পাবনার ক্যালিকো মিল বন্ধ ২৫ বছর !

পাবনার ক্যালিকো মিল বন্ধ ২৫ বছর !কলিট তালুকদার, পাবনা প্রতিনিধি :: মামলাজটের ফাঁদে দেশের ঐতিহ্যবাহী পাবনার ক্যালিকো কটন মিল দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৭০০ শ্রমিক কর্মহীন জীবনযাপন করছেন। মিলটি এখন যেন বিধ্বস্ত পুরাকীর্তি। পাবনা শহরে প্রবেশের মুখেই চোখে পড়বে দৃশ্যটি।

সবুজ ঘাসে ছেয়ে থাকা ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক সংলগ্ন বিশাল মাঠের মধ্যে মাথা তুলে আছে কয়েকটি ভাঙা ইটের দেয়াল আর কংক্রিটের খুঁটি। ওপরের দিকে খাঁজকাটা আকৃতি দেখে বোঝা যায়, কোনো একটি কারখানা ছিল এককালে।

মিলটির নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনসার সদস্যরা এবং মালিক পক্ষ থেকে কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকলেও লুটপাট হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এখন প্রকাশ্যে খুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অবকাঠামোর ইট। মিলটি এখন পরিত্যক্ত ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের পাশে রাজাপুরে তিন ব্যবসায়ী ১২০ বিঘা জমির ওপর ‘ক্যালিকো কটন মিল’ প্রতিষ্ঠা করেন। ক্যালিকো কটন মিল নিবন্ধিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। ১২০ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু হয়েছিল পরের বছর ১৯৬৮ সালের ১১ নভেম্বর থেকে।

এখানে ৪৮০ জন নিয়মিত শ্রমিকসহ প্রায় ৭০০ শ্রমিক কাজ করতেন। কারখানা ভবন ছাড়াও ছিল তুলা ও সুতা রাখার গুদাম, প্রশাসনিক ভবন, কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের পৃথক আবাসিক ভবন, মসজিদ ইত্যাদি।

প্রতিষ্ঠার পর লাভজনক থাকা অবস্থায় ১৯৭২ সালে মিলটি জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৮৩ সালে সরকার মিলটির ৪৯ শতাংশ শেয়ার রেখে ৫১ শতাংশ মালিক পক্ষকে দিয়ে দেয়। পরে মালিক পক্ষ নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে মিলে স্থবিরতা নেমে আসে। একপর্যায়ে শ্রমিকদের বেতনভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক অসন্তোষে মিলের কার্যক্রমে অচলাবস্থা দেখা দেয়।

১৯৯২ সালের প্রথম দিকে মিলটি সচল করতে শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষ অগ্রণী ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়। সে সময় বিটিএমসির আড়াই কোটি টাকা ঋণসহ মিলটি বেসরকারি উদ্যোক্তা মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মিলটি সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে ওই বছরই ৮ এপ্রিল অগ্রণী ব্যাংক পাবনা শাখা পাঁচ কোটি ১২ লাখ টাকা অনুমোদিত ঋণসীমার প্রারম্ভিক তিন কোটি ৭৭ লাখ টাকা ঋণ দেয়।

এরপর মালিকদের দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব এবং শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণে ১৯৯৩ সালে মালিক পক্ষ মিলটি বন্ধ ঘোষণা করে শ্রমিকদের বেতনের ২৫ লাখ টাকা এবং প্রভিডেন্ড ফান্ডের ৫০ লাখ টাকা নিয়ে পাবনা ত্যাগ করে। এরপর মিলটি আর চালু হয়নি।

সুতা তৈরির ঐতিহ্যবাহী এ মিলটি আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। ২৩ বছর আগে বন্ধ হলেও অগ্রণী ব্যাংক তাদের প্রায় ৪৭ কোটি টাকা পাওনা আদায়ের জন্য আদালতে লড়াই করে যাচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোক্তা মিল মালিকদের দাবি, ব্যাংক তাদের কাছে পাবে তিন কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

মিলটিতে বিনিয়োগকারী অগ্রণী ব্যাংক তাদের প্রায় ১৬ কোটি টাকা পাওনার দাবিতে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে। মামলায় আদালত ০৭-০৫-২০০৩ তারিখে মিল মালিকের দাবির বিপরীতে দুই কোটি ৯০ লাখ ৫৯ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য মিল মালিকদের নির্দেশ দিয়ে রায় দেন।

অগ্রণী ব্যাংক এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে কিন্তু আপিল খারিজ হওয়ায় ব্যাংক পুনরায় রিভিউ করেছে। ১৯৮৩ সালে মিলটি পরিচালনায় ছিল নয়জন পরিচালক। দীর্ঘ সময়ে সাতজন পরিচালক মারা গেছেন। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং একজন পরিচালক জীবিত আছেন।

মিলের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন, আদালতে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তারা আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সবই করতে প্রস্তুত। কিন্তু ব্যাংক শুধু সময়পেণ করে মিলের শত শত কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করছে। মিলের মূল ভবন, যার মধ্যে ছিল বড় বড় মেশিনসহ কয়েকশ’ কোটি টাকার সম্পদ, আজ কিছুই নেই। সব মেশিনের খুচরা যন্ত্রাংশ পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে। ভবনের টিন, জানালা দরজা কিছুই আজ নেই।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, মিলটির নিরাপত্তার জন্য বন্ধের পর ১৯৯৬ সাল থেকে সময়ভেদে ২২ থেকে সাতজন পর্যন্ত আনসার নিয়োগ করা আছে। আর এ আনসারদের বেতনভাতা বাবদ ২২ বছরে প্রায় এক কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, মিলের সব সম্পদ চুরি ও লুটের বিষয়ে পাবনা থানায় মামলা করা হয়েছে। তা এখন কোর্টে বিচারাধীন।

একাধিক আনসার সদস্য জানান, বর্তমানে মিলে বিদ্যুৎব্যবস্থা না থাকায় তাদের পক্ষে এখানে নিরাপত্তা তো দূরের কথা, নিজেদের থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যা হলে নিজেদের বসে থাকা ছাড়া বাইরে আসার সাহস তাদের হয় না। রাত হলেই এখানে শুরু হয় অসামাজিক কার্যকলাপ। একাধিকবার মিলের মূল ভবনের ভেতর থেকে অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

ক্যালিকো কটন মিল শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক এক শ্রমিক নেতা জানান, মিলটি বন্ধ হওয়ার পর প্রায় অর্ধশত শ্রমিক অনাহারে-অর্ধাহারে মারা গেছেন। আর ৭০০ শ্রমিক পরিবার অভাবের তাড়নায় অতি কষ্টে দিন পার করছেন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন ইউএস বাংলার যাত্রীরা

ষ্টাফ রিপোর্টার :: এবার অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের চট্টগ্রামগামী ...