ব্রেকিং নিউজ ❯
Home / খোলা কলম / পহেলা বৈশাখ ও ইলিশ সমাচার

পহেলা বৈশাখ ও ইলিশ সমাচার

বৈশাখি ইলিশ সমাচার তাহমিনা শিল্পী :: কৈ এর তেলে কৈ ভাজাটা নেতিবাচক হলে ইলিশের তেলে ইলিশ ভাজাটা কি হবে?

কয়েকদিন থেকে কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে খুব।

প্রতিবছরের মত এবারও বৈশাখের আগমনে ইলিশের দাম নাকি খুব চড়া। তবে দামী যা কিছু তার প্রতি বাঙালীর আকর্ষনও বেশি। আর অধিক আকর্ষনে মমতা কমে যায়। যতটুকু থাকে তা কেবল বাঙালীয়ানা রক্ষার দায়।

কিন্তু আমরা যারা পদ্মারজলে দু’বেলা স্নান করে অভ্যস্ত তাদের কিন্তু চিরকালই ইলিশের জন্য ছোঁকছোঁকানি। বাতাসে ইলিশের গন্ধ পেলেও লালা ঝরে। দাম বাড়লো কি কমলো তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। মমতারও কোন কমতি থাকে না। তাই ইলিশ হাতে পেলেই ইলিশের তেলেই মচমচে করে মাছ ভাজা খেতেই হবে আমাদের। সেই সাথে শুকনো লঙ্কা ভাজা যেন অমৃতের স্বাদ।

ঋতুর আবর্তে বৈশাখ আমাদের দৌড়ে করা নাড়ছে। তাই পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতে উঠছে হাজারো বাঙালী হৃদয়। এই দিনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করছে নানা আয়োজনের। সেসব আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপানাদ হলো পান্তা-ইলিশ। যেন পান্তা-ইলিশ না হলে আমাদের চলেই না। শহুরে মধ্যবিত্তের পান্তা-ইলিশ অনেকটাই শখের ব্যাপার। নববর্ষে নানা আয়োজনে মেলায় বসে মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশের দোকান। সেই সুযোগে ব্যবসায়ীদের হয় বাড়তি কিছু আয়ের পথ।

এপ্রিল মাস ইলিশ মাছের মৌসুম নয়। ফলে এসময় বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় উৎপাদন ও আহরণ অনেক কম হয়। অন্যদিকে বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে নববর্ষের আগমনে ইলিশ মাছের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।  এসময়ে ইলিশের কিছুটা সঙ্কটও দেখা যায়। আর ইলিশের দাম হয়ে যায় আকাশ ছোঁয়া।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বাংলা নববর্ষের সাথে পান্তা-ইলিশের কি সম্পর্ক? কেন পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খেতেই হবে। বাঙালীয়ানার সাথেই বা এর সম্পর্ক কি?

শাসক শ্রেণির সুবিধার্থেই বাংলা সালের গোড়া পত্তন হয়েছিল বিষয়টি সকলেরই জানা। অবশ্য পরবর্তীকালে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোটা বাঙালির স্বাতন্ত্র্য সংস্কৃতি ও রীতিতে পরিণত হয়। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের যোগসূত্র কবে থেকে তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, সালটা ছিল ১৯৮৩। চৈত্রের কোন এক বিকালে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন সাংস্কৃতিক কর্মী। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সাংবাদিক বোরহান আহমেদ। রমনা বটমূলের বৈশাখী আয়োজনে পান্তা-ইলিশের প্রস্তাব করেন তিনিই প্রথম। এরপর অন্যরা সেটাকে সমর্থন করে এবং ওই বছর থেকেই রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশের প্রচলন হয়।

পহেলা বৈশাখ হলো বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যবাহী সাদামাটা একটি সর্বজনীন উৎসব। এর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা আগে কখনোই ছিল না বা থাকার কথাও নয়। কারণ সহজ-সরল বাঙালির গ্রামীণ জনপদের মানুষ তা যার যার সাধ্য ও প্রথাগতভাবে পালন করে থাকে। গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য হলো বৈশাখি মেলা। সেখানে থাকবে প্রাণের আবেগ আর ভালোবাসা। মেলায় থাকবে গ্রামীণ ও বাঙালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে পন্য ক্রয়-বিক্রয়। থাকবে বাঙালীর চিরায়ত সুস্থ সাংস্কৃতির চর্চা ও নতুন প্রজন্মের সাথে তার পরিচয় করানো। সেখানে কি দিয়ে খেলো, কি পরলো এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কখনই ছিলনা। থাকা উচিতও নয়।

বৈশাখি ইলিশ সমাচার একসময় ইলিশ মাছ খুবই সস্তা ছিল এবং তা খুবই সহজপ্রাপ্যও ছিল। ইলিশ মাছের স্বাদ ও গন্ধ এবং এর সহজপ্রাপ্যতার কারণেই জাতীয় মাছের স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু পান্তার সঙ্গে ইলিশ হতেই হবে এমন কোনো ঐতিহ্যের কথা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। অথচ কালের পরিক্রমায় এখন যেন পান্তা এবং ইলিশই একমাত্র পহেলা বৈশাখের উদযাপনীয় আইটেম হিসেবে এসে ঠেকেছে।

গরম ভাতে পানি ঢেলে পান্তা বানানো হচ্ছে। আর ইলিশ মাছের পেছনে ছুটতে ছুটতে বাজার খালি হয়ে যাচ্ছে। আর তাই অধিক চাহিদার কারনে এই সময়ে ইলিশ মাছের মূল্য হয়ে যাচ্ছে আকাশচুম্বী। এখন শহরের প্রতিটি বাড়িতে পহেলা বৈশাখে একটি ইলিশ মাছ জোগাড় করতে না পারা মানে সেটা তার অক্ষমতা ও ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আরো অনেক দেশীয় মাছ রয়েছে যেগুলোর দিকে আমরা দৃষ্টি দিচ্ছি না।

সংস্কৃতিচর্চার নামে এগুলো আসলে এক ধরনের বিকৃত ও অসম প্রতিযোগিতা। কারণ পান্তা-ইলিশ ছাড়াও পহেলা বৈশাখে পালন করার মতো আরো অনেক কিছু আছে যা আমরা অনেকেই পালন করি না। পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণমতে, এ উৎসবটি যখন গ্রাম থেকে শহুরে মানুষের দিকে ধাবিত হয়েছে, তখন থেকেই আসলে এর প্রকৃত তাৎপর্য মলিন হতে শুরু করেছে। কাজেই সময় এসেছে আর্টিফিশিয়াল পান্তা-ইলিশের সংস্কৃতি থেকে দেশ ও জাতিকে বের করে আনা। সরকার এ বছর এ বিষয়ে বেশ প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে সত্যি বলতে কি ইলিশও যেন তার নিজস্বতা হারাচ্ছে স্বাদে গন্ধে। আগে পদ্মারজলে ইলিশ পাওয়া গেলেও বর্ষার সময়ে আমাদের কুমার নদ ও আড়িয়ালখাঁ নদীতেও কিছু কিছু ইলিশ ধরা পরত। সেসময়কার ইলিশ মাছ খেলে হাতে প্রচুর তেল লেগে যেত। অন্তত তিনবার করে সাবান মেখে ধুঁতে হত। তারপরও ইলিশের মিষ্টি গন্ধ হাতে লেগে থাকতো অন্তত ঘন্টা চারেক। বারবার হাতের তালুতে নাক ডুবিয়ে বড় বড় শ্বাস নিতাম। আর বলতাম আহা কি স্বাদ! আহা কি স্বাদ! আজ সেসব রূপকথার গল্পের মত।

 

 

লেখকের ইমেইলঃ tahmina_shilpi@yahoo.com

http://www.unitednews24.com/wp-content/uploads/2016/08/Untitled-1-copy-1.jpg

About ahm foysal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*