কিন্তু আপনি ফরমালিনযুক্ত আম চাচ্ছেন এর কারণ কি? আমাদের এখানে তো সবগুলো আমই ফরমালিনমুক্ত, ফরমালিনযুক্ত আম আমরা রাখি না। তখন আমি বললাম দেখ না ভাই আমাদের দেশের রাজনীতিবীদরা ফরমালিন নিয়ে এতো বিশাল বিশাল বক্তব্য দিচ্ছেন  আর এ জন্যই আমি সত্যিকারের ফরমালিন যুক্ত আম খেয়ে দেখতে চাই আসলে কি হয়, এতে কি মানুষ মারা যায়, না কি ক্ষতি হয় সেটাই আমার দেখার ইচ্ছা। তখন দোকানদার আমাকে বলল ভাইয়া ফরমালিন যুক্ত আম খেয়ে মানুষ মারা যায় না, তবে মানুষের রক্তে এক প্রকার বিষ মিশে যায় এবং মানুষের শরীরের ক্ষতি হয়। তো যাই হোক দোকানদার ভাই থেকে বুঝতে পারলাম ফরমালিনযুক্ত আম খেয়ে মানুষ সরাসরি মারা যায় না, তবে মানুষের শরীরের অনেক ধরনের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু রাজনীতি নামক বিষাক্ত ফরমালিনে কত মানুষ জীবন দিয়েছে এবং দিচ্ছে? কত মানুষ গুম-অপহরণ হয়েছে এবং হচ্ছে এর কোন সঠিক হিসেব কারোর জানা আছে কিনা তা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।

তবে প্রকৃতপক্ষে ফরমালিন কি? এবং এটি কি কাজে ব্যবহার হয় আসুন একটু জেনে নেই। ফরমালিন হলো ফরমালডিহাইডের (রাসায়নিক সংকেত HCHO) ৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ জলীয় দ্রবণ । ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মিথানল মিশ্রত থাকে। ফরমালিন এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল বা সংক্রামক ব্যাধি নাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ফরমালিন মানুষের লাশসহ মৃত প্রাণীর দেহর পচন রোধ করতে ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফরমালডিহাইড ও মিথানল উভয়ই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ এবং মানব দেহের জন্য ক্ষতির কারন। ফরমালিনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের কারণে মানুষ কিডনি, লিভার, হৃদরোগ, আলসার ও ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থ্যাৎ প্রকৃত ফরমালিনে মানুষ সরাসরি মারা না গেলেও অনেক শরীরের ধরনের ক্ষতি হয় তাই ফরমালিন থেকে আমাদের সবাইকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে, তবে রাজনীতির ফরমালিন এই প্রকৃত ফরমালিন থেকেও অনেক বেশি বিষাক্ত সেজন্য রাজনীতি নামক ফরমালিন থেকে আমাদের অনেক অনেক দূরে থাকতে হবে।

স্বাধীন বাংলার ফরমালিনযুক্ত রাজনীতিতে আমরাও আজ কোন মানুষই খুব একটা ফরমালিনমুক্ত নয়। আর এই সুযোগে আমাদের দেশের মহান সম্মানিত নেতা/নেত্রীরা আমাদের সাধারণ মানুষকে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করছেন।তবে এই মৌসুম যেহেতু আম-কাঠালের মৌসুম তাই অনেকেই মনে করছেন এখন এই সময়ে আমাদের সম্মানিত নেতা-নেত্রীরা সাধারণ জনতাকে আমসত্ত্ব বানাচ্ছেন এবং তাঁদের নিজেদের যেমন ভাবে ব্যবহার করার ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করছেন । হ্যাঁ আমসত্ত্ব হলো সেই জিনিস যাহা তৈরী করতে লাগে কাঁচা আম, চিনি, সরিষার তেল, রসুন বাটা ইত্যাদি। এর পর তেল ছাড়া সব উপকরণ একসঙ্গে সিদ্ধ করে চেলে নিতে হয়। তারপর হাঁড়িতে তেল গরম করে সিদ্ধ আম দিয়ে অনবরত নাড়তে হয়। যতক্ষণ না ঘন আঠালো মণ্ড তৈরি হয়। তারপর কুলা অথবা গানতার মধ্যে ঢেলে দিয়ে রোদে ৪/৫ দিন শুকাতে হয়। তারপর ছোট ছোট বরফির মতো করে কাটতে হয় এবং এরপর কি করা হয় সেটা বাঙ্গালীর অজানা নয় বলেই আমাদের জানা। আর ঠিক অনেকটা এভাবেই আমাদের দরদী, উপকারী নেতা/নেত্রীরা আমাদের আমসত্ত্ব বানিয়ে নিজেদের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করছেন।

 তবে সত্যই আমাদের দেশের রাজনীতির কর্ণধার আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি নেতা-নেত্রীদের অবশ্যই অনেক অনেক ধন্যবাদ না দিয়ে উপায় নেই, কারণ এ দুটি দল তাদের প্রকৃত সত্য প্রকাশ করেছে, তারা তাদের প্রকৃত সত্য মুখোশ কিছুটা হলেও উন্মোচন করেছে। তবে একটি বিষয়ে আরো ধন্যবাদ অবশ্যই দিতেই হয় কারণ দল দুটির মধ্যে দা-মাছ সম্পর্ক থাকলেও একটি বিশেষ পদার্থ দিয়ে তাঁরা একে অপরকে উপকার করছেন বলে প্রকাশ করেছেন এবং এই একটি বিষয়ে তাদের দু-দলের মাঝে মিল আছে বলেও অনেকটা তাদের নিজের ভাষাতেই জানিয়েছেন। হ্যাঁ এটা আর কিছু নয় মানুষের জন্য খুবই মারাত্ত্বক উপকারী পদার্থ ফরমালিন। আর এই ফরমালিন দিয়ে এক দল অন্য দলকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বলে নেতা নেত্রীদের বক্তব্যে আমরা জানতে পেরেছি। ফরমালিন নিয়ে নেতাদের  সেই বিখ্যাত বাণীর দিকে তাকালে দেখা যায়।

 প্রথমে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বললেন, আওয়ামীলীগ পঁচে গেছে, তারা আরো একটু পঁচুক তাই দল গুছিয়ে শিগগিরই আন্দোলনের কর্মসূচি দেব। খালেদা জিয়া বললেন, এই আওয়ামীলীগ সরকার যতই গুম-খুন করুক, তাদের বিদায় করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, গুম হওয়া নেতাদের স্বজনদের মতো একদিন শেখ হাসিনাকেও কাঁদতে হবে। এসবের জবাবদিহি করতে হবে। এর জবাবে একদিন পর আওয়ামীলীগরে সভানেত্রী এবং দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে না গিয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) পঁচেছেন। এখন আমরা বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি। না হলে কিভাবে তারা এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, যাদের জন্ম অবৈধ, তারা কী করে সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিএনপির জন্ম অবৈধ। তাই তারা সবকিছুতেই অবৈধ দেখেন। শেখ হাসিনার বক্তব্যের জবাবে এরপর দিন সকালেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপিকে তিনি ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এর জবাবে আমরা বলতে চাই, তার শাসনামলই হচ্ছে বিষাক্ত ফরমালিনের যুগ। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিসহ সব জায়গায় তারা দক্ষভাবে এই ক্ষতিকর বিষ ফরমালিন প্রয়োগ করে চলেছে।

এদিকে ফরমালিনের এই বিষাক্ত বাণী নিয়ে ভাষনের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হলো নতুন তথ্য, তৈরী হতে লাগলো নতুন ইতিহাসের বাণী । সেই ইতিহাসের বাণী হলো দেশদরদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রথম তার বক্তব্যে বললেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন। বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধু হত্যায় তিনি আসামি হতেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, জিয়া মরে বেঁচে গেছেন।শেখ হাসিনার বক্তব্যের জবাবে বেগম জিয়ার লালিত সোনার ছাত্রদল জবাব দিলেন আরো বিশাল ইতিহাসে। ছাত্রদল পক্ষ থেকে বার্তায় বলা হল শেখ মুজিব মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। তা না হলে মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারসহ অন্যদের হত্যার দায়ে বাংলার মাটিতে তার বিচার হত। জিয়াউর রহমার নয় শেখ মুজিব রহমানই মরে গিয়ে বেঁচে গেছেঁ। এছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব বললেন, ১৭ মে [১৯৮১] শেখ হাসিনা ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন আর ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়। এতে বোঝা যায়, শেখ হাসিনা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। আর এভাবেই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি দল নিজেদের হিংসা, মনের জ্বালা, রাগ-ক্রোধের মাধ্যমে সুন্দর সুন্দর ফরমালিনযুক্ত বাণী দিয়ে রাজণীতিবীদ থেকে নতুন নতুন ইতিহাসবীদ হয়ে উঠছেন। আর আমরা সাধারন মানুষ তাদের ফরামলিনযুক্ত বিষাক্ত বানীতে বিষাক্ত হয়ে নির্বাক হয়ে অতল থেকে অতলে তলিয়ে যাচ্ছি। ফরমালিনের আমের আমসত্ত্ব, সেটা তাঁরা আমাদেরই খাওয়াচ্ছেন এটাও সত্য। এছাড়া ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিকৃতি তারা খুব সুচারুভাবে করছেন সত্যি সত্যি। এটাই হলো আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের চারিত্রিক ভাষার সংক্ষিপ্ত বিবৃতি। যেহেতু ফরমালিনের বিষের চেয়েও এক দল অপর দলের চেয়ে বেশি বিষাক্ত আর তাই তারা এই পদার্থ দিয়ে এক দল অপর দলকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সাধারণ জনতা এই বিষে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে, গুম-অপহরণে অনেক পরিবার তাদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে আজ নির্বাক। তো তাই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্বদের স্ববিনয়ে অনুরোধ জানিয়ে বলব, রাজনীতির নোংরা কাদা-ছোড়াছুড়ি পরিহার করে একটু বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর রাজনৈতিক কৃষ্টি-কালচার থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। ফরমালিনের বিষ থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে এবং জাতিকে মুক্তি দিন। সাধারণ মানুষকে নিয়ে আর না খেলে নিজেদের হিংসা বিদ্বেস ভোলার চেষ্টা করে দেশের আপামর সাধারণ জনতা এবং দেশকে ভালোবাসুন, তাহলেই দেশ আপনাকে স্যালুট জানাবে, থাকতে পারবেন প্রত্যক মানুষের হৃদয়ের নীড়ে।

 লেখক: এস এম সাজু আহমেদ/

Mail-smshaju7@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...